ঢাকা ০৩:১৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬

‘জাতীয় পাহাড়ি কৃষি মিশন’ গঠন ও টেকসই সবুজ অর্থনীতির নতুন স্বপ্ন

পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলকে সমতলের সাধারণ মানুষ সাধারণত একটু ভিন্ন ও আলাদা দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখে অভ্যস্ত। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কাছে এই পাহাড়ি ভূখণ্ড মানেই হলো অত্যন্ত দুর্গম যোগাযোগের পথ, পরিবেশগত নানা ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঝুঁকি এবং আর্থ-সামাজিক অবস্থান থেকে অনেকটাই পিছিয়ে থাকা একটি কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং ভৌগোলিক এলাকা। তবে এই প্রচলিত ধ্যান-ধারণা ও নেতিবাচক ভাবনার বাইরেও পার্বত্য চট্টগ্রাম বস্তুত বাংলাদেশের অর্থনীতি ও কৃষির অন্যতম বড় এক অব্যবহৃত ও অপার সম্ভাবনাময় সম্পদ।

আমাদের প্রিয় মাতৃভূমির মোট আয়তনের প্রায় দশ ভাগের এক ভাগ সুবিশাল অংশ জুড়ে অবস্থান করছে তিন পাহাড়ি জেলা—রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান। প্রচুর পরিমাণে বার্ষিক বৃষ্টিপাত, ভৌগোলিক বৈচিত্র্যময় পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি আর অসাধারণ জীবনধারার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে ঘেরা আমাদের এই অনন্য অঞ্চল। তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে সবচেয়ে বড় ও আশার কথা হলো— আমাদের এই পার্বত্য চট্টগ্রাম আগামী দিনে উচ্চমূল্যের উন্নত কৃষি, সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব চাষাবাদ ব্যবস্থা এবং সামগ্রিক সবুজ অর্থনীতির প্রধান কেন্দ্রে রূপান্তরিত হতে পারে।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ বর্তমানে সাধারণ প্রধান খাদ্যশস্য (যেমন ধান ও গম) উৎপাদনে প্রায় শতভাগ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। তাই বর্তমান প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে আমাদের দেশের কৃষিনীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ফসলের বহুমুখীকরণ করা, প্রান্তিক কৃষকের সার্বিক আয় বৃদ্ধি করা এবং বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতামূলক রপ্তানিমুখী আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা। উন্নয়নের এই নতুন ও গতিশীল ধাপে এসে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলটি বিশেষ জাতীয় মনোযোগ ও মহাপরিকল্পনার জোর দাবি রাখে। সঠিক রাষ্ট্রীয় নীতিমালা, আধুনিক বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন এবং ধারাবাহিক টেকসই বিনিয়োগের মাধ্যমে আমাদের এই সুবিশাল পাহাড়গুলো পুরো দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের জন্য পরিবেশবান্ধব পাহাড়ি কৃষির এক অনন্য ও অনুকরণীয় মডেল হয়ে উঠতে পারে।

পাহাড়ের ভিন্নধর্মী অনন্য কৃষি পরিবেশ: সমতলের কৃষিব্যবস্থার চেয়ে পাহাড়ের কৃষির প্রকৃতি ও ধরণ একেবারেই ভিন্ন ও স্বতন্ত্র। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়, বিস্তৃত উপত্যকা ও ঢালু জমিগুলো সব মিলিয়ে এমন এক চমৎকার ও বৈচিত্র্যময় জলবায়ু পরিবেশ তৈরি করেছে, যা নানা ধরণের অর্থকরী ফসল উৎপাদনের জন্য দারুণ উপযোগী ও বৈপ্লবিক। এই অঞ্চলে বছরে প্রায় দুই হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত নথিভুক্ত হয়। এছাড়া বছরের বেশির ভাগ সময়েই আবহাওয়া ও তাপমাত্রা বিভিন্ন ফসল ও ফলমূল উৎপাদনের পুরোপুরি অনুকূলেই অবস্থান করে।

