ঢাকা ০২:১৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬

পবিপ্রবির উপ-উপাচার্যের বিরুদ্ধে গবেষণা জালিয়াতির অভিযোগ: নিয়োগের আগে সাইটেশন অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, পরে উধাও

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পবিপ্রবি) উপ-উপাচার্য এবং কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. এস এম হেমায়েত জাহানের বিরুদ্ধে গুরুতর গবেষণা জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, উপ-উপাচার্য পদে নিয়োগ পাওয়ার আগে তিনি গুগল স্কলারে নিজের প্রোফাইলে অন্য গবেষকদের প্রবন্ধ যুক্ত করে কৃত্রিমভাবে সাইটেশন সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়েছিলেন। পরবর্তীতে নিয়োগ পাওয়ার পর তার পূর্বের প্রোফাইল থেকে সেই অতিরিক্ত সাইটেশনগুলো মুছে যায়, যা বর্তমানে তার সাইটেশন সংখ্যার সঙ্গে বিশাল ফারাক তৈরি করেছে।

গবেষণা জগতে একজন গবেষকের গ্রহণযোগ্যতা ও প্রভাব পরিমাপের অন্যতম প্রধান সূচক হলো সাইটেশন সংখ্যা। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নিয়োগ, পদোন্নতি কিংবা গবেষণা অনুদান নির্ধারণে এই সংখ্যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ কারণে সাইটেশন সংখ্যা কৃত্রিমভাবে বাড়ানোর অভিযোগ নতুন নয়। জানা যায়, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপাচার্য ও উপ-উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে শিক্ষকতার পাশাপাশি একজন ভালো গবেষককে অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতি গ্রহণ করে। সে সময় উপাচার্য হওয়ার প্রয়াসেই অধ্যাপক হেমায়েত জাহান এই কৃত্রিম পন্থা অবলম্বন করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, উপ-উপাচার্য পদে নিয়োগের প্রাক্কালে অধ্যাপক ড. এস এম হেমায়েত জাহানের গুগল স্কলার প্রোফাইলে সাইটেশন সংখ্যা ১ হাজার ৯৬০-এ পৌঁছেছিল। অভিযোগ উঠেছে, তিনি মূলত অস্ট্রেলিয়ান গবেষক Sayka Jahan (S Jahan)-এর বহু গবেষণা প্রবন্ধ নিজের প্রোফাইলে আপলোড করেছিলেন। এসব বর্ধিত সাইটেশনের ভিত্তিতেই তিনি ২০২৪ সালের ২৭ অক্টোবর পবিপ্রবির উপ-উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান। তবে বর্তমানে তার বিদ্যমান গুগল স্কলার প্রোফাইলে মাত্র ৩২৬টি সাইটেশন দেখা যাচ্ছে, যা আগের সংখ্যার সঙ্গে বিশাল অসঙ্গতিপূর্ণ। এই অসঙ্গতি সামনে আসে মূলত শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক বেলাল হোসাইনের বিরুদ্ধে সাইটেশন জালিয়াতির বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রচারের পর। এর পরপরই অধ্যাপক হেমায়েত জাহান তার প্রোফাইল থেকে অন্য গবেষকদের প্রবন্ধ সরিয়ে নেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক ড. এস এম হেমায়েত জাহান প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় ঘটনাটিকে “অটোমেটিক পদ্ধতির ফল” হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, “স্বয়ংক্রিয় সিস্টেমের কারণেই হয়তো অতিরিক্ত সাইটেশন যুক্ত হয়েছিল। পরবর্তীতে অন্যান্য গবেষকদের নাম নজরে এলে বিষয়টি সংশোধনের উদ্যোগ নেই।” একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, “দীর্ঘ সময় ধরে আমি প্রোফাইলে সাইটেশন বৃদ্ধির বিষয়টি খেয়াল করিনি, তাই এভাবে অন্যের আর্টিকেল যুক্ত হয়ে গিয়েছিল।”

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক অধ্যাপক ড. মো. গুলজার হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেন, “গুগল স্কলার অটোমেটিক এনাবল করে রেখে অনেকেই অন্যের আর্টিকেল নিজের প্রোফাইলে যুক্ত করে ফেলেন। কিন্তু একজন গবেষক যখনই তার অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করেন, তখন তিনি দেখতে পারেন কারও সাইটেশন যুক্ত হয়েছে কি না। একই সঙ্গে কিছু ক্ষেত্রে আর্টিকেল যুক্ত হওয়ার পর সাজেশনও আসে—সেই আর্টিকেল তার কি না। তাই পদ-পদবি পাওয়ার উদ্দেশ্যে অন্যের সাইটেশন নিজের প্রোফাইলে যুক্ত করে রাখা বড় অন্যায়। এসব জালিয়াতির ব্যাপারে গুগল স্কলার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পেলে আইডি বন্ধ করে দেয়।”

