ঢাকা ০৭:০৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনে মাধ্যমিকের সব বই পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা: ঝুলে আছে চুক্তি ও অন্যান্য ফ্যাক্টর

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১০:১১:২৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৫ নভেম্বর ২০২৫
  • ২৩ বার পড়া হয়েছে

২০২৬ শিক্ষাবর্ষ শুরু হতে বাকি আর মাত্র ৪৭ দিন, কিন্তু নতুন বছরের প্রথম দিন প্রাক-প্রাথমিক থেকে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিনামূল্যে বিতরণের জন্য নির্ধারিত ৩০ কোটি বইয়ের মধ্যে মাধ্যমিক স্তরের বই বিতরণে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। গত ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত প্রাথমিক স্তরের ৭২ শতাংশ বই উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছে গেলেও মাধ্যমিক স্তরে পৌঁছেছে মাত্র ৩ শতাংশ। প্রাথমিক স্তরের বই চলতি মাসের বাকি সময়ে শতভাগ সরবরাহ হলেও মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীরা জানুয়ারি মাসের প্রথম মাসে সব বই হাতে নাও পেতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) এবং প্রেসগুলোর মতে, এই অনিশ্চয়তার পেছনে বেশ কিছু কারণ বা ‘ফ্যাক্টর’ জড়িত। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো:

  • মাধ্যমিক স্তরের সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির বই ছাপানোর জন্য মুদ্রণ প্রেসগুলোর সঙ্গে এখনো চুক্তি সম্পন্ন না হওয়া।
  • নির্ধারিত সময়ে মানসম্মত বই নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ।
  • ডিসেম্বর মাস জুড়ে প্রেসগুলোর নোট ও গাইড ছাপানোর কাজে ব্যস্ত থাকা, ফলে বই বাঁধাইয়ের জন্য পর্যাপ্ত কারিগর না পাওয়া।
  • প্রেসগুলোর পক্ষ থেকে ছাপার কাজ পাওয়ার সনদ (অ্যাসাইনমেন্ট) এর বিপরীতে ব্যাংক থেকে দ্রুত ঋণ পাওয়া, উপজেলায় বই সরবরাহের পর দ্রুত বিল পরিশোধ এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি।

এই ৪৭ দিনের মধ্যে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের হাতে সব বই তুলে দেওয়ার লক্ষ্যে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) এখন নাস্তানাবুদ অবস্থায় আছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনসিটিবি ও প্রেসগুলো এই পরিস্থিতির কথা স্বীকার করেছে।

সরবরাহে বিলম্ব ও পরিসংখ্যান

সূত্র জানিয়েছে, প্রাথমিক স্তরের সব বই চলতি নভেম্বরের মধ্যেই উপজেলায় পৌঁছে যাবে। কিন্তু মোট বইয়ের সংখ্যা গত বছরের তুলনায় সামান্য কম হওয়া সত্ত্বেও মাধ্যমিকের ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির বই নির্দিষ্ট সময়ে পাওয়া নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে।

  • প্রাথমিক স্তর: এই স্তরে মোট পাঠ্যবইয়ের সংখ্যা ৮ কোটি ৫৯ লাখ ২৫ হাজার ৩৭৯ কপি। ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত ৭ কোটি ৬০ লাখের বেশি বই ছাপা ও বাঁধাই সম্পন্ন হয়েছে। উপজেলায় সরবরাহ হয়েছে ৬ কোটি ১৬ লাখের বেশি কপি, যা মোট বইয়ের প্রায় ৭২ শতাংশ। চলতি মাসের মধ্যে এই স্তরের শতভাগ সরবরাহ নিশ্চিত হবে।
  • মাধ্যমিক স্তর: ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণিতে মোট ২১ কোটি ৪৩ লাখ ৩০ হাজার ৩০০ কপি বই ছাপানোর লক্ষ্য রয়েছে। গত ১২ নভেম্বর পর্যন্ত অগ্রগতি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মোট বইয়ের মধ্যে উপজেলায় সরবরাহ হয়েছে মাত্র ৩ শতাংশ।
  • ইবতেদায়ি স্তর: এই স্তরের মোট ৩ কোটি ১১ লাখের বেশি বই ছাপানো হচ্ছে। অগ্রগতি অনুযায়ী, ৫৬ শতাংশ বই ছাপা ও বাঁধাই হয়েছে, আর উপজেলা পর্যায়ে সরবরাহ হয়েছে ২০ দশমিক ৪৬ শতাংশ।

