ঢাকা ১০:০৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

সাইবার হামলা: গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের নতুন তরিকা

প্রকৃত গণমাধ্যমের সঙ্গে সরকার তথা ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতাবানদের সম্পর্ক খুব মধুর হওয়ার সুযোগ নেই। কেননা গণমাধ্যমের প্রধান কাজই হলো ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা। সুতরাং, যাদের কাছ থেকে ক্ষমতাবানরা প্রশ্নের শিকার হয় বা যাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে গণমাধ্যম প্রশ্ন তোলে—তাদের ব্যাপারে ক্ষমতাবানদের অস্বস্তি থাকবে এবং গণমাধ্যম ও ক্ষমতার মধ্যে একটা দূরত্ব থাকবে—এটাই স্বাভাবিক।

বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে গণতন্ত্রের মুখোশে কমবেশি সব সময়ই একধরনের স্বৈরতন্ত্র ও একনায়কতন্ত্র, পরিবারতন্ত্র এবং দলতন্ত্র ক্রিয়াশীল থাকে—সেখানে প্রকৃত গণমাধ্যমকে সব সময়ই একধরনের চাপের মধ্যে থাকতে হয়। আবার সময়ের সাথে সাথে এই চাপের ধরনেও অনেক সময় পরিবর্তন আসে। যেমন চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের আমলে সরকার তথা ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতাবানদের প্রশ্নের মুখে ফেললে, তারা বিব্রত হয় এমন সংবাদ প্রচার ও প্রকাশ করলে সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমপ্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন গোয়েন্দা বাহিনীর কর্তাদের ফোন করে সবক দেয়া এবং কখনো সখনো ধমকানোর ঘটনাও ঘটতো।

শুধু গোয়েন্দা বাহিনী নয়, বরং প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ নানা জায়গা থেকেই কখনো মৃদু ভাষায়, কখনো কড়া ভাষায় শাসানো হতো। অনেক সংবাদ একবার দুবার প্রচারের পরে সেটি আর প্রচার করা যায়নি। সংবাদমাধ্যমের ডিজিটাল পেইজ থেকে অনেক সংবাদ নামিয়ে দিতে হয়েছে। এর বাইরে কিছু ব্যক্তির ব্যাপারে কোনো ধরনের নেতিবাচক সংবাদ প্রকাশ করা যাবে না—এরকম অলিখিত নিয়মও চালু ছিল এবং ব্যতিক্রম ছাড়া সব গণমাধ্যম সেই ‘রেডলাইন’ ক্রস করার সাহস করেনি।

অভ্যুত্থানের পরে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গণমাধ্যমকে চাপে রাখার নতুন কৌশল অবলম্বন করা হয়। এই আমলে রাষ্ট্র বা সরকার, বিশেষ করে কোনো গোয়েন্দা বাহিনী সরাসরি ফোন করে কোনো গণমাধ্যমপ্রতিষ্ঠানকে শাসিয়েছে—এমনটা শোনা যায়নি। কিন্তু এই আমলে গণমাধ্যমের ওপর চাপ তৈরি করেছে বিভিন্ন অরাষ্ট্রীয় গোষ্ঠী—যারা অভ্যুত্থানের পরে ক্ষমতাবান হয়ে উঠেছিল। যাদের অনেকেই অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে নানারকম মব সন্ত্রাসের সঙ্গে যুক্ত ছিল বা এইধরনের সহিংসতার নেপথ্যে জোরালো ভূমিকা রেখেছে।  

অভ্যুত্থানে সরকার পতনের পরে ক্ষমতাচ্যুত দলের দলের নেতা এবং তাদের বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেশ কয়েকটি গণমাধ্যমপ্রতিষ্ঠানও আক্রমণের শিকার হয়। ভাঙচুর করা হয়। জ্বালিয়ে দেয়া হয়। দেশের শীর্ষ দুটি জাতীয় দৈনিক প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে ন্যক্কারজনক হামলা হয়। ভবনে আগুন দিয়ে ভেতরে থাকা কর্মীদের হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।  

