গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশে প্রতিবছর ধারাবাহিকভাবে নতুন শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। নতুন শিক্ষাবর্ষে কোটি কোটি বই ছাপা হয়, নিত্যনতুন শ্রেণিকক্ষ নির্মিত হয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ে এবং জাতীয় বাজেটে শিক্ষাবাজেট নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-পর্যালোচনা হয়। কিন্তু এই সমস্ত দৃশ্যমান অবকাঠামোগত অগ্রগতির উজ্জ্বল আড়ালে আরেকটি বাংলাদেশ প্রতিদিন নীরবে ও অলক্ষ্যে তৈরি হচ্ছে-যেখানে প্রতিবছর লাখ লাখ শিশু ও কিশোর শিক্ষার স্বাভাবিক পথ থেকে চিরতরে অদৃশ্য হয়ে যায়। তারা পরীক্ষার মেধা তালিকায় নেই, ভর্তি-পরিসংখ্যানের খাতায় নেই, এমনকি উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্নেও নেই। তাদের নির্মম উপস্থিতি দেখা যায় চরম ঝুঁকিপূর্ণ ইটভাটায়, পোশাক বা অনানুষ্ঠানিক কারখানায়, ধানক্ষেতে, অটো গ্যারেজে, আন্তর্জাতিক অভিবাসনের বিপজ্জনক পথে কিংবা অতি অল্প বয়সে চাপিয়ে দেওয়া বিয়ের সংসারে।
সাম্প্রতিক সময়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ০২ জুলাই থেকে দেশের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি ও সমমান) পরীক্ষা শুরু হয়েছে। প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, সেই পাবলিক পরীক্ষায় প্রায় সাত লাখ নিবন্ধিত পরীক্ষার্থী সরাসরি অনুপস্থিত ছিল, যা দেশের সর্বস্তরের মানুষকে নতুন করে সেই অদৃশ্য ও অবহেলিত বাংলাদেশের দিকে তাকাতে বাধ্য করেছে। এই বিশাল সাত লাখ সংখ্যাটি হলো একাদশ শ্রেণিতে আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধিত হলেও পরবর্তীতে এইচএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণ না করা এবং ফরম পূরণ সম্পন্ন করেও শেষ পর্যন্ত পরীক্ষার হলে অনুপস্থিত থাকা শিক্ষার্থীদের এক সম্মিলিত ও করুণ বাস্তবতা।
এই সংখ্যাটি কেবল কোনো সাধারণ পরীক্ষার গাণিতিক পরিসংখ্যান নয়, এটি বাংলাদেশের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের ভেতরের ক্ষয়, ক্রমবর্ধমান সামাজিক বৈষম্য, তীব্র অর্থনৈতিক চাপ এবং প্রশাসনিক নীতিগত দুর্বলতার এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। যে দেশে একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী পরীক্ষার হলে পৌঁছাতেই পারে না, সেখানে সমস্যাটিকে কোনোভাবেই কেবল কোনো নির্দিষ্ট শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এটি আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ ও শিক্ষা ব্যবস্থার এক যৌথ ও গভীর সংকট।
বিগত ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিল প্রায় ১৬.৭২ লাখ শিক্ষার্থী। পরবর্তীতে তাদের মধ্যে প্রায় ১.৮০ লাখ শিক্ষার্থী একাদশ শ্রেণিতে ভর্তিই হয়নি। আবার যারা একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিল, তাদের মধ্য থেকে আরও প্রায় ৫.৪৪ লাখ শিক্ষার্থী নিয়মিত এইচএসসি পরীক্ষার ফরমই শেষ পর্যন্ত পূরণ করেনি। পরীক্ষার একেবারে প্রথম দিন আবার ২৪,৭৮৪ জন ফরম পূরণ সম্পন্ন করেও পরীক্ষার হলে অনুপস্থিত ছিল। অর্থাৎ, একটি নির্দিষ্ট এসএসসি পাস করা ব্যাচ থেকে সর্বমোট ৭.২৪ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী নিয়মিত এইচএসসি পরীক্ষার স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা থেকে চিরতরে হারিয়ে গেছে।