এই ধরণের প্রাকৃতিক পরিবেশ ফলজ ফলের বাগান, উচ্চমূল্যের মসলাজাতীয় ফসল, বাণিজ্যিক বাগিচা ফসল, বহুমুখী কৃষি বনায়ন এবং বিরল ঔষধি গাছের আবাদের জন্য অত্যন্ত আদর্শ। সমতলের সাধারণ জলাবদ্ধ বা অতিরিক্ত আর্দ্র মাটিতে যেসব সংবেদনশীল ফসল ভালো জন্মে না বা পচে যায়, পাহাড়ের দ্রুত পানি নিষ্কাশন সুবিধাযুক্ত মাটিতে তা দারুণভাবে বেড়ে ওঠে। বর্তমান বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের এই কঠিন সময়ে দেশের সামগ্রিক কৃষিতে এমন ফসলি বহুমুখীকরণ অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যে কোনো এলাকার কৃষি ব্যবস্থার সার্বিক উন্নতির অন্যতম প্রধান ও প্রথম শর্ত হলো সেই মাটির উর্বরতা ও গুণগত স্বাস্থ্য। বছরের পর বছর ধরে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে পাহাড়ি অঞ্চলের মাটি কিছুটা অম্লীয় (Acidic) প্রকৃতির হয়ে থাকে, যার ফলে মাটিতে প্রয়োজনীয় জৈব সার ও প্রাকৃতিক পুষ্টি উপাদানের কিছুটা ঘাটতি তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। এছাড়া খাড়া ঢালের ভৌগোলিক গঠনের কারণে শুষ্ক মৌসুমে পাহাড়ি মাটি সহজেই নিজের রস বা আর্দ্রতা ধরে রাখতে পারে না। তবে কৃষি বিজ্ঞানীদের মতে, এগুলো কোনো স্থায়ী বা সমাধান অযোগ্য সমস্যা নয়। আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক বৈচিত্র্যময় উপায়ে এসবের স্থায়ী সমাধান করা পুরোপুরি সম্ভব। মাটিতে সঠিক পরিমাণ সার, প্রাকৃতিক কম্পোস্ট ও জৈব সার পরিমিত ব্যবহারের মাধ্যমে পাহাড়ি মাটির প্রাকৃতিক উর্বরতা শক্তি এবং সার্বিক ফসলি উৎপাদন ক্ষমতা দুটিই বহুলাংশে বাড়ানো যায়। মাটি শুধু ফসল ফলায় না; এটি পানি ধরে রাখে এবং সামগ্রিক জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখতে ভূমিকা রাখে। তাই পাহাড়ের কৃষি উন্নয়নের মূল ভিত্তি হতে হবে সেখানকার মাটির গুণগত স্বাস্থ্য রক্ষা করা।

পাহাড়ের প্রান্তিক কৃষির সবচেয়ে বড় শত্রু সমতল জমির অভাব বা বৃষ্টির সংকট নয়; বরং ঢালু পাহাড়ের ওপরের অতি উর্বর মাটির স্তর ধুয়ে ক্ষয়ে যাওয়া (Soil Erosion)। বর্ষার মৌসুমে অতি ভারী বৃষ্টিপাতে খাড়া ঢালু পাহাড়ের ওপরের পুষ্টিসমৃদ্ধ উর্বর মাটির আস্তরণ সহজে ধুয়ে যায়, যার সুদূরপ্রসারী পরিণতি হিসেবে পাহাড়ে ঘন ঘন মারাত্মক পাহাড়ধসের মতো মর্মান্তিক ঘটনাও ঘটে। প্রতি বছর আমরা পাহাড়ের বিপুল পরিমাণ পুষ্টিসমৃদ্ধ মাটি চিরতরে হারাচ্ছি। অনবরত এই ভূমিক্ষয়ের কারণে কেবল যে কৃষির ফলনই আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায় তা নয়, বরং ধুয়ে যাওয়া মাটিতে পাহাড়ি নদ-নদীর নাব্যতা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গিয়ে সমতলে বন্যার ভয়াবহ ঝুঁকি বাড়ে এবং যাতায়াতের রাস্তাঘাট নষ্ট হয়ে যায়। মাত্র এক বর্ষার ঢলে যে মূল্যবান উর্বর মাটি ধুয়ে নেমে যায়, প্রকৃতির নিয়মে তা পুনরায় তৈরি হতে বহু বছর পার হয়ে যায়। তাই পাহাড়ের এই উর্বর মাটি রক্ষা করা এখন কেবল কৃষির জন্য নয়, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও পরিবেশ রক্ষায় অত্যন্ত জরুরি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আদিবাসী ঐতিহ্যের মূল্যায়ন ও আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া: যুগের পর যুগ ধরে পার্বত্য অঞ্চলের বিভিন্ন আদিবাসী ও পাহাড়ি জনগোষ্ঠী প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিয়ে সনাতনী ‘জুম চাষ’ পদ্ধতি অনুসরণ করে আসছে। অতীতে এক খণ্ড জমিতে জুম চাষের পর মাটি পুনর্গঠনের জন্য সেই জমি দীর্ঘদিন খালি বা পতিত ফেলে রাখা হতো, যার ফলে মাটি স্বাভাবিকভাবেই তার হারিয়ে যাওয়া উর্বরতা ফিরে পেত। কিন্তু আধুনিক সময়ে পার্বত্য অঞ্চলে জনসংখ্যা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় জমির ওপর সার্বিক চাপ অনেক গুণ বেড়েছে; ফলে জুম চাষের বিরতির চক্র বা সময় অনেকটাই ছোট হয়ে এসেছে, যা পরিবেশের ভারসাম্য ও মাটির জন্য বড় ধরনের ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

