ঢাকা ০৯:০২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬

গণমানুষের বাজেট: প্রত্যাশা বনাম বাস্তবতা

প্রতি বছর জুন মাস এলেই দেশের বাজেট নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে ওঠে। বিশেষজ্ঞরা টেলিভিশনে সরব হন, পত্রিকায় প্রকাশিত হয় নানা বিশ্লেষণ। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লায় চলে গভীর রাত পর্যন্ত আলোচনা। বাজেট ঘোষণার পর কিছুদিন হইচই হলেও, ধীরে ধীরে তা থিতিয়ে আসে। পরের বছর আবার একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি ঘটে। এই চক্রের বাইরে গিয়ে প্রশ্ন করা জরুরি— বাজেট কি আসলেই সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে? দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সাধারণ মানুষ, যেমন রাজশাহীর একজন রিকশাচালক, চাঁপাইনবাবগঞ্জের একজন আমচাষি, বা নারায়ণগঞ্জের একজন পোশাক শ্রমিক— তাদের দৈনন্দিন জীবনে বাজেটের প্রভাব কতটা?

রাজশাহীতে কাজ করার সময় দেখেছি, জেলা হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদ মাসের পর মাস শূন্য থাকে। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি থাকলেও তা পরিচালনার জন্য লোকবল নেই। মাঝে মাঝে ওষুধ এলেও, অনেক সময় সরবরাহ বন্ধ থাকে। ফলে, সাধারণ রোগীরা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসতে বাধ্য হন। এই আসা-যাওয়ার খরচ, হোটেল-খাওয়াদাওয়া মিলে একটি নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের কয়েক মাসের সঞ্চয় শেষ হয়ে যায়। বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়লেও, প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাসপাতালগুলোর চিত্র বদলাচ্ছে না। এই বৈষম্যই মূল সমস্যা।

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে, যা একটি বড় অঙ্ক। কিন্তু শুধু সংখ্যা দিয়ে কি মানুষের ভাগ্য বদলানো সম্ভব? বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনও দক্ষিণ এশিয়ার গড়ের তুলনায় বেশ কম, মাত্র ৭ থেকে ৮ শতাংশ। এই দুর্বল রাজস্ব ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে বড় বাজেট প্রণয়ন মানেই বেশি পরিমাণে ঋণ গ্রহণ। আগামী বাজেটে কেবল সুদ পরিশোধেই ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা এবং ভর্তুকিতে প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে। এই দুটি খাতে বাজেটের একটি বিশাল অংশ আটকে যাচ্ছে। তাহলে উন্নয়ন, জনকল্যাণ, সড়ক নির্মাণ বা হাসপাতাল সংস্কারের জন্য কতটুকু অর্থ বরাদ্দ থাকবে?

ভর্তুকির সুবিধা কারা পাচ্ছেন, সেই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি দেওয়া হলেও, এর সুফল মূলত ধনীরাই বেশি পাচ্ছেন। একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বড় কারখানা এবং একজন সাধারণ দিনমজুর— দুজনেই এই ভর্তুকির আওতায় আসছেন। তবে, কারখানার মালিকের বিদ্যুৎ বিল বেশি হওয়ায় তার প্রাপ্ত ভর্তুকির পরিমাণও অনেক বেশি। এই ব্যবস্থাটি আসলে উল্টো। সম্পদের সুষম বণ্টন না হলে, এমন ভর্তুকি কাঠামোর মাধ্যমে ধনীরাই বেশি লাভবান হচ্ছেন। এই অন্যায় কাঠামো পরিবর্তন করা জরুরি। জ্বালানি খাতে ধাপে ধাপে ভর্তুকি কমানোর প্রক্রিয়া শুরু করা প্রয়োজন।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

চাঁদাবাজি বন্ধে মানুষের এক-তৃতীয়াংশ শান্তি ফিরবে: জামায়াত আমির

গণমানুষের বাজেট: প্রত্যাশা বনাম বাস্তবতা

আপডেট সময় : ১২:৫৬:৫৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬

প্রতি বছর জুন মাস এলেই দেশের বাজেট নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে ওঠে। বিশেষজ্ঞরা টেলিভিশনে সরব হন, পত্রিকায় প্রকাশিত হয় নানা বিশ্লেষণ। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লায় চলে গভীর রাত পর্যন্ত আলোচনা। বাজেট ঘোষণার পর কিছুদিন হইচই হলেও, ধীরে ধীরে তা থিতিয়ে আসে। পরের বছর আবার একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি ঘটে। এই চক্রের বাইরে গিয়ে প্রশ্ন করা জরুরি— বাজেট কি আসলেই সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে? দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সাধারণ মানুষ, যেমন রাজশাহীর একজন রিকশাচালক, চাঁপাইনবাবগঞ্জের একজন আমচাষি, বা নারায়ণগঞ্জের একজন পোশাক শ্রমিক— তাদের দৈনন্দিন জীবনে বাজেটের প্রভাব কতটা?

রাজশাহীতে কাজ করার সময় দেখেছি, জেলা হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদ মাসের পর মাস শূন্য থাকে। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি থাকলেও তা পরিচালনার জন্য লোকবল নেই। মাঝে মাঝে ওষুধ এলেও, অনেক সময় সরবরাহ বন্ধ থাকে। ফলে, সাধারণ রোগীরা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসতে বাধ্য হন। এই আসা-যাওয়ার খরচ, হোটেল-খাওয়াদাওয়া মিলে একটি নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের কয়েক মাসের সঞ্চয় শেষ হয়ে যায়। বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়লেও, প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাসপাতালগুলোর চিত্র বদলাচ্ছে না। এই বৈষম্যই মূল সমস্যা।

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে, যা একটি বড় অঙ্ক। কিন্তু শুধু সংখ্যা দিয়ে কি মানুষের ভাগ্য বদলানো সম্ভব? বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনও দক্ষিণ এশিয়ার গড়ের তুলনায় বেশ কম, মাত্র ৭ থেকে ৮ শতাংশ। এই দুর্বল রাজস্ব ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে বড় বাজেট প্রণয়ন মানেই বেশি পরিমাণে ঋণ গ্রহণ। আগামী বাজেটে কেবল সুদ পরিশোধেই ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা এবং ভর্তুকিতে প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে। এই দুটি খাতে বাজেটের একটি বিশাল অংশ আটকে যাচ্ছে। তাহলে উন্নয়ন, জনকল্যাণ, সড়ক নির্মাণ বা হাসপাতাল সংস্কারের জন্য কতটুকু অর্থ বরাদ্দ থাকবে?

ভর্তুকির সুবিধা কারা পাচ্ছেন, সেই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি দেওয়া হলেও, এর সুফল মূলত ধনীরাই বেশি পাচ্ছেন। একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বড় কারখানা এবং একজন সাধারণ দিনমজুর— দুজনেই এই ভর্তুকির আওতায় আসছেন। তবে, কারখানার মালিকের বিদ্যুৎ বিল বেশি হওয়ায় তার প্রাপ্ত ভর্তুকির পরিমাণও অনেক বেশি। এই ব্যবস্থাটি আসলে উল্টো। সম্পদের সুষম বণ্টন না হলে, এমন ভর্তুকি কাঠামোর মাধ্যমে ধনীরাই বেশি লাভবান হচ্ছেন। এই অন্যায় কাঠামো পরিবর্তন করা জরুরি। জ্বালানি খাতে ধাপে ধাপে ভর্তুকি কমানোর প্রক্রিয়া শুরু করা প্রয়োজন।