২০২৬ সালের প্রকাশিত এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার চূড়ান্ত উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নিয়মিত নিবন্ধিত শিক্ষার্থীদের প্রায় ৩৬ শতাংশই পরীক্ষায় সরাসরি অংশ নিতে পারেনি। দেশের নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে একাদশ শ্রেণিতে নিয়মিত নিবন্ধিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১১ লাখ ৮৬ হাজার ৪৬১ জন। কিন্তু চূড়ান্ত পরীক্ষার ফরম পূরণ করেছে মাত্র ৭ লাখ ৯৪ হাজার ৪৭৭ জন। যার অর্থ দাঁড়ায়, ৩ লাখ ৯১ হাজার ৯৮৪ জন বা ৩৩.০৪ শতাংশ নিবন্ধিত শিক্ষার্থী পরীক্ষার ফরমই পূরণ করতে সমর্থ হয়নি।
পরিস্থিতি আরও বহুগুণ বেশি উদ্বেগজনক দেশের মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা ধারায়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে ৪৪.০৭ শতাংশ এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ৫৪.৫৮ শতাংশ নিয়মিত শিক্ষার্থী ফরমই পূরণ করেনি। এরপরও যারা বহুকষ্টে ফরম পূরণ করেছিল, তাদের মধ্যেও প্রথম দিনের পরীক্ষায় অনুপস্থিত ছিল ২৪ হাজার ৭৮৪ জন। অর্থাৎ, একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া একটি বিপুলসংখ্যক অংশ উচ্চমাধ্যমিকের শেষ পরীক্ষায় পৌঁছানোর আগেই শিক্ষার মূল ধারা থেকে পুরোপুরি ছিটকে পড়েছে। এটি শুধু একটি পরীক্ষার পরিসংখ্যান নয়, এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য এক অতি কঠিন ও ভয়াবহ সতর্কবার্তা। এই সাত লাখ অনুপস্থিত শিক্ষার্থীর সংখ্যাটি আরও অনেক বড় এক বাস্তবতার প্রতীক মাত্র। বাংলাদেশে শিক্ষার্থীরা হুট করে একদিনে হঠাৎ হারিয়ে যায় না; বরং তারা অত্যন্ত ধীরগতিতে হারিয়ে যায়।
শুরুতে ক্লাসে অনিয়মিত উপস্থিতি, তারপর ধীরে ধীরে শ্রেণিকক্ষের পড়ালেখায় আগ্রহ কমে যাওয়া, এরপর তীব্র আর্থিক সংকটে পড়ে পড়াশোনার পাশাপাশি উপার্জনের কাজ শুরু করা, কোনো কিশোরী মেয়ের ক্ষেত্রে অল্প বয়সে জোরপূর্বক বিয়ে দেওয়া, পরিবারের স্থায়ী বাসস্থান পরিবর্তনের কারণে অন্যত্র চলে যাওয়া, কিংবা বারবার পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে মানসিক আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলা-এভাবেই মূলত একজন শিক্ষার্থী শিক্ষা-পরিসংখ্যানের খাতা থেকে চিরতরে মুছে যায়। শেষ পর্যন্ত যখন চূড়ান্ত বোর্ড পরীক্ষার দিন আসে, তখন সেই অনুপস্থিতি কেবল দীর্ঘ প্রক্রিয়ার শেষ দৃশ্য হিসেবে উন্মোচিত হয়; হারিয়ে যাওয়ার আসল প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছিল বহু আগে।
বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষাস্তরে শিক্ষার্থী ভর্তির হার বহু বছর ধরেই আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসনীয়। কিন্তু আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ভর্তি করানো নয়, বরং ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীকে শেষ পর্যন্ত বিদ্যালয়ে ধরে রাখা। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ও তাদের গবেষণায় বহুবার স্পষ্ট করা হয়েছে যে, বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান সমস্যা হলো শিক্ষার্থীর মাঝপথে ঝরে পড়া (Drop out) এবং শিক্ষাজীবনের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে না পারা। বিশেষ করে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে এই সংকটটি দিন দিন তীব্র আকার ধারণ করছে।