তবে টেকসই ভবিষ্যতের বাহ্যিক উন্নয়নের দোহাই দিয়ে পাহাড়ে আদিবাসীদের এই ঐতিহ্যবাহী চাষ পদ্ধতিকে হঠাৎ করে বা জোরপূর্বক বন্ধ করে দেওয়া মোটেও ঠিক হবে না। বরং তাঁদের শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অর্জিত এই আদি জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে আধুনিক কৃষি বিজ্ঞানের একটি চমৎকার সমন্বয় ঘটাতে হবে। পরিবেশবান্ধব আধুনিক কৃষি বনায়ন এবং পরিকল্পিত মিশ্র চাষের (Mixed Cropping) মাধ্যমে স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেই পরিবেশ উপযোগী উন্নত বিকল্প গড়ে তোলা সম্ভব।

সবচেয়ে আশার বিষয় হলো, পাহাড়ি আধুনিক কৃষির উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় অনেক উন্নত প্রযুক্তি ও কৌশল এখন আমাদের দেশীয় বিজ্ঞানীদের হাতেই রয়েছে। সুপরিকল্পিত কৃষি বনায়ন, বাণিজ্যিক বাঁশ চাষ, পাহাড়ি ঢালে মাটি ধরে রাখার জন্য বিন্না ঘাসের (Vetiver Grass) ব্যাপক ব্যবহার এবং আর্দ্রতা রক্ষায় মালচিং পদ্ধতির মতো আধুনিক উপায়গুলো ব্যবহার করে মাটির ক্ষয় পুরোপুরি রোধ করা সম্ভব। পাশাপাশি বৃষ্টির পানি বৈজ্ঞানিকভাবে ধরে রাখার (Rainwater Harvesting) কৌশলগুলো পাহাড়কে রক্ষা করতে বিশাল ভূমিকা রাখতে পারে।

আমাদের দেশে এই সংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক গবেষণার একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত ভিত্তি ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে। দেশের শীর্ষ গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট’ (বারি), বিশেষ করে খাগড়াছড়ির রামগড় পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্র এই বিষয়ে গত কয়েক বছরে দারুণ সব সাফল্য এনে দিয়েছে। বারি’র নিবেদিত বিজ্ঞানীরা পাহাড়ের পরিবেশের উপযোগী উন্নত জাতের আম, আনারস, কলা, লেবু, আদা, হলুদের পাশাপাশি উচ্চমূল্যের কফি, কাজুবাদাম, ড্রাগন ফল এবং অ্যাভোকাডোর মতো বিদেশি ফল ও অর্থকরী ফসলের উন্নত জাত ও সহজ চাষপদ্ধতি সফলভাবে উদ্ভাবন করেছেন। এখন শুধু প্রয়োজন সরকারি ও বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে এই আধুনিক প্রযুক্তি ও জাতগুলো দ্রুত পাহাড়ি প্রান্তিক কৃষকদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া।