শ্রেণিভিত্তিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ষষ্ঠ শ্রেণির বই ছাপার কাজ পেলেও মাত্র ১ শতাংশ বইয়ের পিডিআই সম্পন্ন হয়েছে এবং উপজেলায় কোনো বই পৌঁছেনি। নবম শ্রেণির ৪ শতাংশ বইয়ের পিডিআই সম্পন্ন হলেও উপজেলায় সরবরাহ শুরু হয়নি। তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির মোট ২০০টি লটের বই ছাপানোর জন্য এখনো চুক্তি না হওয়ায় কাজ শুরুই হয়নি। সার্বিকভাবে, মাধ্যমিক স্তরের সাড়ে ২১ কোটি বইয়ের মধ্যে উপজেলায় পৌঁছানোর জন্য প্রস্তুত হয়েছে মাত্র ২ দশমিক ৯৭ শতাংশ।

মান নিয়ে শঙ্কা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা

জানা গেছে, আগামী শিক্ষাবর্ষের ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির বই ছাপার কাজে প্রেসগুলো এনসিটিবির প্রাক্কলিত দরের চেয়ে অনেক কম দর দিয়েছে, যা মানসম্মত বই পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে।

সূত্রমতে, সিঙ্গেল (এক) কালারে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির বই ছাপার জন্য এনসিটিবির প্রাক্কলিত দর ৩ টাকা ১৫ পয়সা থাকলেও সর্বনিম্ন দর পড়েছে যথাক্রমে ২ টাকা ২৫ পয়সা, ২ টাকা ও ১ টাকা ৮৫ পয়সা। নবম শ্রেণির বই ছাপার সর্বনিম্ন দর পড়েছে ৩ টাকা ১০ পয়সা।

সূত্রমতে, বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী ন্যূনতম ২ টাকা ৪০ পয়সার নিচে এসব স্তরের মানসম্মত বই তৈরি করা সম্ভব নয়। ফলে দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী মানসম্পন্ন বই আদায় করা এনসিটিবির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে।

মাধ্যমিক স্তরের বই নিয়ে এমন অনিশ্চয়তার কারণ হলো, চলতি বছরও নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে শিক্ষার্থীদের হাতে সব বই পৌঁছেছিল। এই অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও এনসিটিবি ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির বইয়ের দরপত্র প্রক্রিয়া মে ও জুনে শেষ করে মূল্যায়ন করলেও ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটি সেপ্টেম্বর মাসে সেই দরপত্র বাতিল করে দেয়। ফলে আবার দরপত্র আহ্বান করতে হয়। নিয়মানুযায়ী, চুক্তির পর ৪৫ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে বই সরবরাহ করার কথা। কিন্তু ষষ্ঠ ও নবম শ্রেণির কিছু চুক্তি সম্পন্ন হলেও সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির বই ছাপার চুক্তি এখনো হয়নি।

এনসিটিবিতে নতুন নেতৃত্ব ও প্রতিশ্রুত সমাধান

বই ছাপার এই নাজুক পরিস্থিতিতে এনসিটিবির চেয়ারম্যান পদে অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা প্রফেসর রবিউল কবীর চৌধুরী গত নভেম্বর অবসর গ্রহণ করেন। এরপর নভেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. মাহবুবুল হক পাটওয়ারীকে এনসিটিবির চেয়ারম্যানের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়।

নতুন চেয়ারম্যান দায়িত্ব নেওয়ার পর ১২ নভেম্বর বই উৎপাদন ও বিতরণের পরিস্থিতি নিয়ে প্রেসগুলোর সঙ্গে এনসিটিবির একটি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভায় শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার এবং শিক্ষাসচিব উপস্থিত ছিলেন। শিক্ষা উপদেষ্টা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মানসম্মত বই সরবরাহের জন্য প্রেসগুলোর প্রতি আহ্বান জানান।