শিক্ষার্থীর ঝরে পড়া মানে কেবল একটি বিদ্যালয় ছেড়ে চলে যাওয়া নয়; এর প্রকৃত অর্থ হলো একটি শিশুর জীবনের সুপ্ত সম্ভাবনার অকাল মৃত্যু। কারণ, শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া মানে শুধু একটি সার্টিফিকেট বা সনদপত্র হারানো নয়; এর সাথে সাথে চিরতরে হারিয়ে যায় ভবিষ্যতে উন্নত কর্মসংস্থানের সুযোগ, নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা, সচেতন নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রীয় অংশগ্রহণের সক্ষমতা এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা দারিদ্র্যের শৃঙ্খল ভাঙার উজ্জ্বল সম্ভাবনা। যে শিশু আজ দারিদ্র্যের চাপে বিদ্যালয় ছাড়ছে, তার ভবিষ্যৎ সন্তানও যে একই ঝুঁকির মধ্যে পড়বে-এটাই দারিদ্র্য ও বৈষম্যের পুনরুত্পাদনের সবচেয়ে শক্তিশালী চাকার মতো কাজ করে।
দেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সংকট এই বাস্তবতাকে আরও বেশি কঠিন ও নিষ্ঠুর করে তুলেছে। গত কয়েক বছরের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের চরম অনিশ্চয়তা এবং সাধারণ পরিবারের প্রকৃত আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় বহু পরিবারে সন্তানের শিক্ষার খরচ চালানোকে আর অগ্রাধিকার দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সরকারি বিদ্যালয়গুলোতে টিউশন ফি তুলনামূলক কম হলেও প্রয়োজনীয় বই, প্রাইভেট কোচিং, পরীক্ষার ফি, যাতায়াত খরচ, পোশাক, ডিজিটাল ডিভাইস এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় চালানো দরিদ্র পরিবারের জন্য মস্ত বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। তখন অভিভাবকেরা অত্যন্ত কঠিন ও নির্মম সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন-শিশু পড়ালেখা করবে, নাকি কাজ করে সংসার চালাবে?
ফলে গ্রামের অনেক কিশোর বয়সেই নির্মাণশ্রমিক, কৃষিশ্রমিক কিংবা বিভিন্ন ওয়ার্কশপে সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করে। অন্যদিকে শহরের কিশোরেরা রেস্তোরাঁ, দোকান, মোটর গ্যারেজ, ক্ষুদ্র কারখানা কিংবা বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারে প্রবেশ করে। মেয়েদের ক্ষেত্রে এই পরিস্থিতি আরও অনেক বেশি জটিল ও করুণ। মাধ্যমিক শিক্ষা পার হওয়ার পর অনেক পরিবার নিরাপত্তাহীনতা, সামাজিক নানা চাপ কিংবা অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণে বাল্যবিয়াকেই মেয়ের ভবিষ্যতের একমাত্র সমাধান বলে মনে করে। ফলে একটি সম্ভাবনাময় মেয়ের স্কুলব্যাগের জায়গা অকালেই দখল করে নেয় সংসারের বড় দায়িত্ব।
এর পাশাপাশি শিক্ষার অভ্যন্তরীণ মানগত সমস্যাগুলোকেও কোনোভাবে উপেক্ষা করা যাবে না। আমাদের দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার বড় একটি অংশ এখনো পুরোপুরি পরীক্ষাকেন্দ্রিক। শ্রেণিকক্ষের আনন্দের পড়ালেখা, নতুন কিছু খোঁজার কৌতূহল, সৃজনশীলতা কিংবা বাস্তব জীবনের প্রয়োজনীয় দক্ষতার চেয়ে কেবল পরীক্ষার নম্বর এবং সার্টিফিকেট অর্জনকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। ফলে পড়াশোনায় একটু দুর্বল শিক্ষার্থী খুব দ্রুত নিজেকে অযোগ্য ও ফেলনা ভাবতে শুরু করে। অনেক শিক্ষার্থী একবার পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার পর দ্বিতীয়বার আর বিদ্যালয়ে ফিরে আসার সাহস পায় না। তারা মনে করে, এই জটিল ব্যবস্থায় তাদের জন্য কোনো জায়গা নেই।