জনমনে প্রত্যাশা ছিল যে, একটি রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের পরে একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মানুষের নেতৃত্বে যে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছে, সেই আমলে অন্তত গণমাধ্যম নির্ভয়ে কাজ করবে। ক্ষমতাকে প্রশ্ন করবে। কিন্তু এই আমলে সরকারের বাইরেও আরও একাধিক ক্ষমতার ভরকেন্দ্র তৈরি হয়—যাদেরকে অনেক সময় সরকারের চেয়েও বেশি শক্তিশালী মনে হয়েছে। ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের ‍পুরো দেড় বছর দেশের গণমাধ্যমকে মবের ভয় এবং গণমাধ্যমকর্মীদের পেশাগত অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়ে দিন পার করতে হয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির অবসান হয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী হয়ে বিএনপির সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে—যে সরকার শুরু থেকেই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। যে সরকারের প্রধান তারেক রহমান লন্ডনে নির্বাসিত থাকা অবস্থাতেই বিভিন্ন অনু্ষ্ঠানে দেয়া বক্তৃতায় বলেছেন, বিএনপি সরকার গঠন করলে প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনার জন্যও কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে না। ফলে গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টদের মনে এই প্রতীতি জন্মেছিল যে, তারা হয়তো এবার সত্যিই ভয় ও চাপমুক্ত পরিবেশে সাংবাদিকতা করতে পারবেন।

বিএনপি সরকারের প্রথম পাঁচ মাসে গণমাধ্যমের ওপর সেরকম কোনো রাষ্ট্রীয় চাপের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ শোনা যায়নি। যদিও গণমাধ্যমগুলো কিছু বিষয়ে এবং কিছু ব্যক্তির ক্ষেত্রে বরাবরই একধরনের সেলফ সেন্সরশিপ তথা স্বনিয়ন্ত্রণ অবলম্বন করে। কিন্তু তারপরও এখন পর্যন্ত মোটাদাগে কোনো সংবাদ প্রকাশ ও প্রচারের কারণে কোনো গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানকে গোয়েন্দা বাহিনী বা প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং থেকে শাসানো হয়েছে—এমনটি শোনা যায়নি।

তবে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের একটা নতুন প্রবণতা দেখা গেছে। সেটি হচ্ছে ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ ও প্রচার করলে সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমের ওপর সাইবার আক্রমণ। অর্থাৎ সরাসরি হামলা বা ফোন করে সংবাদ নামিয়ে দেয়ার অনুরোধ না করে সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের ডিজিটাল পেইজে সাইবার আক্রমণ করে ওই গণমাধ্যমকে চাপে রাখা—সম্প্রতি যে ঘটনার শিকার হয়েছে সংবাদভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল ওয়ান।

গত ১৮ জুলাই গণমাধ্যমে পাঠানো চ্যানেল ওয়ানের একটি প্রেসবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রচারের পরপরই চ্যানেল ওয়ানের ফেইসবুক পেইজে সাইবার হামলা হয়েছে। সেইসাথে চ্যানেল ওয়ানের ইনস্টাগ্রামও হ্যাক করার চেষ্টা চলছে।

চ্যানেল ওয়ানের বরাত দিয়ে এদিন বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবরে বলা হয়, ১৭ জুলাই ‘নীতি-নৈতিকতা ভেঙে সরকারের সাথে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর ব্যবসা; তিনটি মন্ত্রণালয়ে ঠিকাদারি’ শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রচারিত হয়—যেখানে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে মীর শাহে আলমের ঠিকাদারি কাজ নিয়ে বিস্তারিত তথ্য-প্রমাণ তুলে ধরা হয়। কিন্তু প্রতিবেদনটি চ্যানেল ওয়ানের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত হওয়ার পরে ফেইসবুক পেইজে ক্রমাগতভাবে সাইবার হামলা হয়। ‘আনন্দবার্তা’ এবং ‘আলি খান’ নামে দুটি পেইজ থেকে ভুয়া কপিরাইট দাবি করে প্রতিবেদনটি ব্লক করা হয়। কর্তৃপক্ষ বলছে, চ্যানেল ওয়ানের নিজস্ব প্রতিবেদনের কপিরাইট অন্য কাউকে দেয়া এবং প্রতিবেদনটি সাথে সাথে ব্লক করার ঘটনাটি খুবই অস্বাভাবিক।

