রাতের আঁধারে কোথাও একজন মানুষকে হত্যা করা হয়। এরপর হাত-পা বেঁধে, কখনও কোমরে বস্তা বেঁধে, আবার কখনও পরিচয় মুছে যাওয়ার অপেক্ষায় মরদেহ ফেলে দেওয়া হয় নদীতে। কয়েক দিন পর সেই মরদেহ ভেসে ওঠে অন্য কোথাও—কোনও খেয়াঘাটের পাশে, শাখা নদীর জলে কিংবা কচুরিপানার আড়ালে। দেশের বিভিন্ন নদীতে একের পর এক পরিচয়হীন, অর্ধগলিত ও রহস্যঘেরা মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠছে—এগুলো কি কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি হত্যার প্রমাণ গোপনে নদীকে ক্রমেই ব্যবহার করা হচ্ছে ‘নিরাপদ ডাম্পিং গ্রাউন্ড’ হিসেবে?
শনিবার (২০ জুন) নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে মেঘনা নদীর একটি শাখা, স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘মরা গাং’ থেকে পা ও কোমরে বস্তা বাঁধা অবস্থায় এক অজ্ঞাত ব্যক্তির অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহতের বয়স আনুমানিক ৩৫ বছর। পুলিশের ধারণা, ছয় থেকে সাত দিন আগে তাকে হত্যা করে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে ময়নাতদন্তের পর।
একই দিন সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে নলজুর নদী থেকে উদ্ধার করা হয় অজ্ঞাত এক নারীর ভাসমান মরদেহ। তার মৃত্যুর কারণও এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এর আগে ২৯ মে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ার ফুলদী নদী থেকে এক তরুণীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে তদন্তে ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। সংস্থাটি জানায়, সংঘবদ্ধ ধর্ষণের পর ওই তরুণীকে শ্বাসরোধে হত্যা করে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। এ ঘটনায় চার জনকে গ্রেফতার করা হয়।
তিনটি ঘটনার স্থান ও প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও একটি বিষয় অভিন্ন—মরদেহ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে। নৌ-পুলিশ সদর দফতরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের মাত্র তিন মাসে দেশের বিভিন্ন নদী থেকে ১৪৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ১১২ জনের পরিচয় শনাক্ত হলেও ৩৪ জনের পরিচয় এখনও অজানা। শনাক্ত হওয়া ১১২ জনের ঘটনায় এখন পর্যন্ত আটটি হত্যা মামলা হয়েছে।
পাঁচ বছরে দুই হাজারের বেশি মরদেহ
নৌ-পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে দেশের নদ-নদী থেকে নারী ও শিশুসহ ২ হাজার ৬৪টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ৩৩৫টি হত্যা মামলা এবং আত্মহত্যার ২৫টি মামলা হয়েছে। বাকি মৃত্যুর কারণ হিসেবে উঠে এসেছে নৌদুর্ঘটনা, গোসল করতে গিয়ে ডুবে যাওয়া, মাছ ধরতে গিয়ে দুর্ঘটনা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ নানা ঘটনা।
তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, উদ্ধার হওয়া বিপুলসংখ্যক মরদেহের পরিচয়ই শনাক্ত করা যায়নি। পাঁচ বছরে ১ হাজার ৪২৫ জনের পরিচয় নিশ্চিত করা গেলেও ৬৩৯ জনের পরিচয় অজানাই থেকে গেছে। পরে এসব মরদেহ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়েছে।
কেন নদীকে বেছে নিচ্ছে অপরাধীরা?
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, নদীতে মরদেহ ফেলে দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো প্রমাণ গোপন করা এবং তদন্তকে জটিল করে তোলা।
নৌ-পুলিশ প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. রেজাউল করিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, নদী থেকে উদ্ধার হওয়া মরদেহসংক্রান্ত হত্যা মামলাগুলোর তদন্তে ব্যক্তিগত বিরোধ, পারিবারিক কলহ, পরকীয়া, মাদক কারবার এবং সম্পত্তি নিয়ে দ্বন্দ্বের মতো কারণ সামনে এসেছে। তার দাবি, এসব হত্যা মামলার প্রায় ৬৫ শতাংশের রহস্য উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হয়েছে নৌ-পুলিশ।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, পানিতে দীর্ঘ সময় থাকার ফলে মরদেহে পচন ধরে, আঙুলের ছাপ নষ্ট হয়ে যায় এবং মুখমণ্ডল বিকৃত হয়ে পড়ে। এতে পরিচয় শনাক্ত করা যেমন কঠিন হয়ে যায়, তেমনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ আলামতও নষ্ট হয়ে যায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, অপরাধীরা জানে পরিচয় শনাক্ত করা না গেলে অনেক ক্ষেত্রেই মরদেহ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন হয়ে যায়। সেই সুযোগ নিয়েই গভীর রাতে বাস, ট্রাক বা অন্য যানবাহনে করে মরদেহ এনে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। তার মতে, নদীর পাড়, সেতু, ঘাট ও নির্জন ডাম্পিং পয়েন্টগুলোতে পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব অপরাধীদের জন্য সুযোগ তৈরি করছে।