এখানে আরও একটি নীরব বৈষম্য প্রতিনিয়ত কাজ করে চলেছে। শহরাঞ্চলের তুলনায় গ্রামীণ এলাকার শিক্ষার্থী, বিত্তহীন পরিবারের সন্তান, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী এবং বিশেষ করে চরাঞ্চল, হাওর, পাহাড় কিংবা উপকূলীয় অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা কখনোই সমান সুযোগ-সুবিধা পায় না। একই পাঠ্যবই সবার হাতে পৌঁছালেও সবার সামনে জীবনের সমান সম্ভাবনা উন্মুক্ত থাকে না। ফলে শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরেই গভীর অসমতা জমতে থাকে, আর সেই অসমতার অবধারিত শেষ পরিণতি হয় শিক্ষার্থী ঝরে পড়া।
ঠিক এই কারণেই সাত লাখ অনুপস্থিত পরীক্ষার্থীকে কেবল একটি সাধারণ বোর্ড পরীক্ষার খণ্ডিত পরিসংখ্যান হিসেবে দেখলে মস্ত বড় ভুল হবে। এটি বস্তুত বহু বছর ধরে জমে থাকা হাজারো ছোট ছোট সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার সমষ্টি। প্রতিটি অনুপস্থিত শিক্ষার্থীর পেছনে লুকানো আছে একটি অসচ্ছল পরিবার, একটি করুণ গল্প, একটি ভাঙা স্বপ্ন এবং একটি অপূর্ণ সম্ভাবনা। রাষ্ট্র যখন শুধু কতজন পাস করল কিংবা কতজন জিপিএ-৫ পেল-এই বাহ্যিক হিসাব নিয়ে ব্যস্ত থাকে, তখন অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি ঢাকা পড়ে যায়-যারা পরীক্ষার হলেই পৌঁছাতে পারল না, তাদের শেষ পর্যন্ত কী হলো?
এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর পেতে হলে কেবল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের খাতা যথেষ্ট নয়; এর জন্য দরকার দেশের অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান, শ্রমবাজার, শিশু সুরক্ষা, নারী অধিকার এবং স্থানীয় সামাজিক বাস্তবতাকে একসাথে যুক্ত করে দেখা। কারণ, একজন শিক্ষার্থীর পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তটি খুব কম ক্ষেত্রেই কেবল শিক্ষার সমস্যা, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা আমাদের সমাজের সামগ্রিক সংকটেরই একটি বহিঃপ্রকাশ।
বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের মাঝপথে ঝরে পড়ার এই মহামারী কোনো নতুন বিষয় নয়। নতুন বিষয় হলো এর ভয়াবহ মাত্রা এবং এর প্রতি আমাদের সম্মিলিত অসাড়তা ও উদাসীনতা। বছরের পর বছর নানা সরকারি ও আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিবেদনে সতর্কবার্声を দেওয়া হলেও, আমরা বারবার সমস্যাটিকে শুধু ভালো পরীক্ষার ফল বা ভর্তির পরিসংখ্যানে ঢেকে রেখেছি। ফলে শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃত স্বাস্থ্য ও সক্ষমতা সম্পর্কে এক বড় ধরনের সামাজিক বিভ্রম তৈরি হয়েছে। আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার অগ্রগতি মূল্যায়নে আমরা সর্বদা ভর্তি হার, পাসের হার কিংবা জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যা নিয়ে মহাসমারোহে আলোচনা করি। কিন্তু প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া একটি শিশু শেষ পর্যন্ত উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত সুস্থভাবে পৌঁছাতে পারল কিনা-এই প্রশ্নটি খুব কমই তোলা হয়। অথচ একটি দেশের মানবসম্পদ গড়ে তোলার মূল ও প্রকৃত সূচক এই ধারাবাহিকতার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে।