পার্বত্য অঞ্চলে অপেক্ষায় এক নীরব কৃষি বিপ্লব: পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলটি পরিকল্পিত রূপরেখা পেলে খুব সহজেই সমগ্র বাংলাদেশের ‘ফলের রাজধানী’ বা প্রধান উদ্যানতাত্ত্বিক (Horticultural) কেন্দ্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। প্রচলিত ফলমূলের পাশাপাশি বর্তমানে পাহাড়ে নতুন নতুন বিদেশি ও বাণিজ্যিক ফলের আবাদ দ্রুত বাড়ছে। এছাড়া পাহাড়ে উৎপাদিত আদা, হলুদ ও গোলমরিচের মতো খাঁটি মসলা জাতীয় ফসলের আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক রপ্তানির সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে। এসব অর্থকরী ফসল সাধারণ ধান বা গমের চাষের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি লাভজনক এবং এসব বহুবর্ষজীবী গাছ সারা বছর পাহাড়ের ঢালকে সবুজ রাখার মাধ্যমে মাটি ধ্বংসের হাত থেকেও সুরক্ষা দেয়।

বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবে পার্বত্য অঞ্চলেও বৃষ্টিপাতের ধরণ বদলাচ্ছে এবং পাহাড়ধসের প্রবণতা বাড়ছে। তাই এখন কেবল উৎপাদন বাড়ানোর কথা ভাবলেই চলবে না, বরং একই সাথে প্রকৃতিকে ধরে রাখার ও টিকিয়ে রাখার সার্বিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। আর এই লক্ষ্য অর্জনে জরুরি ভিত্তিতে একটি সুনির্দিষ্ট ‘জাতীয় পাহাড়ি কৃষি মিশন’ (National Hill Agriculture Mission) চালুর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সময়ের দাবি। এই প্রস্তাবিত মিশনের অধীনে সরকারি দপ্তরসমূহ, কৃষি গবেষক, বেসরকারি শিল্প উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারী এবং স্থানীয় পাহাড়ি ও সমতলের মানুষকে এক ছাতার নিচে এসে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

এই ক্ষেত্রে আমাদের নিকটবর্তী প্রতিবেশী দেশ থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম কিংবা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর (North-East India) সফল উদাহরণগুলো দারুণ মডেল হতে পারে, যারা তাদের পাহাড়ি অঞ্চলগুলোকে সফলভাবে জাতীয় অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত করেছে। তাদের সফল অভিজ্ঞতার আলোকেই আমাদের পাহাড়ি কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের জন্য লাভজনক বাজার ব্যবস্থার সাথে যুক্ত করতে হবে। এর জন্য পাহাড়ি এলাকায় গ্রামীণ যাতায়াত ব্যবস্থা ও রাস্তাঘাট উন্নয়ন, আধুনিক হিমাগার (Cold Storage) স্থাপন, এবং কোল্ড চেইন, প্যাকেজিং ও কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের জরুরি বিকাশ ও সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ প্রয়োজন। পাহাড়ে উৎপাদিত ফল ও মসলা স্থানীয়ভাবে প্রক্রিয়াজাত করে বিভিন্ন জুস, শুকনো খাবার বা গুঁড়ো মসলা তৈরি করার শিল্প গড়তে পারলে পচনশীল ফসল নষ্ট হওয়া শূন্যে নেমে আসবে এবং কৃষকের অর্জিত আয় বহুলাংশে বাড়বে।

বাংলাদেশ যখন একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হওয়ার পথে দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রাম হতে পারে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পাহাড়ি কৃষির এক অনন্য বৈশ্বিক মডেল। তবে এই সুদূরপ্রসারী স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক ও নীতিগত সদিচ্ছা। পাহাড় কোনো বাণিজ্যিক শোষণের জায়গা নয়; এটি অত্যন্ত পরম মমতায় লালন করার প্রাকৃতিক স্থান। আমরা যদি পাহাড়ের রত্নগর্ভা মাটি, চারপাশের বন, প্রবাহমান পানি ও স্থানীয় বৈচিত্র্যময় মানুষের পেছনে সঠিকভাবে মেধা ও অর্থের বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে পারি, তবে এই পাহাড়ি অঞ্চলই হয়ে উঠবে আমাদের জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।

আগামী দিনের বাংলাদেশের সবুজ ও সমৃদ্ধ কৃষির নতুন সূর্য হয়তো এই চোখ জুড়ানো পাহাড়ের চূড়া থেকেই প্রথম উদিত হবে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

বন্যাদুর্গতদের পাশে ‘দ্য ইয়ুথ রেজোন্যান্স’: চট্টগ্রামে তিন দিনের ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প