বিশিষ্ট গবেষক ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক ড. এম শহিদুল ইসলাম এই গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে বলেন, “এত কম সময়ে এত বিশাল সংখ্যক সাইটেশন বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ। এ ধরনের গবেষকদের আমরা সাধারণত ‘সিউডো সায়েন্টিস্ট’ বা ছদ্ম-বিজ্ঞানী বলে থাকি। সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের ক্যারিয়ার ইভালুয়েশন করা উচিত। যদি কোনো ম্যানিপুলেশনের মাধ্যমে এভাবে সাইটেশন বৃদ্ধি করে কোনো পদ-পদবি পেয়ে থাকেন, তবে সরকারি বিধি মোতাবেক পদাবনতির বিধান রয়েছে।”

উল্লেখ্য, অধ্যাপক ড. এস এম হেমায়েত জাহানের বিরুদ্ধে বিতর্ক এই প্রথম নয়। জানা যায়, তিনি একটি কলেজের প্রাণীবিদ্যার ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও ২০০৬ সালে পবিপ্রবির কীটতত্ত্ব বিভাগে নিয়োগ পান। বিস্ময়কর বিষয় হলো, প্রভাষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী তিনি কীটতত্ত্ব বিভাগে আবেদনই করেননি; বরং আবেদন করেছিলেন এগ্রোফরেস্ট্রি বিভাগে। শুধু তাই নয়, রাজনৈতিক প্রভাব ও সুসম্পর্কের জেরে নিয়োগের পরপরই তৎকালীন জামায়াতপন্থী উপাচার্য ড. আবদুল লতিফ মাসুমের ব্যক্তিগত সচিব হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন। বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন ইউট্যাবের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও একবার শিবিরের একটি কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থী কিছু শিক্ষক-কর্মকর্তার সঙ্গে তার মনোমালিন্য ও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরান যুদ্ধকে ভয় পায় না, আত্মসমর্পণের চেয়েও বেশি ভীত

পবিপ্রবির উপ-উপাচার্যের বিরুদ্ধে গবেষণা জালিয়াতির অভিযোগ: নিয়োগের আগে সাইটেশন অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, পরে উধাও

আপডেট সময় : ১২:৩৪:০৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ মার্চ ২০২৬

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পবিপ্রবি) উপ-উপাচার্য এবং কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. এস এম হেমায়েত জাহানের বিরুদ্ধে গুরুতর গবেষণা জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, উপ-উপাচার্য পদে নিয়োগ পাওয়ার আগে তিনি গুগল স্কলারে নিজের প্রোফাইলে অন্য গবেষকদের প্রবন্ধ যুক্ত করে কৃত্রিমভাবে সাইটেশন সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়েছিলেন। পরবর্তীতে নিয়োগ পাওয়ার পর তার পূর্বের প্রোফাইল থেকে সেই অতিরিক্ত সাইটেশনগুলো মুছে যায়, যা বর্তমানে তার সাইটেশন সংখ্যার সঙ্গে বিশাল ফারাক তৈরি করেছে।