ব্যক্তিগত বিরোধের বাইরে রাজনৈতিক ও অপরাধী চক্রের ভূমিকা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. রেজাউল করিমের মতে, নদী বা জলাশয়ে মরদেহ ফেলে দেওয়ার পেছনে শুধু পারিবারিক বা ব্যক্তিগত বিরোধই নয়, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, আধিপত্য বিস্তার এবং অপরাধী চক্রের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার লড়াইও গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, অনেক ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষকে সরিয়ে দেওয়া, হত্যার প্রমাণ মুছে ফেলা এবং নিজেদের সম্পৃক্ততা আড়াল করতেই মরদেহ নদী বা জলাশয়ে ফেলে দেওয়া হয়। কখনও ভাড়াটে খুনি ব্যবহার করে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের পর মরদেহ গোপন করতে নদীকে মাধ্যম হিসেবে বেছে নেওয়া হয়।
তার মতে, নদীসংলগ্ন নির্জন এলাকাগুলোতে মানুষের উপস্থিতি কম থাকায় অপরাধীরা এগুলোকে তুলনামূলক নিরাপদ মনে করে। এছাড়া এক এলাকায় হত্যার পর অন্য এলাকায় মরদেহ ফেলে দেওয়ার প্রবণতাও তদন্তকে আরও জটিল করে তোলে।
তদন্তের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ পরিচয় শনাক্তকরণ
নদী থেকে মরদেহ উদ্ধারের পর তদন্তে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় পরিচয় শনাক্ত করা। নৌ-পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, অনেক সময় মরদেহ ভেসে ওঠার আগেই পচন ধরে যায়। আঙুলের ছাপ মুছে যায়, মুখমণ্ডল বিকৃত হয় এবং শরীরের আঘাতের চিহ্ন অস্পষ্ট হয়ে পড়ে। কখনও কেবল কঙ্কাল উদ্ধার হয়।
ফলে ময়নাতদন্তে মৃত্যুর কারণ বা হত্যার আলামত পাওয়া গেলেও ভুক্তভোগীর পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব না হলে তদন্ত অনেক ক্ষেত্রে থমকে যায়।
নৌ-পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে নদী থেকে মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় দায়ের হওয়া হত্যা মামলার মধ্যে ১২১টিতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। ৫৬টি মামলায় অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। এখনও তদন্তাধীন রয়েছে ১৩২টি হত্যা মামলা, আর ২৬টি মামলা তদন্ত করছে অন্যান্য সংস্থা।
বিশ্লেষকদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে নদী শুধু মরদেহ গোপনের স্থান নয়, বরং তদন্তকে দীর্ঘমেয়াদে অকার্যকর করে দেওয়ার একটি কৌশল হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে।
সমন্বিত নজরদারির তাগিদ
অধ্যাপক রেজাউল করিম মনে করেন, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু হত্যাকাণ্ডের পর তদন্ত জোরদার করলেই হবে না; প্রয়োজন সমন্বিত প্রতিরোধ ব্যবস্থা। পুলিশ, নৌ-পুলিশ, কোস্টগার্ড, স্থানীয় প্রশাসন, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং অপরাধ বিশ্লেষণকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
তার মতে, কোন নদী বা এলাকায় বেশি মরদেহ পাওয়া যাচ্ছে, কোন সেতু বা ঘাট বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, মরদেহ কোথা থেকে এনে ফেলা হতে পারে, কত সময় আগে পানিতে ফেলা হয়েছে এবং কোন শ্রেণির মানুষ বেশি টার্গেট হচ্ছে—এসব তথ্য পদ্ধতিগতভাবে বিশ্লেষণ করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীতে মরদেহ উদ্ধারের প্রবণতা ঠেকাতে ঘটনা-পরবর্তী পদক্ষেপের পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। যেসব সেতু, ঘাট, নদীপাড় বা নির্জন পয়েন্ট দিয়ে বেশি মরদেহ ফেলা হচ্ছে, সেগুলো চিহ্নিত করে ঝুঁকির মানচিত্র তৈরি করা প্রয়োজন।
এ ছাড়া নদীসংলগ্ন সড়ক, সেতু, ফেরিঘাট, ট্রলারঘাট ও নির্জন এলাকাগুলোতে সিসিটিভি, নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণ প্রযুক্তি এবং রাতের নজরদারি বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
একই সঙ্গে পুলিশ, নৌ-পুলিশ ও কোস্টগার্ডের মধ্যে সমন্বিত নজরদারি জোরদার করা, সন্দেহজনক নৌযান ও রাতের চলাচল পর্যবেক্ষণ করা এবং অজ্ঞাত মরদেহ শনাক্তে ফিঙ্গারপ্রিন্ট, ডিএনএ, ডিজিটাল ডাটাবেজ ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের তথ্যভান্ডারের সমন্বয় নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে, পারিবারিক, রাজনৈতিক, মাদক, সম্পত্তি কিংবা গ্যাং-সংক্রান্ত—কোন ধরনের বিরোধ সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ডে রূপ নিচ্ছে, সেটিও বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। কারণ অপরাধের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্যাটার্ন বোঝা ছাড়া কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
রিপোর্টারের নাম 

