‘জাতীয় পাহাড়ি কৃষি মিশন’ গঠন ও টেকসই সবুজ অর্থনীতির নতুন স্বপ্ন

আপডেট সময় : ০৯:৫৫:০০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলকে সমতলের সাধারণ মানুষ সাধারণত একটু ভিন্ন ও আলাদা দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখে অভ্যস্ত। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কাছে এই পাহাড়ি ভূখণ্ড মানেই হলো অত্যন্ত দুর্গম যোগাযোগের পথ, পরিবেশগত নানা ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঝুঁকি এবং আর্থ-সামাজিক অবস্থান থেকে অনেকটাই পিছিয়ে থাকা একটি কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং ভৌগোলিক এলাকা। তবে এই প্রচলিত ধ্যান-ধারণা ও নেতিবাচক ভাবনার বাইরেও পার্বত্য চট্টগ্রাম বস্তুত বাংলাদেশের অর্থনীতি ও কৃষির অন্যতম বড় এক অব্যবহৃত ও অপার সম্ভাবনাময় সম্পদ।

আমাদের প্রিয় মাতৃভূমির মোট আয়তনের প্রায় দশ ভাগের এক ভাগ সুবিশাল অংশ জুড়ে অবস্থান করছে তিন পাহাড়ি জেলা—রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান। প্রচুর পরিমাণে বার্ষিক বৃষ্টিপাত, ভৌগোলিক বৈচিত্র্যময় পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি আর অসাধারণ জীবনধারার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে ঘেরা আমাদের এই অনন্য অঞ্চল। তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে সবচেয়ে বড় ও আশার কথা হলো— আমাদের এই পার্বত্য চট্টগ্রাম আগামী দিনে উচ্চমূল্যের উন্নত কৃষি, সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব চাষাবাদ ব্যবস্থা এবং সামগ্রিক সবুজ অর্থনীতির প্রধান কেন্দ্রে রূপান্তরিত হতে পারে।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ বর্তমানে সাধারণ প্রধান খাদ্যশস্য (যেমন ধান ও গম) উৎপাদনে প্রায় শতভাগ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। তাই বর্তমান প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে আমাদের দেশের কৃষিনীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ফসলের বহুমুখীকরণ করা, প্রান্তিক কৃষকের সার্বিক আয় বৃদ্ধি করা এবং বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতামূলক রপ্তানিমুখী আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা। উন্নয়নের এই নতুন ও গতিশীল ধাপে এসে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলটি বিশেষ জাতীয় মনোযোগ ও মহাপরিকল্পনার জোর দাবি রাখে। সঠিক রাষ্ট্রীয় নীতিমালা, আধুনিক বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন এবং ধারাবাহিক টেকসই বিনিয়োগের মাধ্যমে আমাদের এই সুবিশাল পাহাড়গুলো পুরো দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের জন্য পরিবেশবান্ধব পাহাড়ি কৃষির এক অনন্য ও অনুকরণীয় মডেল হয়ে উঠতে পারে।

পাহাড়ের ভিন্নধর্মী অনন্য কৃষি পরিবেশ: সমতলের কৃষিব্যবস্থার চেয়ে পাহাড়ের কৃষির প্রকৃতি ও ধরণ একেবারেই ভিন্ন ও স্বতন্ত্র। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়, বিস্তৃত উপত্যকা ও ঢালু জমিগুলো সব মিলিয়ে এমন এক চমৎকার ও বৈচিত্র্যময় জলবায়ু পরিবেশ তৈরি করেছে, যা নানা ধরণের অর্থকরী ফসল উৎপাদনের জন্য দারুণ উপযোগী ও বৈপ্লবিক। এই অঞ্চলে বছরে প্রায় দুই হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত নথিভুক্ত হয়। এছাড়া বছরের বেশির ভাগ সময়েই আবহাওয়া ও তাপমাত্রা বিভিন্ন ফসল ও ফলমূল উৎপাদনের পুরোপুরি অনুকূলেই অবস্থান করে।

