বাংলাদেশের বিমা খাতের ওপর থেকে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্রমেই তলানিতে ঠেকছে। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৫৮টি বিমা কোম্পানির মধ্যে মাত্র ১০টিতে বিদেশি বিনিয়োগ রয়েছে। তবে এই অংশগ্রহণও নামমাত্র। এমনকি অনেক কোম্পানি থেকে বিদেশিরা তাদের বিনিয়োগ পুরোপুরি তুলে নিচ্ছেন। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, স্বচ্ছতার অভাব, আর্থিক দুর্বলতা এবং গ্রাহকদের বিমা দাবির টাকা পরিশোধে ব্যর্থতাই এই খাতের চরম ভাবমূর্তি সংকটের মূল কারণ।
বিনিয়োগের নাজুক চিত্র পুঁজিবাজারের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সিটি জেনারেল, ক্রিস্টাল, ঢাকা ইন্স্যুরেন্সসহ হাতেগোনা কয়েকটি কোম্পানিতে বিদেশিদের অতি সামান্য বিনিয়োগ রয়েছে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো:
- বিনিয়োগ প্রত্যাহার: ন্যাশনাল লাইফ এবং ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স থেকে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা তাদের সব শেয়ার বিক্রি করে বিনিয়োগ পুরোপুরি তুলে নিয়েছেন।
- বিনিয়োগ হ্রাস: ঢাকা ইন্স্যুরেন্সের প্রায় অর্ধেক শেয়ার বিদেশিরা বিক্রি করে দিয়েছেন।
- সামান্য বৃদ্ধি: একমাত্র প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সে বিদেশি বিনিয়োগ দশমিক ১৫ শতাংশ থেকে বেড়ে দশমিক ১৮ শতাংশ হয়েছে।
- শীর্ষ বিনিয়োগ: বর্তমানে গ্রীনডেল্টা ইন্স্যুরেন্সে বিদেশিদের সবচেয়ে বেশি (৪.৬০%) বিনিয়োগ রয়েছে।
কেন এই অনাগ্রহ? বিশ্লেষকদের ব্যবচ্ছেদ বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মূলত কোনো খাতে বিনিয়োগের আগে ঝুঁকি ও রিটার্নের ভারসাম্য বিশ্লেষণ করেন। বিমা খাতের প্রতি তাদের অনীহার পেছনে বেশ কিছু কারণ উঠে এসেছে:
- আস্থা ও ইমেজ সংকট: অনেক কোম্পানি গ্রাহকের দাবির টাকা সময়মতো পরিশোধ করতে পারছে না। আইডিআরএ-র তথ্যমতে, জীবন বিমা খাতে ৬৫ শতাংশ এবং সাধারণ বিমা খাতে ৯২ শতাংশ দাবি বকেয়া পড়ে আছে। এই ‘ক্লেইম’ পরিশোধে ব্যর্থতা বিমা খাতের প্রতি চরম নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে।
- স্বচ্ছতার অভাব ও অনিয়ম: আর্থিক প্রতিবেদনে অসঙ্গতি এবং প্রকৃত চিত্র গোপন করার প্রবণতা বিদেশিদের নিরুৎসাহিত করছে। এক সময়ের ভালো কোম্পানি ফারইস্ট ইসলামী লাইফ বা পদ্মা ইসলামী লাইফের বর্তমান করুণ দশা বিদেশিদের কাছে এই খাতকে অনিরাপদ করে তুলেছে।
- দুর্বল তদারকি: নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর নজরদারির অভাব এবং কর্পোরেট গভর্ন্যান্স বা সুশাসনের ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
- পলিসি কমে যাওয়া: আস্থার সংকটের কারণে গত আড়াই বছরে জীবন বিমায় সক্রিয় পলিসির সংখ্যা ১০ লাখের বেশি কমে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত প্রগতি লাইফের সিইও মো. জালালুল আজিম মনে করেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা হুজুগে বিনিয়োগ করেন না। তারা কোম্পানির লাইফ ফান্ড ও সম্পদ দেখে সিদ্ধান্ত নেন। বেশিরভাগ কোম্পানির অবস্থা খারাপ হওয়ায় তারা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। ব্রোকারেজ হাউজগুলোর মতে, তথ্যের অস্বচ্ছতা এবং শেয়ারের কম লিকুইডিটি (সহজে কেনাবেচা না হওয়া) বিদেশিদের দূরে সরিয়ে রাখছে।
পরিশেষে, একটি দেশের শক্তিশালী আর্থিক ব্যবস্থার জন্য বিমা খাত অপরিহার্য। কিন্তু বাংলাদেশে এই খাতের বর্তমান ‘আইন অমান্য’ করার সংস্কৃতি এবং আস্থার সংকট কাটাতে না পারলে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। বিমা কোম্পানিগুলোর আর্থিক কাঠামো শক্তিশালী করা এবং কঠোর প্রশাসনিক সংস্কারই এখন একমাত্র পথ।
রিপোর্টারের নাম 

























