কিছু মানুষ পৃথিবীতে আসেন খুব অল্প সময়ের জন্য, কিন্তু চিরতরে নিভে যাওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে তাঁরা হয়ে ওঠেন অন্যের জীবনের অনন্ত আলোকবর্তিকা। মৃত্যু তাঁদের নাম বা স্মৃতিকে কখনো নিশ্চিহ্ন করতে পারে না। এমনই এক অনন্য, নির্লোভ ও মহীয়সী নারী ছিলেন মাহেরীন চৌধুরী। পেশায় তিনি ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষিকা, কিন্তু মৃত্যুর একেবারে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তিনি প্রমাণ করে গেছেন—তিনি কেবল শ্রেণিকক্ষের সাধারণ শিক্ষক ছিলেন না, ছিলেন অসীম মমতাময়ী এক মা।
বিভীষিকাময় সেই দুপুর: ঘটনাটি গত বছরের ২১ জুলাইয়ের। সময় দুপুর ১টা বেজে ১৮ মিনিট। রাজধানীর উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে সবেমাত্র দিনের মতো ছুটি হয়েছে। অন্য আর দশটা সাধারণ দিনের মতোই বাংলা মাধ্যমের সিনিয়র শিক্ষিকা ও কো-অর্ডিনেটর মাহেরীন চৌধুরী বিদ্যালয়ের প্রধান গেটের সামনে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত পরম স্নেহে শিশুদের তুলে দিচ্ছিলেন অভিভাবকদের হাতে। ঠিক সেই মুহূর্তেই বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি এফ-৭ বিজিআই (F-7 BGI) প্রশিক্ষণ বিমান বিকট শব্দে আছড়ে পড়ে উত্তরার সেই স্কুলভবনের ওপর।
উড়োজাহাজটি মুহূর্তের মধ্যে বিল্ডিং ভেদ করে মাটির নিচে ঢুকে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। চারদিকে শুরু হয় ভয়াবহ বিস্ফোরণ আর মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে আগুনের লেলিহান শিখা। পুরো দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ৩২ জনে। ঘটনার সময় ৪২ বছর বয়সী শিক্ষিকা মাহেরীন চৌধুরী সম্পূর্ণ অক্ষত ও নিরাপদ ছিলেন। তিনি চাইলে নিজের জীবন বাঁচাতে মুহূর্তেই নিরাপদ দূরত্বে সরে যেতে পারতেন। কিন্তু নিজের প্রাণের মায়া পুরোপুরি তুচ্ছ করে তিনি সোজা ঝাঁপিয়ে পড়েন আগুনের ভয়াল কুণ্ডলীতে, কেবল তাঁর প্রাণপ্রিয় কোমলমতি শিক্ষার্থীদের বাঁচানোর তাগিদে।
ভয়ে সন্ত্রাস ও আতঙ্কিত শিশুদের তিনি একে একে জ্বলন্ত ঘর থেকে বের করে আনতে থাকেন। আগুনের ঘন ও কালো ধোঁয়ার ভেতর দিয়ে তিনি অন্তত ২০ জনেরও বেশি শিশু শিক্ষার্থীকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দিতে সক্ষম হন। শিশুদের বুকে সাহস জুগিয়ে তিনি প্রতিনিয়ত বলছিলেন—‘ভয় পেয়ো না, দৌড়াও সামনের দিকে, পেছনে তাকিও না। আমি আছি তোমাদের সঙ্গে।’
বাচ্চাদের আগুনের মুখ থেকে বের করার একপর্যায়ে হঠাৎ সেখানে আরেকটি ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে, যার ফলে আগুনের তীব্রতা একলক্ষে বেড়ে যায় বহুগুণ। কিন্তু শিশুদের বাঁচাতে গিয়ে এবার নিজেই আগুনের শিখায় মারাত্মকভাবে ঝলসে যান মাহেরীন। সেখানে উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া এক সেনা সদস্য চরম আক্ষেপ নিয়ে বলেছিলেন, ‘ম্যাডাম একে একে বাচ্চাগুলো বের করে দিচ্ছিলেন, কিন্তু নিজে আর সময়মতো বের হতে পারেননি।’
‘আমার বাচ্চারা পুড়ে মরছে, আমি কীভাবে সহ্য করি’: আগুনে আশঙ্কাজনকভাবে দগ্ধ মাহেরীনকে দ্রুত উদ্ধার করে ভর্তি করা হয় ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে। চিকিৎসকেরা জানান, তাঁর শরীরের ১০০ শতাংশ অংশই পুড়ে গিয়েছিল এবং তাঁর বেঁচে থাকার কোনো বাস্তবিক আশা ছিল না। চরম শারীরিক যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে তিনি বারবার বলছিলেন, ‘আমার বুক-পেট সব জ্বলে যাচ্ছে।’
লাইফ সাপোর্টে নেওয়ার ঠিক আগে তাঁর স্বামী মনছুর হেলালের সঙ্গে মাহেরীনের জীবনের শেষ কথা হয়। স্বামী মনছুর যখন কান্নাভেজা কণ্ঠে তাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘কেন এ কাজ করতে গেলে, তোমারও তো ঘরে দুটি সন্তান আছে?’ উত্তরে মাহেরীন চৌধুরী দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, ‘আমার বাচ্চারা আমার চোখের সামনে সব পুড়ে মারা যাচ্ছে, আমি এটা কীভাবে সহ্য করি!’