এই ধরণের প্রাকৃতিক পরিবেশ ফলজ ফলের বাগান, উচ্চমূল্যের মসলাজাতীয় ফসল, বাণিজ্যিক বাগিচা ফসল, বহুমুখী কৃষি বনায়ন এবং বিরল ঔষধি গাছের আবাদের জন্য অত্যন্ত আদর্শ। সমতলের সাধারণ জলাবদ্ধ বা অতিরিক্ত আর্দ্র মাটিতে যেসব সংবেদনশীল ফসল ভালো জন্মে না বা পচে যায়, পাহাড়ের দ্রুত পানি নিষ্কাশন সুবিধাযুক্ত মাটিতে তা দারুণভাবে বেড়ে ওঠে। বর্তমান বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের এই কঠিন সময়ে দেশের সামগ্রিক কৃষিতে এমন ফসলি বহুমুখীকরণ অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যে কোনো এলাকার কৃষি ব্যবস্থার সার্বিক উন্নতির অন্যতম প্রধান ও প্রথম শর্ত হলো সেই মাটির উর্বরতা ও গুণগত স্বাস্থ্য। বছরের পর বছর ধরে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে পাহাড়ি অঞ্চলের মাটি কিছুটা অম্লীয় (Acidic) প্রকৃতির হয়ে থাকে, যার ফলে মাটিতে প্রয়োজনীয় জৈব সার ও প্রাকৃতিক পুষ্টি উপাদানের কিছুটা ঘাটতি তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। এছাড়া খাড়া ঢালের ভৌগোলিক গঠনের কারণে শুষ্ক মৌসুমে পাহাড়ি মাটি সহজেই নিজের রস বা আর্দ্রতা ধরে রাখতে পারে না। তবে কৃষি বিজ্ঞানীদের মতে, এগুলো কোনো স্থায়ী বা সমাধান অযোগ্য সমস্যা নয়। আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক বৈচিত্র্যময় উপায়ে এসবের স্থায়ী সমাধান করা পুরোপুরি সম্ভব। মাটিতে সঠিক পরিমাণ সার, প্রাকৃতিক কম্পোস্ট ও জৈব সার পরিমিত ব্যবহারের মাধ্যমে পাহাড়ি মাটির প্রাকৃতিক উর্বরতা শক্তি এবং সার্বিক ফসলি উৎপাদন ক্ষমতা দুটিই বহুলাংশে বাড়ানো যায়। মাটি শুধু ফসল ফলায় না; এটি পানি ধরে রাখে এবং সামগ্রিক জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখতে ভূমিকা রাখে। তাই পাহাড়ের কৃষি উন্নয়নের মূল ভিত্তি হতে হবে সেখানকার মাটির গুণগত স্বাস্থ্য রক্ষা করা।

পাহাড়ের প্রান্তিক কৃষির সবচেয়ে বড় শত্রু সমতল জমির অভাব বা বৃষ্টির সংকট নয়; বরং ঢালু পাহাড়ের ওপরের অতি উর্বর মাটির স্তর ধুয়ে ক্ষয়ে যাওয়া (Soil Erosion)। বর্ষার মৌসুমে অতি ভারী বৃষ্টিপাতে খাড়া ঢালু পাহাড়ের ওপরের পুষ্টিসমৃদ্ধ উর্বর মাটির আস্তরণ সহজে ধুয়ে যায়, যার সুদূরপ্রসারী পরিণতি হিসেবে পাহাড়ে ঘন ঘন মারাত্মক পাহাড়ধসের মতো মর্মান্তিক ঘটনাও ঘটে। প্রতি বছর আমরা পাহাড়ের বিপুল পরিমাণ পুষ্টিসমৃদ্ধ মাটি চিরতরে হারাচ্ছি। অনবরত এই ভূমিক্ষয়ের কারণে কেবল যে কৃষির ফলনই আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায় তা নয়, বরং ধুয়ে যাওয়া মাটিতে পাহাড়ি নদ-নদীর নাব্যতা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গিয়ে সমতলে বন্যার ভয়াবহ ঝুঁকি বাড়ে এবং যাতায়াতের রাস্তাঘাট নষ্ট হয়ে যায়। মাত্র এক বর্ষার ঢলে যে মূল্যবান উর্বর মাটি ধুয়ে নেমে যায়, প্রকৃতির নিয়মে তা পুনরায় তৈরি হতে বহু বছর পার হয়ে যায়। তাই পাহাড়ের এই উর্বর মাটি রক্ষা করা এখন কেবল কৃষির জন্য নয়, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও পরিবেশ রক্ষায় অত্যন্ত জরুরি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আদিবাসী ঐতিহ্যের মূল্যায়ন ও আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া: যুগের পর যুগ ধরে পার্বত্য অঞ্চলের বিভিন্ন আদিবাসী ও পাহাড়ি জনগোষ্ঠী প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিয়ে সনাতনী ‘জুম চাষ’ পদ্ধতি অনুসরণ করে আসছে। অতীতে এক খণ্ড জমিতে জুম চাষের পর মাটি পুনর্গঠনের জন্য সেই জমি দীর্ঘদিন খালি বা পতিত ফেলে রাখা হতো, যার ফলে মাটি স্বাভাবিকভাবেই তার হারিয়ে যাওয়া উর্বরতা ফিরে পেত। কিন্তু আধুনিক সময়ে পার্বত্য অঞ্চলে জনসংখ্যা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় জমির ওপর সার্বিক চাপ অনেক গুণ বেড়েছে; ফলে জুম চাষের বিরতির চক্র বা সময় অনেকটাই ছোট হয়ে এসেছে, যা পরিবেশের ভারসাম্য ও মাটির জন্য বড় ধরনের ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

