ঢাকা ০২:১৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬

বিশ্বকাপের নতুন ক্লাসিক: মেসি বনাম এমবাপে

শুরুটা চার বছর আগে, লুসাইলের সেই স্মরণীয় ফাইনাল থেকে। লিওনেল মেসি ও কিলিয়ান এমবাপের লড়াই এখন আরও তীব্র হয়েছে। দুই তারকার দ্বৈরথ এতটাই উঁচুতে উঠে গেছে, বিশ্বকাপের সীমাও যেন ক্রমেই নতুন নতুন উচ্চতা স্পর্শ করছে!

দিনটি ছিল ১৮ ডিসেম্বর, ২০২২। সেই রাতের ফাইনালে ফুটবল বিশ্বে কিছু একটা বদলে গিয়েছিল। যদিও, সেই ম‍্যাচকে সবাই মনে রেখেছে ৩৬ বছরের খরা কাটিয়ে আর্জেন্টিনার শিরোপা জয় দিয়ে। তবে, ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে ঠিকই দোলা দেবে, দুই তারকার দ্বৈরথও। লুসাইলের ওই রোমাঞ্চকর রাত থেকে, নিজেদের লড়াইকে যে অসাধারণ এক রূপ দিয়েছেন মেসি ও এমবাপে।

৩-৩ সমতার পর, সেই ফাইনালে ফ্রান্সকে ৪-২ গোলে টাইব্রেকারে হারিয়ে বাঁধনহারা উৎসবে মেতেছিল আর্জেন্টিনা।

ওই ফাইনালের আগে, বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায়, ১১ গোল নিয়ে মেসি ছিলেন অষ্টম সারিতে। সেখানে তার সঙ্গী ছিলেন দুই গ্রেট হাঙ্গেরির সান্দর কোশিচ ও জার্মানির ইয়ুর্গেন ক্লিন্সমান। সেরা দশেও ছিলেন না এমবাপে!

বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বকালের সেরা ফাইনালের একটি হয়ে ওঠা সেই ম্যাচে, জোড়া গোলের আলো ছড়ান মেসি। এমবাপে আরও দ্যুতিময়, তিনি উপহার দেন হ্যাটট্রিক। বিশ্বকাপে ১৩ গোল নিয়ে মেসি বসেন তখন তালিকায় পাঁচে থাকা আরেক কিংবদন্তি জুস্ত ফঁতেনের (১৩টি গোল) পাশে। এমবাপের অবস্থান ছিল ঠিক তার পেছনেই, ফুটবল কিংবদন্তি পেলের পাশে।

শেষ হয় ফাইনাল, ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ; কিন্তু অনেকে হয়তো তখন উপলব্ধিও করতে পারেননি যে, সেটি ছিল ‘মেসি বনাম এমবাপে’ লড়াইয়ের কেবল শুরু মাত্র।

সেবার বিশ্বকাপ জয়ের অনির্বচনীয় স্বাদ পান মেসি। এমবাপে তার আগের আসরে, ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে জিতেছিলেন সোনালী ট্রফিটি। আর্জেন্টাইন মহাতারকার কণ্ঠেও সেই রাতে, নিজের প্রাপ্তির পাশাপাশি এমবাপের জন্যও ছিল অকুণ্ঠ প্রশংসা।

“এটা জয়ের প্রশান্তি ইতোমধ্যে এমবাপে পেয়েছে। আমার জন্য, এই অভিজ্ঞতা আলাদা। যদিও, ফাইনালে সে যা করেছে, অবিশ্বাস্য এবং এমন দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পরও বিশ্বকাপ জিততে না পারা মেনে নেওয়া কঠিন। এমন পরিস্থিতির শিকার আমিও হয়েছিলাম। ২০১৪ সালের ফাইনালে, বিশ্বকাপ জিততে না পারাটা ছিল যন্ত্রণার।”

সেই যন্ত্রণা থেকে মুক্তির স্বাদ নিয়ে, চার বছর পর, উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপে মেসি আসেন ৩৯ ছুঁইছুঁই বয়স নিয়ে। এমবাপে এখন ২৭ বছর বয়সী। যথারীতি, লড়াই জমে উঠেছে। এই বিশ্বকাপের গত দুই ম্যাচে, দুজনেই বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় নিজেদের উচুঁ থেকে আরও উঁচুতে তুলে চলেছেন। এখন পর্যন্ত অবশ্য এই দ্বৈরথে জয়ী মেসি।

আলজেরিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ৩-০ গোলের জয়ের ম্যাচে মুঠোভরে পেয়েছেন মেসি। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক পেয়েছেন তিনি। এরপর অস্ট্রিয়া ম্যাচে দলের ২-০ ব্যবধানের জয়ে দুটি গোলই তার। তাতে, মিরোস্লাভ ক্লোসাকে (১৬ গোল) পেছনে ফেলে রেকর্ডটির মালিকানা এখন এককভাবে মেসির (১৮টি)। ২২ জুন, ২০২৬-এই মহাতারকার জন্য আরেকটি স্মরণীয় দিন।

রেকর্ড, ব্যক্তিগত অর্জন নিয়ে অবশ্য কখনই মাতামাতি করেন না মেসি। ক্লোসার রেকর্ড ভাঙার পর, চারদিকে যখন প্রশংসার স্রোত বইছে, তখনও তিনি বরাবরের মতো শান্ত, স্থির; দলীয় সাফল্যের জয়গানে ব্যস্ত।

“সত্যি বলতে আমি জানি না (রেকর্ডের বিষয়ে)। এমনকি, আমি আসলে গোলগুলো মনেও করতে পারি না। আমি ক্লান্ত, খুব বেশি প্রাণশক্তি অবশিষ্ট নেই এবং আমার পক্ষে সোজাসাপ্টা অনেক কিছু চিন্তা করাও কঠিন। আমি শুধু এই মুহূর্তটা উপভোগ করছি এবং আমার সতীর্থদের সঙ্গে উদযাপন করছি।”

“এই মুহূর্তটা আমি সর্বোচ্চ কাজে লাগাচ্ছি এবং দেখতে চাই, আমরা একসাথে কতদূর যেতে পারি। আজ (অস্ট্রিয়া ম্যাচের পর) ওই পেনাল্টি (যেটা মিস করেছি)… সেটা থেকে গোল করতে পারলে হয়তো, অন্য গোলগুলো আমি পেতাম না।”

কিন্তু এটাও তো সত্যি, মেসি যখন পাওনা বিশ্রামটুকু নেবেন, পিছু ফিরে তাকাবেন রেকর্ডটার দিকে, তিনি কী কেবল ক্লোসাকে দেখবেন? এমবাপের দিকেও তার দৃষ্টি যাওয়াটা বিস্ময়ের কিছু হবে না নিশ্চয়। এ মুহূর্তে ১৬ গোল নিয়ে যে, ফরাসি ফরোয়ার্ড তার ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছেন! কে জানে, এই বিশ্বকাপেই সামনের পথচলায় কত কীই তো হতে পারে!

মেসির মতো শুরু না পেলেও, এমবাপে ঝলক কম দেখাচ্ছেন না। সেনেগাল ও ইরাকের বিপক্ষে ফ্রান্সের যথাক্রমে ৩-১ ও ৩-০ ব্যবধানে জেতা ম্যাচে জালের দেখা পেয়েছেন তিনি। সেনেগালের বিপক্ষে দুইবার, ইরাকের বিপক্ষেও দুইবার, তাতে তিনি এখন ক্লোসার পাশে। অথচ, জার্মান গ্রেট খেলেছেন চারটি বিশ্বকাপ, সেখানে এমবাপের সবে তৃতীয় বিশ্বকাপ শুরু !

রেকর্ডটি মেসি গড়ার আগেই, তাকে আগাম ‘স্বাগত’ জানিয়ে রেখেছিলেন ক্লোসা। গড়ার পর আর্জেন্টাইন জাদুকরের প্রশংসায় হয়েছেন পঞ্চমুখ। লিগ আঁর দল পিএজিতে একসময় সতীর্থ ছিলেন, মেসি ও এমবাপে। আলজেরিয়া ম্যাচে হ্যাটট্রিক করার পর এবং অস্ট্রিয়া ম্যাচে ক্লোসার রেকর্ড ভাঙার পর-দুই উপলক্ষে সাবেক সতীর্থকে প্রশংশায় ভাসান এমবাপেও।

“আমি জানতাম, (অস্ট্রিয়া ম্যাচে) লিও গোল করবে-সে লিও, সবসময় গোল করে। (ক্লোসার রেকর্ড মেসি ভাঙার পর) রেকর্ডটা এখন মেসির, আমি তার পেছনে। দলকে সাহায্য করার জন্য, আমি যত বেশি সম্ভব গোল করার চেষ্টা করে যাব। অবশ্যই, গোল পেলে আমি এই রেকর্ডের কাছাকাছি যাব। তবে, আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, বিশ্বকাপে দলকে যতদূর সম্ভব টেনে নেওয়া।”