প্রেসগুলো তিনটি বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানায়:

  • কাজ পাওয়ার সনদের (অ্যাসাইনমেন্ট) বিপরীতে ব্যাংক থেকে দ্রুত ঋণ পাওয়ার ব্যবস্থা করা।
  • উপজেলায় বই সরবরাহের পর অনলাইনে চালান আপলোড করে দ্রুত বিল পরিশোধের ব্যবস্থা করা।
  • বই ছাপার কাজ বেশি হয় এমন স্থানগুলোতে (মাতুয়াইল, রূপগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ, সাভার, নোয়াখালী ও চট্টগ্রাম) নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা।

বাংলাদেশ মুদ্রণশিল্প সমিতির একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বাস্তবতা হলো এখন যেকোনো মূল্যে সময় ব্যবস্থাপনায় জোর দিতে হবে। বিশেষ করে নবম শ্রেণির মোটা বইগুলোর কাজ দ্রুত শেষ করা উচিত।

মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান বলেন, এনসিটিবি আগে শুরু করেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় পিছিয়ে গেছে। ব্যাংক থেকে সময়মতো ঋণ না পেলে প্রেসগুলো কাজ শুরু করতে পারবে না, আবার কাগজ সরবরাহকারীরাও টাকা না পেলে কাগজ দেবে না। সব মিলিয়ে নির্দিষ্ট সময়ে বই সরবরাহ করা কঠিন হবে।

সার্বিক বিষয়ে এনসিটিবির নতুন চেয়ারম্যান মো. মাহবুবুল হক পাটওয়ারী বলেন, “নির্দিষ্ট সময়ে বই দেওয়ার জন্য শিক্ষা উপদেষ্টার নেতৃত্বে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। প্রেসগুলো কিছু সমস্যার কথা আমাদের জানিয়েছে। আগামী মঙ্গলবারের মধ্যে এই সমস্যাগুলোর ইতিবাচক সমাধানের চেষ্টা করব। আশা করি সমস্যা হবে না।”

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরানে সহিংসতায় প্রাণহানি: দেশজুড়ে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা

শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনে মাধ্যমিকের সব বই পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা: ঝুলে আছে চুক্তি ও অন্যান্য ফ্যাক্টর

আপডেট সময় : ১০:১১:২৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৫ নভেম্বর ২০২৫

২০২৬ শিক্ষাবর্ষ শুরু হতে বাকি আর মাত্র ৪৭ দিন, কিন্তু নতুন বছরের প্রথম দিন প্রাক-প্রাথমিক থেকে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিনামূল্যে বিতরণের জন্য নির্ধারিত ৩০ কোটি বইয়ের মধ্যে মাধ্যমিক স্তরের বই বিতরণে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। গত ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত প্রাথমিক স্তরের ৭২ শতাংশ বই উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছে গেলেও মাধ্যমিক স্তরে পৌঁছেছে মাত্র ৩ শতাংশ। প্রাথমিক স্তরের বই চলতি মাসের বাকি সময়ে শতভাগ সরবরাহ হলেও মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীরা জানুয়ারি মাসের প্রথম মাসে সব বই হাতে নাও পেতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) এবং প্রেসগুলোর মতে, এই অনিশ্চয়তার পেছনে বেশ কিছু কারণ বা ‘ফ্যাক্টর’ জড়িত। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো:

  • মাধ্যমিক স্তরের সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির বই ছাপানোর জন্য মুদ্রণ প্রেসগুলোর সঙ্গে এখনো চুক্তি সম্পন্ন না হওয়া।
  • নির্ধারিত সময়ে মানসম্মত বই নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ।
  • ডিসেম্বর মাস জুড়ে প্রেসগুলোর নোট ও গাইড ছাপানোর কাজে ব্যস্ত থাকা, ফলে বই বাঁধাইয়ের জন্য পর্যাপ্ত কারিগর না পাওয়া।
  • প্রেসগুলোর পক্ষ থেকে ছাপার কাজ পাওয়ার সনদ (অ্যাসাইনমেন্ট) এর বিপরীতে ব্যাংক থেকে দ্রুত ঋণ পাওয়া, উপজেলায় বই সরবরাহের পর দ্রুত বিল পরিশোধ এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি।