তবে টেকসই ভবিষ্যতের বাহ্যিক উন্নয়নের দোহাই দিয়ে পাহাড়ে আদিবাসীদের এই ঐতিহ্যবাহী চাষ পদ্ধতিকে হঠাৎ করে বা জোরপূর্বক বন্ধ করে দেওয়া মোটেও ঠিক হবে না। বরং তাঁদের শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অর্জিত এই আদি জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে আধুনিক কৃষি বিজ্ঞানের একটি চমৎকার সমন্বয় ঘটাতে হবে। পরিবেশবান্ধব আধুনিক কৃষি বনায়ন এবং পরিকল্পিত মিশ্র চাষের (Mixed Cropping) মাধ্যমে স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেই পরিবেশ উপযোগী উন্নত বিকল্প গড়ে তোলা সম্ভব।

সবচেয়ে আশার বিষয় হলো, পাহাড়ি আধুনিক কৃষির উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় অনেক উন্নত প্রযুক্তি ও কৌশল এখন আমাদের দেশীয় বিজ্ঞানীদের হাতেই রয়েছে। সুপরিকল্পিত কৃষি বনায়ন, বাণিজ্যিক বাঁশ চাষ, পাহাড়ি ঢালে মাটি ধরে রাখার জন্য বিন্না ঘাসের (Vetiver Grass) ব্যাপক ব্যবহার এবং আর্দ্রতা রক্ষায় মালচিং পদ্ধতির মতো আধুনিক উপায়গুলো ব্যবহার করে মাটির ক্ষয় পুরোপুরি রোধ করা সম্ভব। পাশাপাশি বৃষ্টির পানি বৈজ্ঞানিকভাবে ধরে রাখার (Rainwater Harvesting) কৌশলগুলো পাহাড়কে রক্ষা করতে বিশাল ভূমিকা রাখতে পারে।

আমাদের দেশে এই সংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক গবেষণার একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত ভিত্তি ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে। দেশের শীর্ষ গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট’ (বারি), বিশেষ করে খাগড়াছড়ির রামগড় পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্র এই বিষয়ে গত কয়েক বছরে দারুণ সব সাফল্য এনে দিয়েছে। বারি’র নিবেদিত বিজ্ঞানীরা পাহাড়ের পরিবেশের উপযোগী উন্নত জাতের আম, আনারস, কলা, লেবু, আদা, হলুদের পাশাপাশি উচ্চমূল্যের কফি, কাজুবাদাম, ড্রাগন ফল এবং অ্যাভোকাডোর মতো বিদেশি ফল ও অর্থকরী ফসলের উন্নত জাত ও সহজ চাষপদ্ধতি সফলভাবে উদ্ভাবন করেছেন। এখন শুধু প্রয়োজন সরকারি ও বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে এই আধুনিক প্রযুক্তি ও জাতগুলো দ্রুত পাহাড়ি প্রান্তিক কৃষকদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া।