অবশেষে ২১ জুলাই রাতেই সকল শারীরিক যন্ত্রণার চির অবসান ঘটিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান এই বীর শিক্ষক। নীলফামারীর জলঢাকার বগুলাগাড়ি চৌধুরীপাড়ার সন্তান চিরতরে ঘুমিয়ে পড়েন, তবে পেছনে রেখে যান পুরো দেশকে চোখের জলে ভাসানো এক অসীম বীরত্বের উপাখ্যান।
পরিচয়ের আড়ালে থাকা এক সাদামাটা জীবন: মাহেরীন চৌধুরী কেবল একজন নিবেদিত শিক্ষিকা ছিলেন না; তাঁর একটি ঐতিহ্যবাহী ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিচয়ও ছিল। কিন্তু জীবদ্দশায় তিনি কখনোই সেই পারিবারিক বা রাজনৈতিক পরিচয়ের অহংকার প্রকাশ করেননি। তিনি ছিলেন মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আপন ভাতিজি এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চাচাতো বোন।
আমাদের সমাজে যেখানে সামান্য রাজনৈতিক পরিচয় ভাঙিয়ে মানুষ নানা সুবিধা নেওয়ার সুযোগ খোঁজে, সেখানে মাহেরীন ছিলেন সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম ও ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব। তিনি সবসময় চরম নির্লোভ ও সাদামাটা জীবনযাপন পছন্দ করতেন। নিজের বড় রাজনৈতিক পরিচয় গোপনে আড়াল করে রেখে তিনি নীরবে শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করে গেছেন।
তিনি ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক আন্দোলনেও নিজস্ব অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ ভূমিকা রেখেছিলেন। তবে ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কোনো প্রকার সুবিধা বা রাজনৈতিক ফায়দা না লুটে তিনি অত্যন্ত নিঃশব্দে ও বিনয়ের সাথে ফিরে গিয়েছিলেন তাঁর প্রিয় শিক্ষকতা পেশায়।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও অশ্রুসিক্ত বিদায়: মাহেরীন চৌধুরীর এই আত্মত্যাগ শুধু বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়কেই নাড়া দেয়নি, বরং ছুঁয়ে গেছে আন্তর্জাতিক অঙ্গন ও বিশ্বনেতাদেরও। মালয়েশিয়ার মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম তাঁর নিজস্ব ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে পোস্ট করে এই বীর শিক্ষিকার ভূয়সী প্রশংসা করে লিখেছেন, ‘তিনি তাঁর শিক্ষার্থীদের প্রথমে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেন এবং আরও বহু শিক্ষার্থীকে বাঁচাতে চরম সাহসিকতার সঙ্গে ধোঁয়া ও আগুনের ভেতরে পুনরায় ফিরে যান। তাঁর এই অসীম সাহসিকতা বিশ্ব কখনো ভুলবে না।’ তাঁর এক শোকাহত শিক্ষার্থী সামাজিক মাধ্যমে আবেগঘন কণ্ঠে লিখেছে, ‘শিক্ষক শুধু পাঠ্যবইয়ের পড়া শেখান না, তিনি শেখান কীভাবে প্রকৃত মানুষ হতে হয়। মাহেরীন ম্যাম ছিলেন ঠিক তেমনই একজন অনন্য শিক্ষক।’
মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার: সমাজসেবা ও শিক্ষাক্ষেত্রে চরম গৌরবোজ্জ্বল ও কৃতী অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সরকার মাহেরীন চৌধুরীকে মর্যাদাপূর্ণ ‘মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার’-এ ভূষিত করে। গত ১৬ এপ্রিল রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে তাঁর পক্ষে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত থেকে এই সর্বোচ্চ জাতীয় পদক গ্রহণ করেন মাহেরীনের শ্রদ্ধেয় স্বামী মনসুর হেলাল।
রিপোর্টারের নাম 

