এটা পরিষ্কার, দুজনের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, মুগ্ধতার কমতি নেই। রেকর্ডের আঙিনায় তাদের লড়াইটা কেবল বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে। যখন দুজনে প্যারিসে সতীর্থ ছিলেন, কিংবা এখন, আজও সে দ্বৈরথের সরব উপস্থিতি। আসলে, এমবাপে কখনও মেসির প্রতি তার মুগ্ধতা আড়াল করেননি। যদিও তিনি ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ভক্ত! সবশেষ ইরাক ম্যাচের পরও এমবাপে ‘কে সেরা’ প্রশ্নের মুখে পড়েছিলেন।

“ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পাশাপাশি লিওনেল মেসি বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়। ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে, সে তার অবিশ্বাস্য মান দেখিয়ে চলেছে। আমার ক্ষেত্রে, আমি সাধারণভাবে নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি এবং বড় মঞ্চে দেখানোর চেষ্টা করছি, আমি কী করতে সমর্থ। বিশ্বকাপে, আমি আমার দলকে সাহায্য করার চেষ্টা করছি।”

মেসির সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার বিষয়ে টু-শব্দটিও করেননি এমবাপে। কিন্তু তাতে কী? কাতারের সেই ফাইনাল থেকে আজ অবধি, দ্বৈরথের গল্পটা এখনও আছে, আগের মতোই; একই। যদিও, সবাই ধরে নিয়েছিল, মেসি সবকিছু অর্জন করে ফেলেছেন, কিন্তু তিনি ইতিহাস লিখেই যাচ্ছেন। সেখানে, মনে হচ্ছে, এমবাপে ইতিহাসের পুনর্লিখনে বদ্ধপরিকর।

যদি, এই ১৯ জুলাইয়ে নিউ ইয়র্কের নিউ জার্সির ফাইনালে, আবার মুখোমুখি হয় আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্স; তাহলে, এটা নিশ্চিত, মেসি ও এমবাপের হাতে এখনও আছে, ছয়টি করে ম্যাচ। হয়ত, রেকর্ড ভাঙা-গড়ার খেলায় দুজনে মেতে থাকবেন, মাতিয়েও রাখবেন ফুটবলপ্রেমীদের। যে খেলা, যে লড়াই দুজনে শুরু করেছিলেন, চার বছর আগে, লুসাইলের মরুদ্যানে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

সর্বজনীন সম্পদ, সম্মিলিত শাসন ও বাজেটের রাজনৈতিক অর্থনীতি

বিশ্বকাপের নতুন ক্লাসিক: মেসি বনাম এমবাপে

আপডেট সময় : ১২:৫৫:০০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬

শুরুটা চার বছর আগে, লুসাইলের সেই স্মরণীয় ফাইনাল থেকে। লিওনেল মেসি ও কিলিয়ান এমবাপের লড়াই এখন আরও তীব্র হয়েছে। দুই তারকার দ্বৈরথ এতটাই উঁচুতে উঠে গেছে, বিশ্বকাপের সীমাও যেন ক্রমেই নতুন নতুন উচ্চতা স্পর্শ করছে!

দিনটি ছিল ১৮ ডিসেম্বর, ২০২২। সেই রাতের ফাইনালে ফুটবল বিশ্বে কিছু একটা বদলে গিয়েছিল। যদিও, সেই ম‍্যাচকে সবাই মনে রেখেছে ৩৬ বছরের খরা কাটিয়ে আর্জেন্টিনার শিরোপা জয় দিয়ে। তবে, ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে ঠিকই দোলা দেবে, দুই তারকার দ্বৈরথও। লুসাইলের ওই রোমাঞ্চকর রাত থেকে, নিজেদের লড়াইকে যে অসাধারণ এক রূপ দিয়েছেন মেসি ও এমবাপে।

৩-৩ সমতার পর, সেই ফাইনালে ফ্রান্সকে ৪-২ গোলে টাইব্রেকারে হারিয়ে বাঁধনহারা উৎসবে মেতেছিল আর্জেন্টিনা।

ওই ফাইনালের আগে, বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায়, ১১ গোল নিয়ে মেসি ছিলেন অষ্টম সারিতে। সেখানে তার সঙ্গী ছিলেন দুই গ্রেট হাঙ্গেরির সান্দর কোশিচ ও জার্মানির ইয়ুর্গেন ক্লিন্সমান। সেরা দশেও ছিলেন না এমবাপে!

বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বকালের সেরা ফাইনালের একটি হয়ে ওঠা সেই ম্যাচে, জোড়া গোলের আলো ছড়ান মেসি। এমবাপে আরও দ্যুতিময়, তিনি উপহার দেন হ্যাটট্রিক। বিশ্বকাপে ১৩ গোল নিয়ে মেসি বসেন তখন তালিকায় পাঁচে থাকা আরেক কিংবদন্তি জুস্ত ফঁতেনের (১৩টি গোল) পাশে। এমবাপের অবস্থান ছিল ঠিক তার পেছনেই, ফুটবল কিংবদন্তি পেলের পাশে।

শেষ হয় ফাইনাল, ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ; কিন্তু অনেকে হয়তো তখন উপলব্ধিও করতে পারেননি যে, সেটি ছিল ‘মেসি বনাম এমবাপে’ লড়াইয়ের কেবল শুরু মাত্র।

সেবার বিশ্বকাপ জয়ের অনির্বচনীয় স্বাদ পান মেসি। এমবাপে তার আগের আসরে, ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে জিতেছিলেন সোনালী ট্রফিটি। আর্জেন্টাইন মহাতারকার কণ্ঠেও সেই রাতে, নিজের প্রাপ্তির পাশাপাশি এমবাপের জন্যও ছিল অকুণ্ঠ প্রশংসা।

“এটা জয়ের প্রশান্তি ইতোমধ্যে এমবাপে পেয়েছে। আমার জন্য, এই অভিজ্ঞতা আলাদা। যদিও, ফাইনালে সে যা করেছে, অবিশ্বাস্য এবং এমন দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পরও বিশ্বকাপ জিততে না পারা মেনে নেওয়া কঠিন। এমন পরিস্থিতির শিকার আমিও হয়েছিলাম। ২০১৪ সালের ফাইনালে, বিশ্বকাপ জিততে না পারাটা ছিল যন্ত্রণার।”

সেই যন্ত্রণা থেকে মুক্তির স্বাদ নিয়ে, চার বছর পর, উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপে মেসি আসেন ৩৯ ছুঁইছুঁই বয়স নিয়ে। এমবাপে এখন ২৭ বছর বয়সী। যথারীতি, লড়াই জমে উঠেছে। এই বিশ্বকাপের গত দুই ম্যাচে, দুজনেই বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় নিজেদের উচুঁ থেকে আরও উঁচুতে তুলে চলেছেন। এখন পর্যন্ত অবশ্য এই দ্বৈরথে জয়ী মেসি।

আলজেরিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ৩-০ গোলের জয়ের ম্যাচে মুঠোভরে পেয়েছেন মেসি। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক পেয়েছেন তিনি। এরপর অস্ট্রিয়া ম্যাচে দলের ২-০ ব্যবধানের জয়ে দুটি গোলই তার। তাতে, মিরোস্লাভ ক্লোসাকে (১৬ গোল) পেছনে ফেলে রেকর্ডটির মালিকানা এখন এককভাবে মেসির (১৮টি)। ২২ জুন, ২০২৬-এই মহাতারকার জন্য আরেকটি স্মরণীয় দিন।

রেকর্ড, ব্যক্তিগত অর্জন নিয়ে অবশ্য কখনই মাতামাতি করেন না মেসি। ক্লোসার রেকর্ড ভাঙার পর, চারদিকে যখন প্রশংসার স্রোত বইছে, তখনও তিনি বরাবরের মতো শান্ত, স্থির; দলীয় সাফল্যের জয়গানে ব্যস্ত।

“সত্যি বলতে আমি জানি না (রেকর্ডের বিষয়ে)। এমনকি, আমি আসলে গোলগুলো মনেও করতে পারি না। আমি ক্লান্ত, খুব বেশি প্রাণশক্তি অবশিষ্ট নেই এবং আমার পক্ষে সোজাসাপ্টা অনেক কিছু চিন্তা করাও কঠিন। আমি শুধু এই মুহূর্তটা উপভোগ করছি এবং আমার সতীর্থদের সঙ্গে উদযাপন করছি।”

“এই মুহূর্তটা আমি সর্বোচ্চ কাজে লাগাচ্ছি এবং দেখতে চাই, আমরা একসাথে কতদূর যেতে পারি। আজ (অস্ট্রিয়া ম্যাচের পর) ওই পেনাল্টি (যেটা মিস করেছি)… সেটা থেকে গোল করতে পারলে হয়তো, অন্য গোলগুলো আমি পেতাম না।”

কিন্তু এটাও তো সত্যি, মেসি যখন পাওনা বিশ্রামটুকু নেবেন, পিছু ফিরে তাকাবেন রেকর্ডটার দিকে, তিনি কী কেবল ক্লোসাকে দেখবেন? এমবাপের দিকেও তার দৃষ্টি যাওয়াটা বিস্ময়ের কিছু হবে না নিশ্চয়। এ মুহূর্তে ১৬ গোল নিয়ে যে, ফরাসি ফরোয়ার্ড তার ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছেন! কে জানে, এই বিশ্বকাপেই সামনের পথচলায় কত কীই তো হতে পারে!