খবরে বলা হয়, সংঘবদ্ধভাবে ভুয়া কপিরাইট দাবি করে ফেইসবুকে প্রতিবেদনটি ব্লক করার পাশাপাশি এ সম্পর্কিত সংবাদের ফটোকার্ডটিও সরিয়ে ফেলা হয়। এরপর রাতভর বট অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে চ্যানেল ওয়ানের বিভিন্ন কনটেন্টে রিপোর্ট করা হয়। বিশেষ করে মীর শাহে আলম সংক্রান্ত নতুন কোনো পোস্ট দিলেই ফেইসবুকে রিপোর্ট করা হয়। ভুয়া কপিরাইটের অভিযোগে কয়েকটি খবর, কার্ড এমনকি ফেইসবুক পেইজের প্রোফাইল ও কাভার ছবিতেও স্ট্রাইক দেওয়া হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল চ্যানেল ওয়ানের ফেইসবুক পেইজ স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেয়া। ১৮ জুলাই শনিবার বিকালে চ্যানেল ওয়ানে সাইবার হামলাসম্পর্কিত খবরটিও ফেইসবুক পেইজ থেকে সরিয়ে ফেলা হয়।

১. কোনো একজন ব্যক্তির বা জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত কোনো কনটেন্ট অন্য কেউ নিজের দাবি করলেই সেটি ফেইসবুক কী করে ব্লক করে দেয়া বা সরিয়ে ফেলে? একজনের কনটেন্ট আরেকজন নিজের দাবি করলেই সেটি তার হয়ে যায় কী করে? তাহলে ফেইসবুকের নিজস্ব নিরাপত্তা তথা কনটেন্টের সুরক্ষার ব্যবস্থা কী?

২. বট অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে কোনো একটি কনটেন্টের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেই ফেইসবুক সেটি সরিয়ে ফেলতে পারে? কোনটি আসল অ্যাকাউন্ট আর কোনটি বট—সেটি কি ফেইসবুকের এইআই নিয়ন্ত্রিত অ্যালগরিদম ধরতে পারে না? যদি না পারে তাহলে ফেইসবুককে এই দুর্বলতা স্বীকার করতে হবে এবং এই ফাঁকফোকড় বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

৩. স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর অনিয়ম দুর্নীতি সম্পর্কিত যেকোনো খবর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রকাশের সাথে সাথে সেগুলো সরিয়ে ফেলার এই ঘটনাটি কি ফেইসবুক কর্তৃপক্ষ স্বপ্রণোদিত হয়ে করেছে বা তাদের সিস্টেম কি এটা অনুমোদন করে নাকি এখানে রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠানও জড়িত?

বাস্তবতা হলো, কোনো প্রতিবেদনের বিষয়ে কারো কোনো বক্তব্য থাকলে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে সেটির প্রতিবাদ করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু প্রচলিত পথে না গিয়ে সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমপ্রতিষ্ঠানে সাইবার আক্রমণ চালানো গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধের নতুন প্রবণতা কি না, সেই প্রশ্ন উঠছে। যদিও স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীকে নিয়ে খবর প্রচারের কারণেই যে চ্যানেল ওয়ানে সাইবার আক্রমণ হয়েছে, সেটি এখনও প্রমাণিত নয়। কিন্তু এই খবর প্রচারের পরপরই যেহেতু ঘটনাগুলো ঘটেছে এবং এ সম্পর্কিত খবরগুলোই যেহেতু ব্লক করা হয়েছে এবং সরিয়ে ফেলা হয়েছে, ফলে এই সন্দেহ করাটা অমূলক নয়।

অস্বীকার করা যাবে না, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশের সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন। মুদ্রিত সংবাদপত্র এমনকি টেলিভিশনের স্ক্রিন ছাপিয়ে গণমাধ্যম এখন মানুষের আঙুলস্পর্শ দূরত্বে। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের কল্যাণে সারা বিশ্বের সব গণমাধ্যম তার হাতের মুঠোয়। এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুবাদে ভবিষ্যতে গণমাধ্যমের চেহারা কী দাঁড়াবে—তা হয়তো এখনই আন্দাজ করা যাচ্ছে না।

তবে তথ্যপ্রযুক্তির বিপুল সম্ভাবনার পাশাপাশি এর নেতিবাচক দিক হলো এর অপব্যবহার। অর্থাৎ যে তথ্যপ্রযুক্তি সারা বিশ্বের গণমাধ্যমকে মানুষের হাতের তালুবন্দি করেছে, সেই প্রযুক্তির অপব্যবহারই গণমাধ্যমের জন্য হুমকি তৈরি করছে। চ্যানেল ওয়ানের এই ঘটনা হয়তো ভবিষ্যতে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার আলোচনায় একটি নতুন কেসস্টাডি হিসেবে গণ্য হবে।

নির্মম সত্য হলো, গণমাধ্যম সব আমলেই সরকারের প্রতিপক্ষ। গণমাধ্যমের কাজই যখন ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা আর ক্ষমতায় থাকা লোকজন যেহেতু প্রশ্ন নয় বরং প্রশংসা শুনতেই বেশি পছন্দ করে, ফলে প্রকৃত গণমাধ্যমের পক্ষে কখনোই কারো বন্ধু হওয়ার সুযোগ থাকে না। যে কারণে গণমাধ্যম এক সরকারের আমলে ‘গণতন্ত্রের শত্রু’ তকমা পায়, তো পরের সরকারের আমলে মবের শিকার হয়। অন্য সরকারের আমলে সাইবার হামলার শিকার হয়। অর্থাৎ সব আমলেই আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি নিয়ে প্রকৃত সাংবাদিকদের দায়িত্ব পালন করতে হয়। সময়ের সাথে সাথে শুধুমাত্র আক্রমণের অস্ত্র ও কৌশল পরিবর্তিত হয়।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

‘জাতীয় পাহাড়ি কৃষি মিশন’ গঠন ও টেকসই সবুজ অর্থনীতির নতুন স্বপ্ন

সাইবার হামলা: গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের নতুন তরিকা

আপডেট সময় : ১০:৩১:০০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬

প্রকৃত গণমাধ্যমের সঙ্গে সরকার তথা ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতাবানদের সম্পর্ক খুব মধুর হওয়ার সুযোগ নেই। কেননা গণমাধ্যমের প্রধান কাজই হলো ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা। সুতরাং, যাদের কাছ থেকে ক্ষমতাবানরা প্রশ্নের শিকার হয় বা যাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে গণমাধ্যম প্রশ্ন তোলে—তাদের ব্যাপারে ক্ষমতাবানদের অস্বস্তি থাকবে এবং গণমাধ্যম ও ক্ষমতার মধ্যে একটা দূরত্ব থাকবে—এটাই স্বাভাবিক।

বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে গণতন্ত্রের মুখোশে কমবেশি সব সময়ই একধরনের স্বৈরতন্ত্র ও একনায়কতন্ত্র, পরিবারতন্ত্র এবং দলতন্ত্র ক্রিয়াশীল থাকে—সেখানে প্রকৃত গণমাধ্যমকে সব সময়ই একধরনের চাপের মধ্যে থাকতে হয়। আবার সময়ের সাথে সাথে এই চাপের ধরনেও অনেক সময় পরিবর্তন আসে। যেমন চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের আমলে সরকার তথা ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতাবানদের প্রশ্নের মুখে ফেললে, তারা বিব্রত হয় এমন সংবাদ প্রচার ও প্রকাশ করলে সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমপ্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন গোয়েন্দা বাহিনীর কর্তাদের ফোন করে সবক দেয়া এবং কখনো সখনো ধমকানোর ঘটনাও ঘটতো।

শুধু গোয়েন্দা বাহিনী নয়, বরং প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ নানা জায়গা থেকেই কখনো মৃদু ভাষায়, কখনো কড়া ভাষায় শাসানো হতো। অনেক সংবাদ একবার দুবার প্রচারের পরে সেটি আর প্রচার করা যায়নি। সংবাদমাধ্যমের ডিজিটাল পেইজ থেকে অনেক সংবাদ নামিয়ে দিতে হয়েছে। এর বাইরে কিছু ব্যক্তির ব্যাপারে কোনো ধরনের নেতিবাচক সংবাদ প্রকাশ করা যাবে না—এরকম অলিখিত নিয়মও চালু ছিল এবং ব্যতিক্রম ছাড়া সব গণমাধ্যম সেই ‘রেডলাইন’ ক্রস করার সাহস করেনি।

অভ্যুত্থানের পরে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গণমাধ্যমকে চাপে রাখার নতুন কৌশল অবলম্বন করা হয়। এই আমলে রাষ্ট্র বা সরকার, বিশেষ করে কোনো গোয়েন্দা বাহিনী সরাসরি ফোন করে কোনো গণমাধ্যমপ্রতিষ্ঠানকে শাসিয়েছে—এমনটা শোনা যায়নি। কিন্তু এই আমলে গণমাধ্যমের ওপর চাপ তৈরি করেছে বিভিন্ন অরাষ্ট্রীয় গোষ্ঠী—যারা অভ্যুত্থানের পরে ক্ষমতাবান হয়ে উঠেছিল। যাদের অনেকেই অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে নানারকম মব সন্ত্রাসের সঙ্গে যুক্ত ছিল বা এইধরনের সহিংসতার নেপথ্যে জোরালো ভূমিকা রেখেছে।  

অভ্যুত্থানে সরকার পতনের পরে ক্ষমতাচ্যুত দলের দলের নেতা এবং তাদের বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেশ কয়েকটি গণমাধ্যমপ্রতিষ্ঠানও আক্রমণের শিকার হয়। ভাঙচুর করা হয়। জ্বালিয়ে দেয়া হয়। দেশের শীর্ষ দুটি জাতীয় দৈনিক প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে ন্যক্কারজনক হামলা হয়। ভবনে আগুন দিয়ে ভেতরে থাকা কর্মীদের হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।  

জনমনে প্রত্যাশা ছিল যে, একটি রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের পরে একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মানুষের নেতৃত্বে যে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছে, সেই আমলে অন্তত গণমাধ্যম নির্ভয়ে কাজ করবে। ক্ষমতাকে প্রশ্ন করবে। কিন্তু এই আমলে সরকারের বাইরেও আরও একাধিক ক্ষমতার ভরকেন্দ্র তৈরি হয়—যাদেরকে অনেক সময় সরকারের চেয়েও বেশি শক্তিশালী মনে হয়েছে। ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের ‍পুরো দেড় বছর দেশের গণমাধ্যমকে মবের ভয় এবং গণমাধ্যমকর্মীদের পেশাগত অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়ে দিন পার করতে হয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির অবসান হয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী হয়ে বিএনপির সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে—যে সরকার শুরু থেকেই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। যে সরকারের প্রধান তারেক রহমান লন্ডনে নির্বাসিত থাকা অবস্থাতেই বিভিন্ন অনু্ষ্ঠানে দেয়া বক্তৃতায় বলেছেন, বিএনপি সরকার গঠন করলে প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনার জন্যও কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে না। ফলে গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টদের মনে এই প্রতীতি জন্মেছিল যে, তারা হয়তো এবার সত্যিই ভয় ও চাপমুক্ত পরিবেশে সাংবাদিকতা করতে পারবেন।

বিএনপি সরকারের প্রথম পাঁচ মাসে গণমাধ্যমের ওপর সেরকম কোনো রাষ্ট্রীয় চাপের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ শোনা যায়নি। যদিও গণমাধ্যমগুলো কিছু বিষয়ে এবং কিছু ব্যক্তির ক্ষেত্রে বরাবরই একধরনের সেলফ সেন্সরশিপ তথা স্বনিয়ন্ত্রণ অবলম্বন করে। কিন্তু তারপরও এখন পর্যন্ত মোটাদাগে কোনো সংবাদ প্রকাশ ও প্রচারের কারণে কোনো গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানকে গোয়েন্দা বাহিনী বা প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং থেকে শাসানো হয়েছে—এমনটি শোনা যায়নি।

তবে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের একটা নতুন প্রবণতা দেখা গেছে। সেটি হচ্ছে ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ ও প্রচার করলে সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমের ওপর সাইবার আক্রমণ। অর্থাৎ সরাসরি হামলা বা ফোন করে সংবাদ নামিয়ে দেয়ার অনুরোধ না করে সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের ডিজিটাল পেইজে সাইবার আক্রমণ করে ওই গণমাধ্যমকে চাপে রাখা—সম্প্রতি যে ঘটনার শিকার হয়েছে সংবাদভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল ওয়ান।

গত ১৮ জুলাই গণমাধ্যমে পাঠানো চ্যানেল ওয়ানের একটি প্রেসবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রচারের পরপরই চ্যানেল ওয়ানের ফেইসবুক পেইজে সাইবার হামলা হয়েছে। সেইসাথে চ্যানেল ওয়ানের ইনস্টাগ্রামও হ্যাক করার চেষ্টা চলছে।

চ্যানেল ওয়ানের বরাত দিয়ে এদিন বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবরে বলা হয়, ১৭ জুলাই ‘নীতি-নৈতিকতা ভেঙে সরকারের সাথে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর ব্যবসা; তিনটি মন্ত্রণালয়ে ঠিকাদারি’ শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রচারিত হয়—যেখানে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে মীর শাহে আলমের ঠিকাদারি কাজ নিয়ে বিস্তারিত তথ্য-প্রমাণ তুলে ধরা হয়। কিন্তু প্রতিবেদনটি চ্যানেল ওয়ানের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত হওয়ার পরে ফেইসবুক পেইজে ক্রমাগতভাবে সাইবার হামলা হয়। ‘আনন্দবার্তা’ এবং ‘আলি খান’ নামে দুটি পেইজ থেকে ভুয়া কপিরাইট দাবি করে প্রতিবেদনটি ব্লক করা হয়। কর্তৃপক্ষ বলছে, চ্যানেল ওয়ানের নিজস্ব প্রতিবেদনের কপিরাইট অন্য কাউকে দেয়া এবং প্রতিবেদনটি সাথে সাথে ব্লক করার ঘটনাটি খুবই অস্বাভাবিক।

খবরে বলা হয়, সংঘবদ্ধভাবে ভুয়া কপিরাইট দাবি করে ফেইসবুকে প্রতিবেদনটি ব্লক করার পাশাপাশি এ সম্পর্কিত সংবাদের ফটোকার্ডটিও সরিয়ে ফেলা হয়। এরপর রাতভর বট অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে চ্যানেল ওয়ানের বিভিন্ন কনটেন্টে রিপোর্ট করা হয়। বিশেষ করে মীর শাহে আলম সংক্রান্ত নতুন কোনো পোস্ট দিলেই ফেইসবুকে রিপোর্ট করা হয়। ভুয়া কপিরাইটের অভিযোগে কয়েকটি খবর, কার্ড এমনকি ফেইসবুক পেইজের প্রোফাইল ও কাভার ছবিতেও স্ট্রাইক দেওয়া হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল চ্যানেল ওয়ানের ফেইসবুক পেইজ স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেয়া। ১৮ জুলাই শনিবার বিকালে চ্যানেল ওয়ানে সাইবার হামলাসম্পর্কিত খবরটিও ফেইসবুক পেইজ থেকে সরিয়ে ফেলা হয়।

১. কোনো একজন ব্যক্তির বা জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত কোনো কনটেন্ট অন্য কেউ নিজের দাবি করলেই সেটি ফেইসবুক কী করে ব্লক করে দেয়া বা সরিয়ে ফেলে? একজনের কনটেন্ট আরেকজন নিজের দাবি করলেই সেটি তার হয়ে যায় কী করে? তাহলে ফেইসবুকের নিজস্ব নিরাপত্তা তথা কনটেন্টের সুরক্ষার ব্যবস্থা কী?

