নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পকে ঘিরে প্রকাশ্যে চলছে মাদকের রমরমা বাণিজ্য। ক্যাম্পের আশপাশের বিভিন্ন সড়ক ও বাজার এলাকায় দিনের আলোতেই ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইনসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে এ পরিস্থিতি চললেও কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে মাদক কারবার আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, মোহাম্মদপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনের সড়ক থেকে জেনেভা ক্যাম্পের পূর্ব পাশের চৌরাস্তা মোড় পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্যেই মাদক বিক্রির প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে পথচারীদের। ক্যাম্প সংলগ্ন এলাকায় প্রবেশ করতেই কয়েকজন তরুণ আগন্তুকদের কাছে ইয়াবা ও গাঁজা কেনার প্রস্তাব দেয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ক্যাম্পের পূর্ব পাশের সড়ক, উত্তর পাশের রাস্তা, বাজার এলাকা এবং ক্যাম্পের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন স্থানে নিয়মিতভাবে মাদক বিক্রি হয়। বিক্রেতাদের বড় অংশই তরুণ ও যুবক। তারা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান করে ক্রেতাদের সঙ্গে দ্রুত লেনদেন সম্পন্ন করে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, অনেক বিক্রেতার কাছেই ইয়াবা, গাঁজা ও হেরোইনের পাশাপাশি দেশীয় মদও পাওয়া যায়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই মাদক লেনদেন সম্পন্ন হচ্ছে এবং ক্রেতাদের একটি বড় অংশ রিকশাচালক ও নিম্নআয়ের শ্রমজীবী মানুষ বলে দাবি করেছেন স্থানীয়রা।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে প্রায়ই ছিনতাই, চুরি, সংঘর্ষ ও নানা অপরাধ সংঘটিত হয়। বিশেষ করে রাতের দিকে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। তবে প্রতিশোধ বা হয়রানির আশঙ্কায় অধিকাংশ বাসিন্দাই প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, মাদক কারবারের কারণে এলাকার পরিবেশ দিন দিন খারাপ হচ্ছে। পরিবার নিয়ে নিরাপদে চলাফেরা করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। শিশু-কিশোরদের একটি অংশও মাদক ব্যবসা ও অপরাধচক্রের প্রভাবে জড়িয়ে পড়ছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তারা।
মাদক কারবারের বিষয়ে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি খুব কম দেখা যায়। যদিও মাঝে মধ্যে অভিযান পরিচালনার খবর পাওয়া যায়, তবে তা স্থায়ী কোনো পরিবর্তন আনতে পারছে না।
এ বিষয়ে মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মেসবাহ উদ্দিন বলেন, জেনেভা ক্যাম্প ও আশপাশের এলাকায় নিয়মিত নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত একাধিক চেকপোস্ট পরিচালনা করা হয় এবং মাদক নিয়ন্ত্রণে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
তবে স্থানীয়দের দাবি, দিনের বেলায়ও প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি হচ্ছে, যা নজরদারির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ-অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, জেনেভা ক্যাম্পকে কেন্দ্র করে যে অপরাধচক্র গড়ে উঠেছে, তা দীর্ঘদিনের ফল। শুধুমাত্র বিচ্ছিন্ন অভিযান দিয়ে এ সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, মাদক ব্যবসা ও অন্যান্য অপরাধের পেছনে যেসব ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সুবিধাভোগী হিসেবে কাজ করছে, তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে বিশেষায়িত বাহিনীর সমন্বিত অভিযান এবং দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক পুনর্বাসন কর্মসূচি প্রয়োজন।
ড. তৌহিদুল হক আরও বলেন, জেনেভা ক্যাম্পের বাসিন্দাদের সামাজিক ও নাগরিক অধিকার, কর্মসংস্থান এবং জীবনমান উন্নয়নের বিষয়েও রাষ্ট্রকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও অনিশ্চয়তা অনেককে অপরাধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, রাজধানীর অন্যতম আলোচিত এই এলাকায় মাদক নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযান, গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি এবং সামাজিক সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে মাদক ব্যবসার মূল হোতাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার দাবিও জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
রিপোর্টারের নাম 
