পার্বত্য অঞ্চলে অপেক্ষায় এক নীরব কৃষি বিপ্লব: পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলটি পরিকল্পিত রূপরেখা পেলে খুব সহজেই সমগ্র বাংলাদেশের ‘ফলের রাজধানী’ বা প্রধান উদ্যানতাত্ত্বিক (Horticultural) কেন্দ্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। প্রচলিত ফলমূলের পাশাপাশি বর্তমানে পাহাড়ে নতুন নতুন বিদেশি ও বাণিজ্যিক ফলের আবাদ দ্রুত বাড়ছে। এছাড়া পাহাড়ে উৎপাদিত আদা, হলুদ ও গোলমরিচের মতো খাঁটি মসলা জাতীয় ফসলের আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক রপ্তানির সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে। এসব অর্থকরী ফসল সাধারণ ধান বা গমের চাষের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি লাভজনক এবং এসব বহুবর্ষজীবী গাছ সারা বছর পাহাড়ের ঢালকে সবুজ রাখার মাধ্যমে মাটি ধ্বংসের হাত থেকেও সুরক্ষা দেয়।

বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবে পার্বত্য অঞ্চলেও বৃষ্টিপাতের ধরণ বদলাচ্ছে এবং পাহাড়ধসের প্রবণতা বাড়ছে। তাই এখন কেবল উৎপাদন বাড়ানোর কথা ভাবলেই চলবে না, বরং একই সাথে প্রকৃতিকে ধরে রাখার ও টিকিয়ে রাখার সার্বিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। আর এই লক্ষ্য অর্জনে জরুরি ভিত্তিতে একটি সুনির্দিষ্ট ‘জাতীয় পাহাড়ি কৃষি মিশন’ (National Hill Agriculture Mission) চালুর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সময়ের দাবি। এই প্রস্তাবিত মিশনের অধীনে সরকারি দপ্তরসমূহ, কৃষি গবেষক, বেসরকারি শিল্প উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারী এবং স্থানীয় পাহাড়ি ও সমতলের মানুষকে এক ছাতার নিচে এসে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

এই ক্ষেত্রে আমাদের নিকটবর্তী প্রতিবেশী দেশ থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম কিংবা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর (North-East India) সফল উদাহরণগুলো দারুণ মডেল হতে পারে, যারা তাদের পাহাড়ি অঞ্চলগুলোকে সফলভাবে জাতীয় অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত করেছে। তাদের সফল অভিজ্ঞতার আলোকেই আমাদের পাহাড়ি কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের জন্য লাভজনক বাজার ব্যবস্থার সাথে যুক্ত করতে হবে। এর জন্য পাহাড়ি এলাকায় গ্রামীণ যাতায়াত ব্যবস্থা ও রাস্তাঘাট উন্নয়ন, আধুনিক হিমাগার (Cold Storage) স্থাপন, এবং কোল্ড চেইন, প্যাকেজিং ও কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের জরুরি বিকাশ ও সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ প্রয়োজন। পাহাড়ে উৎপাদিত ফল ও মসলা স্থানীয়ভাবে প্রক্রিয়াজাত করে বিভিন্ন জুস, শুকনো খাবার বা গুঁড়ো মসলা তৈরি করার শিল্প গড়তে পারলে পচনশীল ফসল নষ্ট হওয়া শূন্যে নেমে আসবে এবং কৃষকের অর্জিত আয় বহুলাংশে বাড়বে।

বাংলাদেশ যখন একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হওয়ার পথে দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রাম হতে পারে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পাহাড়ি কৃষির এক অনন্য বৈশ্বিক মডেল। তবে এই সুদূরপ্রসারী স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক ও নীতিগত সদিচ্ছা। পাহাড় কোনো বাণিজ্যিক শোষণের জায়গা নয়; এটি অত্যন্ত পরম মমতায় লালন করার প্রাকৃতিক স্থান। আমরা যদি পাহাড়ের রত্নগর্ভা মাটি, চারপাশের বন, প্রবাহমান পানি ও স্থানীয় বৈচিত্র্যময় মানুষের পেছনে সঠিকভাবে মেধা ও অর্থের বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে পারি, তবে এই পাহাড়ি অঞ্চলই হয়ে উঠবে আমাদের জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।

আগামী দিনের বাংলাদেশের সবুজ ও সমৃদ্ধ কৃষির নতুন সূর্য হয়তো এই চোখ জুড়ানো পাহাড়ের চূড়া থেকেই প্রথম উদিত হবে।