এই ৪৭ দিনের মধ্যে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের হাতে সব বই তুলে দেওয়ার লক্ষ্যে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) এখন নাস্তানাবুদ অবস্থায় আছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনসিটিবি ও প্রেসগুলো এই পরিস্থিতির কথা স্বীকার করেছে।

সরবরাহে বিলম্ব ও পরিসংখ্যান

সূত্র জানিয়েছে, প্রাথমিক স্তরের সব বই চলতি নভেম্বরের মধ্যেই উপজেলায় পৌঁছে যাবে। কিন্তু মোট বইয়ের সংখ্যা গত বছরের তুলনায় সামান্য কম হওয়া সত্ত্বেও মাধ্যমিকের ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির বই নির্দিষ্ট সময়ে পাওয়া নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে।

  • প্রাথমিক স্তর: এই স্তরে মোট পাঠ্যবইয়ের সংখ্যা ৮ কোটি ৫৯ লাখ ২৫ হাজার ৩৭৯ কপি। ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত ৭ কোটি ৬০ লাখের বেশি বই ছাপা ও বাঁধাই সম্পন্ন হয়েছে। উপজেলায় সরবরাহ হয়েছে ৬ কোটি ১৬ লাখের বেশি কপি, যা মোট বইয়ের প্রায় ৭২ শতাংশ। চলতি মাসের মধ্যে এই স্তরের শতভাগ সরবরাহ নিশ্চিত হবে।
  • মাধ্যমিক স্তর: ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণিতে মোট ২১ কোটি ৪৩ লাখ ৩০ হাজার ৩০০ কপি বই ছাপানোর লক্ষ্য রয়েছে। গত ১২ নভেম্বর পর্যন্ত অগ্রগতি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মোট বইয়ের মধ্যে উপজেলায় সরবরাহ হয়েছে মাত্র ৩ শতাংশ।
  • ইবতেদায়ি স্তর: এই স্তরের মোট ৩ কোটি ১১ লাখের বেশি বই ছাপানো হচ্ছে। অগ্রগতি অনুযায়ী, ৫৬ শতাংশ বই ছাপা ও বাঁধাই হয়েছে, আর উপজেলা পর্যায়ে সরবরাহ হয়েছে ২০ দশমিক ৪৬ শতাংশ।

শ্রেণিভিত্তিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ষষ্ঠ শ্রেণির বই ছাপার কাজ পেলেও মাত্র ১ শতাংশ বইয়ের পিডিআই সম্পন্ন হয়েছে এবং উপজেলায় কোনো বই পৌঁছেনি। নবম শ্রেণির ৪ শতাংশ বইয়ের পিডিআই সম্পন্ন হলেও উপজেলায় সরবরাহ শুরু হয়নি। তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির মোট ২০০টি লটের বই ছাপানোর জন্য এখনো চুক্তি না হওয়ায় কাজ শুরুই হয়নি। সার্বিকভাবে, মাধ্যমিক স্তরের সাড়ে ২১ কোটি বইয়ের মধ্যে উপজেলায় পৌঁছানোর জন্য প্রস্তুত হয়েছে মাত্র ২ দশমিক ৯৭ শতাংশ।

মান নিয়ে শঙ্কা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা

জানা গেছে, আগামী শিক্ষাবর্ষের ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির বই ছাপার কাজে প্রেসগুলো এনসিটিবির প্রাক্কলিত দরের চেয়ে অনেক কম দর দিয়েছে, যা মানসম্মত বই পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে।

সূত্রমতে, সিঙ্গেল (এক) কালারে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির বই ছাপার জন্য এনসিটিবির প্রাক্কলিত দর ৩ টাকা ১৫ পয়সা থাকলেও সর্বনিম্ন দর পড়েছে যথাক্রমে ২ টাকা ২৫ পয়সা, ২ টাকা ও ১ টাকা ৮৫ পয়সা। নবম শ্রেণির বই ছাপার সর্বনিম্ন দর পড়েছে ৩ টাকা ১০ পয়সা।