গবেষণা জগতে একজন গবেষকের গ্রহণযোগ্যতা ও প্রভাব পরিমাপের অন্যতম প্রধান সূচক হলো সাইটেশন সংখ্যা। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নিয়োগ, পদোন্নতি কিংবা গবেষণা অনুদান নির্ধারণে এই সংখ্যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ কারণে সাইটেশন সংখ্যা কৃত্রিমভাবে বাড়ানোর অভিযোগ নতুন নয়। জানা যায়, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপাচার্য ও উপ-উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে শিক্ষকতার পাশাপাশি একজন ভালো গবেষককে অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতি গ্রহণ করে। সে সময় উপাচার্য হওয়ার প্রয়াসেই অধ্যাপক হেমায়েত জাহান এই কৃত্রিম পন্থা অবলম্বন করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, উপ-উপাচার্য পদে নিয়োগের প্রাক্কালে অধ্যাপক ড. এস এম হেমায়েত জাহানের গুগল স্কলার প্রোফাইলে সাইটেশন সংখ্যা ১ হাজার ৯৬০-এ পৌঁছেছিল। অভিযোগ উঠেছে, তিনি মূলত অস্ট্রেলিয়ান গবেষক Sayka Jahan (S Jahan)-এর বহু গবেষণা প্রবন্ধ নিজের প্রোফাইলে আপলোড করেছিলেন। এসব বর্ধিত সাইটেশনের ভিত্তিতেই তিনি ২০২৪ সালের ২৭ অক্টোবর পবিপ্রবির উপ-উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান। তবে বর্তমানে তার বিদ্যমান গুগল স্কলার প্রোফাইলে মাত্র ৩২৬টি সাইটেশন দেখা যাচ্ছে, যা আগের সংখ্যার সঙ্গে বিশাল অসঙ্গতিপূর্ণ। এই অসঙ্গতি সামনে আসে মূলত শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক বেলাল হোসাইনের বিরুদ্ধে সাইটেশন জালিয়াতির বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রচারের পর। এর পরপরই অধ্যাপক হেমায়েত জাহান তার প্রোফাইল থেকে অন্য গবেষকদের প্রবন্ধ সরিয়ে নেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক ড. এস এম হেমায়েত জাহান প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় ঘটনাটিকে “অটোমেটিক পদ্ধতির ফল” হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, “স্বয়ংক্রিয় সিস্টেমের কারণেই হয়তো অতিরিক্ত সাইটেশন যুক্ত হয়েছিল। পরবর্তীতে অন্যান্য গবেষকদের নাম নজরে এলে বিষয়টি সংশোধনের উদ্যোগ নেই।” একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, “দীর্ঘ সময় ধরে আমি প্রোফাইলে সাইটেশন বৃদ্ধির বিষয়টি খেয়াল করিনি, তাই এভাবে অন্যের আর্টিকেল যুক্ত হয়ে গিয়েছিল।”

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক অধ্যাপক ড. মো. গুলজার হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেন, “গুগল স্কলার অটোমেটিক এনাবল করে রেখে অনেকেই অন্যের আর্টিকেল নিজের প্রোফাইলে যুক্ত করে ফেলেন। কিন্তু একজন গবেষক যখনই তার অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করেন, তখন তিনি দেখতে পারেন কারও সাইটেশন যুক্ত হয়েছে কি না। একই সঙ্গে কিছু ক্ষেত্রে আর্টিকেল যুক্ত হওয়ার পর সাজেশনও আসে—সেই আর্টিকেল তার কি না। তাই পদ-পদবি পাওয়ার উদ্দেশ্যে অন্যের সাইটেশন নিজের প্রোফাইলে যুক্ত করে রাখা বড় অন্যায়। এসব জালিয়াতির ব্যাপারে গুগল স্কলার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পেলে আইডি বন্ধ করে দেয়।”

বিশিষ্ট গবেষক ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক ড. এম শহিদুল ইসলাম এই গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে বলেন, “এত কম সময়ে এত বিশাল সংখ্যক সাইটেশন বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ। এ ধরনের গবেষকদের আমরা সাধারণত ‘সিউডো সায়েন্টিস্ট’ বা ছদ্ম-বিজ্ঞানী বলে থাকি। সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের ক্যারিয়ার ইভালুয়েশন করা উচিত। যদি কোনো ম্যানিপুলেশনের মাধ্যমে এভাবে সাইটেশন বৃদ্ধি করে কোনো পদ-পদবি পেয়ে থাকেন, তবে সরকারি বিধি মোতাবেক পদাবনতির বিধান রয়েছে।”

উল্লেখ্য, অধ্যাপক ড. এস এম হেমায়েত জাহানের বিরুদ্ধে বিতর্ক এই প্রথম নয়। জানা যায়, তিনি একটি কলেজের প্রাণীবিদ্যার ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও ২০০৬ সালে পবিপ্রবির কীটতত্ত্ব বিভাগে নিয়োগ পান। বিস্ময়কর বিষয় হলো, প্রভাষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী তিনি কীটতত্ত্ব বিভাগে আবেদনই করেননি; বরং আবেদন করেছিলেন এগ্রোফরেস্ট্রি বিভাগে। শুধু তাই নয়, রাজনৈতিক প্রভাব ও সুসম্পর্কের জেরে নিয়োগের পরপরই তৎকালীন জামায়াতপন্থী উপাচার্য ড. আবদুল লতিফ মাসুমের ব্যক্তিগত সচিব হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন। বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন ইউট্যাবের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও একবার শিবিরের একটি কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থী কিছু শিক্ষক-কর্মকর্তার সঙ্গে তার মনোমালিন্য ও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল।