ঢাকা ০৪:৫৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬

অর্থনীতির কঠিন পরীক্ষায় বিএনপি সরকার: বড় ব্যয়ের বাজেট ও বহুমুখী চ্যালেঞ্জ

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০১:০৬:০০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
  • ১১ বার পড়া হয়েছে

অসীম চাহিদা আর সীমিত সম্পদের যোগান নিয়ে এক গভীর অর্থনৈতিক সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে বিএনপি সরকার। বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিশেষ করে ইরান-ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের প্রভাবে তৈরি হওয়া জ্বালানি সংকট দেশের অর্থনীতির প্রতিটি খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এমন পরিস্থিতিতে একদিকে যেমন নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চাপ রয়েছে, অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এনে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দেওয়া সরকারের জন্য এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, রাজস্ব খাতে ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশাল ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও সরকার কৃচ্ছ্র সাধনের পরিবর্তে একটি সম্প্রসারণশীল বাজেট দেওয়ার পরিকল্পনা করছে, যাতে কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের গতি সচল রাখা যায়।

বাজেটের আকার ও লক্ষ্যমাত্রা

নতুন অর্থবছরের বাজেটের মূল দর্শন হলো বিএনপি সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারের বাস্তবায়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী শক্তিশালী করা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অন্তর্বর্তী সরকার যেখানে বাজেটের আকার কমিয়ে ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা করেছিল, সেখানে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের আকার প্রায় ১৪ থেকে ১৮ শতাংশ বাড়িয়ে ৯ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণের প্রাথমিক পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

  • নতুন কর্মসূচি: ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড এবং ঐতিহাসিকভাবে পরিচিত ‘খাল কাটা কর্মসূচি’র মাধ্যমে প্রান্তিক মানুষের কাছে সরাসরি সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
  • উন্নয়ন বাজেট: কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের ধারা বজায় রাখতে উন্নয়ন বাজেটে কোনো ধরনের কাটছাঁট না করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে সরকার।
  • আর্থিক লক্ষ্যমাত্রা: আগামী অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬.২ শতাংশে উন্নীত করা এবং মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিদ্যমান অর্থনৈতিক সংকট ও ঝুঁকি

দীর্ঘ ২০ বছর পর ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারের জন্য এই বাজেটটি একটি বড় পরীক্ষা। বর্তমানে প্রবাসী আয় ছাড়া সামষ্টিক অর্থনীতির প্রায় সব সূচকই নেতিবাচক ধারায় রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, তিনটি প্রধান কারণে বাজেটের ব্যয় পরিকল্পনা বিশাল হচ্ছে:

  1. বিভিন্ন খাতে ক্রমবর্ধমান ভর্তুকির চাপ।
  2. প্রস্তাবিত নতুন বেতন কাঠামোর সুপারিশ বাস্তবায়ন।
  3. রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও জনকল্যাণমূলক নতুন প্রকল্পসমূহ।

বিশেষজ্ঞ অভিমত: বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলা করে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখাই সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। রাজনৈতিক পরিকল্পনা ও নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির মেলবন্ধন ঘটানো সরকারের জন্য এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।


চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের কৌশল

গত বুধবার অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত কোঅর্ডিনেশন কাউন্সিলের বৈঠকে বাজেটের রূপরেখা ও সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। সরকার চাচ্ছে মানুষের অপ্রয়োজনীয় ভোগ কমিয়ে আনতে, তবে উৎপাদনশীল খাতে ব্যয় বাড়িয়ে প্রবৃদ্ধির ধারা পুনরুদ্ধার করতে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিশাল ব্যয়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখে আয় বাড়ানোর কৌশল খুঁজছে, যদিও বড় আকারের বাজেট ঘাটতি থাকা প্রায় নিশ্চিত। পতিত সরকারের আমল থেকে শুরু হওয়া উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বর্তমান বৈশ্বিক যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে দেশের অর্থনীতিকে পুনরায় সচল করাই হবে এই বাজেটের চূড়ান্ত সার্থকতা।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

শেষ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি: গভীর সংকটের মুখে কূটনৈতিক তৎপরতা

অর্থনীতির কঠিন পরীক্ষায় বিএনপি সরকার: বড় ব্যয়ের বাজেট ও বহুমুখী চ্যালেঞ্জ

আপডেট সময় : ০১:০৬:০০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬

অসীম চাহিদা আর সীমিত সম্পদের যোগান নিয়ে এক গভীর অর্থনৈতিক সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে বিএনপি সরকার। বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিশেষ করে ইরান-ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের প্রভাবে তৈরি হওয়া জ্বালানি সংকট দেশের অর্থনীতির প্রতিটি খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এমন পরিস্থিতিতে একদিকে যেমন নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চাপ রয়েছে, অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এনে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দেওয়া সরকারের জন্য এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, রাজস্ব খাতে ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশাল ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও সরকার কৃচ্ছ্র সাধনের পরিবর্তে একটি সম্প্রসারণশীল বাজেট দেওয়ার পরিকল্পনা করছে, যাতে কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের গতি সচল রাখা যায়।

বাজেটের আকার ও লক্ষ্যমাত্রা

নতুন অর্থবছরের বাজেটের মূল দর্শন হলো বিএনপি সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারের বাস্তবায়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী শক্তিশালী করা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অন্তর্বর্তী সরকার যেখানে বাজেটের আকার কমিয়ে ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা করেছিল, সেখানে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের আকার প্রায় ১৪ থেকে ১৮ শতাংশ বাড়িয়ে ৯ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণের প্রাথমিক পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

  • নতুন কর্মসূচি: ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড এবং ঐতিহাসিকভাবে পরিচিত ‘খাল কাটা কর্মসূচি’র মাধ্যমে প্রান্তিক মানুষের কাছে সরাসরি সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
  • উন্নয়ন বাজেট: কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের ধারা বজায় রাখতে উন্নয়ন বাজেটে কোনো ধরনের কাটছাঁট না করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে সরকার।
  • আর্থিক লক্ষ্যমাত্রা: আগামী অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬.২ শতাংশে উন্নীত করা এবং মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিদ্যমান অর্থনৈতিক সংকট ও ঝুঁকি

দীর্ঘ ২০ বছর পর ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারের জন্য এই বাজেটটি একটি বড় পরীক্ষা। বর্তমানে প্রবাসী আয় ছাড়া সামষ্টিক অর্থনীতির প্রায় সব সূচকই নেতিবাচক ধারায় রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, তিনটি প্রধান কারণে বাজেটের ব্যয় পরিকল্পনা বিশাল হচ্ছে:

  1. বিভিন্ন খাতে ক্রমবর্ধমান ভর্তুকির চাপ।
  2. প্রস্তাবিত নতুন বেতন কাঠামোর সুপারিশ বাস্তবায়ন।
  3. রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও জনকল্যাণমূলক নতুন প্রকল্পসমূহ।

বিশেষজ্ঞ অভিমত: বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলা করে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখাই সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। রাজনৈতিক পরিকল্পনা ও নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির মেলবন্ধন ঘটানো সরকারের জন্য এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।


চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের কৌশল

গত বুধবার অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত কোঅর্ডিনেশন কাউন্সিলের বৈঠকে বাজেটের রূপরেখা ও সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। সরকার চাচ্ছে মানুষের অপ্রয়োজনীয় ভোগ কমিয়ে আনতে, তবে উৎপাদনশীল খাতে ব্যয় বাড়িয়ে প্রবৃদ্ধির ধারা পুনরুদ্ধার করতে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিশাল ব্যয়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখে আয় বাড়ানোর কৌশল খুঁজছে, যদিও বড় আকারের বাজেট ঘাটতি থাকা প্রায় নিশ্চিত। পতিত সরকারের আমল থেকে শুরু হওয়া উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বর্তমান বৈশ্বিক যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে দেশের অর্থনীতিকে পুনরায় সচল করাই হবে এই বাজেটের চূড়ান্ত সার্থকতা।