বিভিন্ন গবেষণা স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে যে, দরিদ্র পরিবারের শিশুরা বিত্তবান পরিবারের শিশুদের তুলনায় অনেক বেশি মাত্রায় ঝরে পড়ে। শহরের তুলনায় গ্রাম এবং সমতলের চেয়ে চর, হাওর, পাহাড় ও উপকূলীয় এলাকার শিক্ষার্থীরা সবসময় উচ্চ ঝুঁকিতে অবস্থান করে। প্রতিবন্ধী শিশুরা এখনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে টিকে থাকার লড়াইয়ে নানা কাঠামোগত বাধার মুখোমুখি হচ্ছে। অর্থাৎ, আমাদের শিক্ষাসংকট সবার জন্য সমান নয়, এটি সম্পূর্ণ বৈষম্যের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার সাথে সরাসরি শিশুশ্রমের একটি প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। একটি পরিবার যখন আয়ের চরম সংকটে পড়ে, তখন তাদের প্রথম কোপটি পড়ে শিশুর শিক্ষার ওপর। একজন কিশোর যদি স্কুলে না গিয়ে দিনে কয়েকশ টাকা আয় করে আনতে পারে, তবে অনেক অসচ্ছল পরিবারের কাছে সেটাই কঠিন বাস্তবতার সমাধান মনে হয়। ফলে দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষার চেয়ে তাৎক্ষণিক সামান্য আয় তখন প্রধান হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের বর্তমান শ্রমবাজারের একটি বিরাট অংশ সম্পূর্ণ অনানুষ্ঠানিক। এখানে শিশু ও কিশোরদের নিয়োজিত কাজের সঠিক হিসাব সরকারি খাতায় ধরা পড়ে না। তারা ছোট দোকানে, গ্যারেজে, ইটভাটায়, কৃষিকাজে, পরিবহন খাতে কিংবা গৃহকর্মে যুক্ত থাকে। এরা কোনো পরিসংখ্যানের ভেতরে নেই, কিন্তু এরা সবাই একসময় কোনো না কোনো স্কুলের শিক্ষার্থী ছিল। অর্থাৎ, শিশুশ্রম কেবল শ্রম খাতের সমস্যা নয়, এটি সরাসরি শিক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। মেয়েদের জীবনের চিত্রটি আরও করুণ। বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে দেশে কঠোর আইন থাকলেও বাস্তবে অর্থনৈতিক চাপ, সামাজিক নিরাপত্তার অভাব এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে হাজারো কিশোরীর শিক্ষাজীবন অকালেই শেষ হয়ে যায়। অনেক পরিবার এখনো মনে করে, মেয়ের উচ্চশিক্ষার চেয়ে বিয়ে দেওয়া অনেক বেশি নিরাপদ। ফলে নবম বা দশম শ্রেণিতে উঠতেই অনেক মেয়ের পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায়। এটি শুধু একটি মেয়ের অধিকার কাড়ে না, বরং তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য ও শিক্ষার ওপর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।
দারিদ্র্যের পাশাপাশি শিক্ষার নিম্নমানও শিক্ষার্থীদের স্কুলবিমুখ করে তুলছে। একটি শিশু যদি বছরের পর বছর স্কুলে গিয়েও ঠিকমতো পড়া, লেখা কিংবা প্রাথমিক গণিত না শেখে, তবে তার কাছে স্কুল একসময় সম্পূর্ণ অর্থহীন মনে হয়। তখন পরীক্ষা তার কাছে এক বিরাট ভয়ের নাম হয়ে দাঁড়ায়। সে ধরে নেয়, এই শিক্ষাব্যবস্থায় তার কোনো ভবিষ্যৎ নেই। এর সাথে যুক্ত হয়েছে কোভিড-১৯ মহামারির দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতিকর প্রভাব, যা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় বহু শিক্ষার্থী আর কখনো ক্লাসে ফেরেনি। কেউ কাজে ঢুকেছে, কারও বিয়ে হয়ে গেছে, কেউ পরিবারসহ নতুন স্থানে চলে গেছে, আর কেউ শিক্ষার মানসিক ধারাবাহিকতা হারিয়ে ফেলেছে। মহামারির সেই গভীর ক্ষত আজ এত বছর পর এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