২. বট অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে কোনো একটি কনটেন্টের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেই ফেইসবুক সেটি সরিয়ে ফেলতে পারে? কোনটি আসল অ্যাকাউন্ট আর কোনটি বট—সেটি কি ফেইসবুকের এইআই নিয়ন্ত্রিত অ্যালগরিদম ধরতে পারে না? যদি না পারে তাহলে ফেইসবুককে এই দুর্বলতা স্বীকার করতে হবে এবং এই ফাঁকফোকড় বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

৩. স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর অনিয়ম দুর্নীতি সম্পর্কিত যেকোনো খবর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রকাশের সাথে সাথে সেগুলো সরিয়ে ফেলার এই ঘটনাটি কি ফেইসবুক কর্তৃপক্ষ স্বপ্রণোদিত হয়ে করেছে বা তাদের সিস্টেম কি এটা অনুমোদন করে নাকি এখানে রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠানও জড়িত?

বাস্তবতা হলো, কোনো প্রতিবেদনের বিষয়ে কারো কোনো বক্তব্য থাকলে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে সেটির প্রতিবাদ করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু প্রচলিত পথে না গিয়ে সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমপ্রতিষ্ঠানে সাইবার আক্রমণ চালানো গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধের নতুন প্রবণতা কি না, সেই প্রশ্ন উঠছে। যদিও স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীকে নিয়ে খবর প্রচারের কারণেই যে চ্যানেল ওয়ানে সাইবার আক্রমণ হয়েছে, সেটি এখনও প্রমাণিত নয়। কিন্তু এই খবর প্রচারের পরপরই যেহেতু ঘটনাগুলো ঘটেছে এবং এ সম্পর্কিত খবরগুলোই যেহেতু ব্লক করা হয়েছে এবং সরিয়ে ফেলা হয়েছে, ফলে এই সন্দেহ করাটা অমূলক নয়।

অস্বীকার করা যাবে না, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশের সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন। মুদ্রিত সংবাদপত্র এমনকি টেলিভিশনের স্ক্রিন ছাপিয়ে গণমাধ্যম এখন মানুষের আঙুলস্পর্শ দূরত্বে। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের কল্যাণে সারা বিশ্বের সব গণমাধ্যম তার হাতের মুঠোয়। এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুবাদে ভবিষ্যতে গণমাধ্যমের চেহারা কী দাঁড়াবে—তা হয়তো এখনই আন্দাজ করা যাচ্ছে না।

তবে তথ্যপ্রযুক্তির বিপুল সম্ভাবনার পাশাপাশি এর নেতিবাচক দিক হলো এর অপব্যবহার। অর্থাৎ যে তথ্যপ্রযুক্তি সারা বিশ্বের গণমাধ্যমকে মানুষের হাতের তালুবন্দি করেছে, সেই প্রযুক্তির অপব্যবহারই গণমাধ্যমের জন্য হুমকি তৈরি করছে। চ্যানেল ওয়ানের এই ঘটনা হয়তো ভবিষ্যতে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার আলোচনায় একটি নতুন কেসস্টাডি হিসেবে গণ্য হবে।

নির্মম সত্য হলো, গণমাধ্যম সব আমলেই সরকারের প্রতিপক্ষ। গণমাধ্যমের কাজই যখন ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা আর ক্ষমতায় থাকা লোকজন যেহেতু প্রশ্ন নয় বরং প্রশংসা শুনতেই বেশি পছন্দ করে, ফলে প্রকৃত গণমাধ্যমের পক্ষে কখনোই কারো বন্ধু হওয়ার সুযোগ থাকে না। যে কারণে গণমাধ্যম এক সরকারের আমলে ‘গণতন্ত্রের শত্রু’ তকমা পায়, তো পরের সরকারের আমলে মবের শিকার হয়। অন্য সরকারের আমলে সাইবার হামলার শিকার হয়। অর্থাৎ সব আমলেই আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি নিয়ে প্রকৃত সাংবাদিকদের দায়িত্ব পালন করতে হয়। সময়ের সাথে সাথে শুধুমাত্র আক্রমণের অস্ত্র ও কৌশল পরিবর্তিত হয়।