সূত্রমতে, বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী ন্যূনতম ২ টাকা ৪০ পয়সার নিচে এসব স্তরের মানসম্মত বই তৈরি করা সম্ভব নয়। ফলে দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী মানসম্পন্ন বই আদায় করা এনসিটিবির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে।

মাধ্যমিক স্তরের বই নিয়ে এমন অনিশ্চয়তার কারণ হলো, চলতি বছরও নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে শিক্ষার্থীদের হাতে সব বই পৌঁছেছিল। এই অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও এনসিটিবি ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির বইয়ের দরপত্র প্রক্রিয়া মে ও জুনে শেষ করে মূল্যায়ন করলেও ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটি সেপ্টেম্বর মাসে সেই দরপত্র বাতিল করে দেয়। ফলে আবার দরপত্র আহ্বান করতে হয়। নিয়মানুযায়ী, চুক্তির পর ৪৫ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে বই সরবরাহ করার কথা। কিন্তু ষষ্ঠ ও নবম শ্রেণির কিছু চুক্তি সম্পন্ন হলেও সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির বই ছাপার চুক্তি এখনো হয়নি।

এনসিটিবিতে নতুন নেতৃত্ব ও প্রতিশ্রুত সমাধান

বই ছাপার এই নাজুক পরিস্থিতিতে এনসিটিবির চেয়ারম্যান পদে অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা প্রফেসর রবিউল কবীর চৌধুরী গত নভেম্বর অবসর গ্রহণ করেন। এরপর নভেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. মাহবুবুল হক পাটওয়ারীকে এনসিটিবির চেয়ারম্যানের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়।

নতুন চেয়ারম্যান দায়িত্ব নেওয়ার পর ১২ নভেম্বর বই উৎপাদন ও বিতরণের পরিস্থিতি নিয়ে প্রেসগুলোর সঙ্গে এনসিটিবির একটি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভায় শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার এবং শিক্ষাসচিব উপস্থিত ছিলেন। শিক্ষা উপদেষ্টা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মানসম্মত বই সরবরাহের জন্য প্রেসগুলোর প্রতি আহ্বান জানান।

প্রেসগুলো তিনটি বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানায়:

  • কাজ পাওয়ার সনদের (অ্যাসাইনমেন্ট) বিপরীতে ব্যাংক থেকে দ্রুত ঋণ পাওয়ার ব্যবস্থা করা।
  • উপজেলায় বই সরবরাহের পর অনলাইনে চালান আপলোড করে দ্রুত বিল পরিশোধের ব্যবস্থা করা।
  • বই ছাপার কাজ বেশি হয় এমন স্থানগুলোতে (মাতুয়াইল, রূপগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ, সাভার, নোয়াখালী ও চট্টগ্রাম) নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা।

বাংলাদেশ মুদ্রণশিল্প সমিতির একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বাস্তবতা হলো এখন যেকোনো মূল্যে সময় ব্যবস্থাপনায় জোর দিতে হবে। বিশেষ করে নবম শ্রেণির মোটা বইগুলোর কাজ দ্রুত শেষ করা উচিত।

মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান বলেন, এনসিটিবি আগে শুরু করেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় পিছিয়ে গেছে। ব্যাংক থেকে সময়মতো ঋণ না পেলে প্রেসগুলো কাজ শুরু করতে পারবে না, আবার কাগজ সরবরাহকারীরাও টাকা না পেলে কাগজ দেবে না। সব মিলিয়ে নির্দিষ্ট সময়ে বই সরবরাহ করা কঠিন হবে।

সার্বিক বিষয়ে এনসিটিবির নতুন চেয়ারম্যান মো. মাহবুবুল হক পাটওয়ারী বলেন, “নির্দিষ্ট সময়ে বই দেওয়ার জন্য শিক্ষা উপদেষ্টার নেতৃত্বে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। প্রেসগুলো কিছু সমস্যার কথা আমাদের জানিয়েছে। আগামী মঙ্গলবারের মধ্যে এই সমস্যাগুলোর ইতিবাচক সমাধানের চেষ্টা করব। আশা করি সমস্যা হবে না।”