এখন আমাদের গভীরভাবে ভাবতে হবে-ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের খুঁজে বের করার কোনো কার্যকর জাতীয় মেকানিজম বা ব্যবস্থা আমাদের আছে কি না? একজন শিশু যদি হঠাৎ স্কুলে আসা বন্ধ করে দেয়, তবে কে তার খোঁজ নেয়? বিদ্যালয়, স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি নাকি সমাজসেবা বিভাগ? বাস্তবে দেখা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর অনুপস্থিতি একসময় স্বাভাবিক ধরে নেওয়া হয় এবং সে স্থায়ীভাবে শিক্ষা থেকে ছিটকে পড়ে। আজ বিশ্বের অনেক উন্নয়নশীল দেশে ‘উইথড্রয়াল প্রারম্ভিক সতর্কবার্তা’ (Early Warning System) চালুর মাধ্যমে শিক্ষার্থী ধরে রাখা হচ্ছে। উপস্থিতি কমলে বা ফল খারাপ হলে অবিলম্বে পরিবার ও প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করা হয়। বাংলাদেশেও এই ধরনের ডেটাভিত্তিক আধুনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
কারণ, শিক্ষা থেকে হারিয়ে যাওয়া প্রতিটি শিক্ষার্থী কেবল একটি সংখ্যা নয়; এর মাধ্যমে দেশের একজন সম্ভাব্য দক্ষ কারিগর, উদ্যোক্তা, শিক্ষক, চিকিৎসক কিংবা বিজ্ঞ নাগরিকের অকাল মৃত্যু ঘটে। জাতীয় অর্থনীতিকে এর জন্য বড় মূল্য দিতে হয়। কম শিক্ষিত শ্রমশক্তি দিয়ে কখনো উচ্চ আয়ের আধুনিক দেশ গড়া যায় না। জনসংখ্যাকে প্রকৃত জনসম্পদে রূপান্তর করতে হলে শিক্ষার ধারাবাহিকতা ধরে রাখাই সর্বশ্রেষ্ঠ সামাজিক বিনিয়োগ। তাই সাত লাখ অনুপস্থিত পরীক্ষার্থীকে কেবল একটি একক পরীক্ষার বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখলে মস্ত বড় ভুল হবে। এটি আমাদের জাতীয় ব্যবস্থার কাছে এক মৌলিক প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে-আমরা কি কেবল শিশুদের ভর্তি করাতে পেরেছি, নাকি তাদের সত্যিকার অর্থে শিক্ষিত করতে পেরেছি? এই প্রশ্নের বস্তুনিষ্ঠ উত্তর না খুঁজলে আগামী বছরগুলোতেও লাখ লাখ শিক্ষার্থী একইভাবে নীরবে হারিয়ে যাবে, আর আমরা কেবল পাসের হারের উৎসব নিয়ে সন্তুষ্ট থাকব।
এই গভীর সংকট থেকে মুক্তি পেতে হলে প্রথমেই আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। শিক্ষা আলোচনা মানেই কেবল জিপিএ-৫ আর পাসের হার নয়; মূল বিষয় হতে হবে কতজন শিক্ষার্থী শেষ পর্যন্ত টিকে থাকল এবং যারা হারিয়ে গেল তারা কেন গেল। এই প্রশ্নগুলোকে শিক্ষা সংক্রান্ত প্রতিটি নীতির মূল কেন্দ্রে নিয়ে আসতে হবে। প্রথমত, জরুরি ভিত্তিতে একটি সমন্বিত ‘জাতীয় শিক্ষার্থী ট্র্যাকিং ব্যবস্থা’ (National Student Tracking System) চালু করতে হবে। একজন শিশু প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির পর থেকে তার পড়াশোনার সমস্ত উপাত্ত একক ডেটাবেজে থাকবে। কেউ দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকলে বা ঝরে পড়লে তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয় প্রশাসন ও সমাজসেবা বিভাগকে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সতর্কবার্তা পাঠাতে হবে।
দ্বিতীয়ত, দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত পরিবারের জন্য শিক্ষাকে শতভাগ ব্যয়মুক্ত করতে হবে। শুধু বিনামূল্যে বই দেওয়া যথেষ্ট নয়; যাতায়াত, পরীক্ষার ফি, পোশাক ও ডিজিটালি সংযুক্ত হওয়ার যাবতীয় ব্যয় সরকারকে বহনের উদ্যোগ নিতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারকে বিশেষ নগদ অর্থ সহায়তা (Cash Transfer) প্রদান করতে হবে। তৃতীয়ত, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার পরিবেশকে আনন্দদায়ক ও জীবনের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ করতে হবে। কেবল মুখস্থনির্ভর পরীক্ষা ব্যবস্থার বদলে সৃজনশীলতা, কারিগরি জ্ঞান, প্রযুক্তি, খেলাধুলা ও শারীরিক-মানসিক স্বাস্থ্যকে সমান গুরুত্ব দিয়ে পাঠ্যক্রম আধুনিক করতে হবে।
চতুর্থত, বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রমের আইনি প্রয়োগের পাশাপাশি অভিভাবকভিত্তিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক সহায়তার হাত বাড়াতে হবে। অসচ্ছল পরিবারকে উপযুক্ত আর্থিক নিরাপত্তা দিলে তবেই তারা সন্তানকে কাজে না পাঠিয়ে স্কুলে পাঠাতে উৎসাহিত হবে। পঞ্চমত, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে মূলধারার সমকক্ষ মর্যাদা দিতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক সাধারণ শিক্ষায় যারা ভালো করতে পারছে না, তাদের ঝরে পড়তে না দিয়ে দ্রুত আধুনিক কারিগরি শিক্ষায় যুক্ত করার পথ তৈরি করতে হবে। একই সাথে শিক্ষকদের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকা নতুন করে সাজাতে হবে। একজন শিক্ষককে শুধু ক্লাসের পাঠদানকারী নয়, বরং শিক্ষার্থীর পরিবর্তনের মূল নজরদারিকারী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষার্থী কেন ক্লাসে আসছে না তা জানার সক্ষমতা ও সুযোগ শিক্ষকদের দিতে হবে। সর্বোপরি, আমাদের পরিসংখ্যান প্রকাশের ভাষাও পরিবর্তন করা দরকার। শিক্ষা মন্ত্রণালয় যখন পাসের হার প্রকাশ করবে, তখন একই সাথে কতজন নিবন্ধিত শিক্ষার্থী পরীক্ষায় বসতে পারল না, কতজন ঝরে গেল এবং তাদের ফেরাতে সরকার কী পদক্ষেপ নিচ্ছে-তাও গণমাধ্যমে প্রকাশ করা উচিত। এতে নীতি নির্ধারকদের জবাবদিহিতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে।
একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত সফলতা কেবল তার অল্প কিছু মেধার অর্জনে নয়; বরং পিছিয়ে পড়া দুর্বল নাগরিকদের কতটা টেনে তোলা গেল তার ওপর নির্ভর করে। যে শিশুটি পরীক্ষার হলে পৌঁছাতে পারেনি, তার এই ব্যর্থতার দায় পুরো রাষ্ট্রের। সে হারিয়ে গেলে ক্ষতি কেবল তার পরিবারের নয়, অপূরণীয় ক্ষতি সমগ্র বাংলাদেশের। বাংলাদেশ আজ উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশ হওয়া, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব এবং উন্নত অর্থনীতির নতুন স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু যে শিক্ষার মূল ভিত্তিতে প্রতিদিন বড় ফাটল ধরছে, প্রতিবছর লাখ লাখ তরুণ শিক্ষার মূলধারা থেকে ছিটকে পড়ছে, সেই ভঙ্গুর কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে কোনো সুউচ্চ উন্নয়ন অট্টালিকা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। এই সাত লাখ অনুপস্থিত পরীক্ষার্থী তাই আমাদের জন্য এক চূড়ান্ত সতর্কসংকেত, যা আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে শিক্ষ ব্যবস্থার বাইরে আজ এক চরম অনিশ্চিত বাংলাদেশ তৈরি হচ্ছে। এখনই তাদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ না নিলে, একসময় হয়তো বিশাল এক অপূরণীয় জাতীয় ক্ষতির মুখোমুখি হতে হবে।
রিপোর্টারের নাম 
