মেসির মতো শুরু না পেলেও, এমবাপে ঝলক কম দেখাচ্ছেন না। সেনেগাল ও ইরাকের বিপক্ষে ফ্রান্সের যথাক্রমে ৩-১ ও ৩-০ ব্যবধানে জেতা ম্যাচে জালের দেখা পেয়েছেন তিনি। সেনেগালের বিপক্ষে দুইবার, ইরাকের বিপক্ষেও দুইবার, তাতে তিনি এখন ক্লোসার পাশে। অথচ, জার্মান গ্রেট খেলেছেন চারটি বিশ্বকাপ, সেখানে এমবাপের সবে তৃতীয় বিশ্বকাপ শুরু !

রেকর্ডটি মেসি গড়ার আগেই, তাকে আগাম ‘স্বাগত’ জানিয়ে রেখেছিলেন ক্লোসা। গড়ার পর আর্জেন্টাইন জাদুকরের প্রশংসায় হয়েছেন পঞ্চমুখ। লিগ আঁর দল পিএজিতে একসময় সতীর্থ ছিলেন, মেসি ও এমবাপে। আলজেরিয়া ম্যাচে হ্যাটট্রিক করার পর এবং অস্ট্রিয়া ম্যাচে ক্লোসার রেকর্ড ভাঙার পর-দুই উপলক্ষে সাবেক সতীর্থকে প্রশংশায় ভাসান এমবাপেও।

“আমি জানতাম, (অস্ট্রিয়া ম্যাচে) লিও গোল করবে-সে লিও, সবসময় গোল করে। (ক্লোসার রেকর্ড মেসি ভাঙার পর) রেকর্ডটা এখন মেসির, আমি তার পেছনে। দলকে সাহায্য করার জন্য, আমি যত বেশি সম্ভব গোল করার চেষ্টা করে যাব। অবশ্যই, গোল পেলে আমি এই রেকর্ডের কাছাকাছি যাব। তবে, আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, বিশ্বকাপে দলকে যতদূর সম্ভব টেনে নেওয়া।”

এটা পরিষ্কার, দুজনের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, মুগ্ধতার কমতি নেই। রেকর্ডের আঙিনায় তাদের লড়াইটা কেবল বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে। যখন দুজনে প্যারিসে সতীর্থ ছিলেন, কিংবা এখন, আজও সে দ্বৈরথের সরব উপস্থিতি। আসলে, এমবাপে কখনও মেসির প্রতি তার মুগ্ধতা আড়াল করেননি। যদিও তিনি ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ভক্ত! সবশেষ ইরাক ম্যাচের পরও এমবাপে ‘কে সেরা’ প্রশ্নের মুখে পড়েছিলেন।

“ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পাশাপাশি লিওনেল মেসি বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়। ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে, সে তার অবিশ্বাস্য মান দেখিয়ে চলেছে। আমার ক্ষেত্রে, আমি সাধারণভাবে নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি এবং বড় মঞ্চে দেখানোর চেষ্টা করছি, আমি কী করতে সমর্থ। বিশ্বকাপে, আমি আমার দলকে সাহায্য করার চেষ্টা করছি।”

মেসির সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার বিষয়ে টু-শব্দটিও করেননি এমবাপে। কিন্তু তাতে কী? কাতারের সেই ফাইনাল থেকে আজ অবধি, দ্বৈরথের গল্পটা এখনও আছে, আগের মতোই; একই। যদিও, সবাই ধরে নিয়েছিল, মেসি সবকিছু অর্জন করে ফেলেছেন, কিন্তু তিনি ইতিহাস লিখেই যাচ্ছেন। সেখানে, মনে হচ্ছে, এমবাপে ইতিহাসের পুনর্লিখনে বদ্ধপরিকর।

যদি, এই ১৯ জুলাইয়ে নিউ ইয়র্কের নিউ জার্সির ফাইনালে, আবার মুখোমুখি হয় আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্স; তাহলে, এটা নিশ্চিত, মেসি ও এমবাপের হাতে এখনও আছে, ছয়টি করে ম্যাচ। হয়ত, রেকর্ড ভাঙা-গড়ার খেলায় দুজনে মেতে থাকবেন, মাতিয়েও রাখবেন ফুটবলপ্রেমীদের। যে খেলা, যে লড়াই দুজনে শুরু করেছিলেন, চার বছর আগে, লুসাইলের মরুদ্যানে।