ঢাকা ০৩:২৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬

ক্ষমতা বনাম জনগণ: ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ও গণভোটের প্রাসঙ্গিকতা

ইতিহাসের এক নির্মম সত্য হলো, শাসকরা প্রায়শই অতীত থেকে শিক্ষা নেন না। যখন তারা শিক্ষা গ্রহণে ব্যর্থ হন, তখন ইতিহাস নিজেই তাদের কঠোরভাবে অথবা রক্তের বিনিময়ে শিক্ষা দেয়। বাংলাদেশ বর্তমানে এমনই এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জুলাই বিপ্লব ও জুলাই সনদের পর গণভোটের মাধ্যমে ৭০ শতাংশ মানুষ জুলাই সনদের পক্ষে রায় দিলেও, এখন সেই গণভোটের ভিত্তি-অধ্যাদেশ বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এই পরিস্থিতি প্রশ্ন তুলেছে, তাহলে গণভোটের তাৎপর্য কী? জনগণের রায় কি কেবলই আনুষ্ঠানিকতা? জনগণের মতামতের কি কোনো মূল্য নেই? জনগণ কি কেবলই প্রজা?

গণতন্ত্রের মূল কথা হলো জনগণই শেষ কথা। কিন্তু যখন জনগণের রায়কে উপেক্ষা করা হয়, তখন গণতন্ত্রের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ক্ষমতা কখনোই চিরস্থায়ী নয়; স্থায়ী হলো জনগণের ইচ্ছা। যারা জনগণকে উপেক্ষা করে শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলেন, তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। জাঁ জ্যাক রুশো যেমন বলেছেন, ‘সার্বভৌমত্ব জনগণের, শাসক শুধু প্রতিনিধি।’ জনগণের দেওয়া রায়কে অগ্রাহ্য করার অর্থ হলো জনগণের সার্বভৌমত্বকে অস্বীকার করা, যা ভবিষ্যতের সংকটের বীজ বপন করে।

গণভোট কোনো সাধারণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি জনগণের সরাসরি মতামত প্রকাশের মাধ্যম। এখানে সংসদ, দল বা ব্যক্তি নয়, বরং জনগণ নিজেই কথা বলেন। সেই রায় বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া মানে রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া, যা গণতন্ত্রের পরিপন্থী। যদি গণভোটের রায় বাস্তবায়নের সদিচ্ছা না থাকে, তবে গণভোট আয়োজনের উদ্দেশ্য কী? জনগণকে বিভ্রান্ত করা কি রাজনৈতিক কৌশল? নাকি ক্ষমতার দ্বন্দ্ব? এটি একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত তৈরি করছে। আজ গণভোট বাতিলের উদ্যোগ, কাল হয়তো নির্বাচন, পরশু সংবিধান পর্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। একবার যদি জনগণের সরাসরি রায়কে অকার্যকর করার সংস্কৃতি তৈরি হয়, তবে তা থামানো কঠিন হয়ে পড়ে।

বিগত দেড় দশক ধরে গুম, খুন, নিখোঁজ—এই শব্দগুলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভিধানে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে। হাজার হাজার পরিবার প্রিয়জনের অপেক্ষায় দিন গুজরান করছে, কিন্তু অনেকেই আর ফিরে আসেননি। প্রায়শই অভিযোগ উঠেছে, রাষ্ট্রীয় শক্তি ব্যবহার করে এসব ঘটনা ঘটানো হয়েছে এবং বিরোধী দলগুলোর নেতাকর্মীরা ছিলেন এদের বড় অংশ। বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, সেই দলগুলোর একটি অংশ গুমবিষয়ক অধ্যাদেশ বাতিলের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে—রাজনীতি কি স্মৃতিভ্রংশে আক্রান্ত? যারা একসময় ভুক্তভোগী ছিলেন, তারা কেন বিচার প্রক্রিয়া দুর্বল করতে চাইবেন? এটি রাজনৈতিক বাস্তবতার জটিলতা হতে পারে, কিন্তু জনগণের চোখে এটি দ্বৈত মানদণ্ড। ক্ষমতায় গেলে এক নীতি, বিরোধিতায় আরেক নীতি—এই পার্থক্য জনগণের মধ্যে বিভেদ তৈরি করে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনায় মধ্যস্থতায় পাকিস্তান, বৈঠক নিয়ে কাটছে না ধোঁয়াশা

ক্ষমতা বনাম জনগণ: ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ও গণভোটের প্রাসঙ্গিকতা

আপডেট সময় : ১০:০৭:৩৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৮ এপ্রিল ২০২৬

ইতিহাসের এক নির্মম সত্য হলো, শাসকরা প্রায়শই অতীত থেকে শিক্ষা নেন না। যখন তারা শিক্ষা গ্রহণে ব্যর্থ হন, তখন ইতিহাস নিজেই তাদের কঠোরভাবে অথবা রক্তের বিনিময়ে শিক্ষা দেয়। বাংলাদেশ বর্তমানে এমনই এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জুলাই বিপ্লব ও জুলাই সনদের পর গণভোটের মাধ্যমে ৭০ শতাংশ মানুষ জুলাই সনদের পক্ষে রায় দিলেও, এখন সেই গণভোটের ভিত্তি-অধ্যাদেশ বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এই পরিস্থিতি প্রশ্ন তুলেছে, তাহলে গণভোটের তাৎপর্য কী? জনগণের রায় কি কেবলই আনুষ্ঠানিকতা? জনগণের মতামতের কি কোনো মূল্য নেই? জনগণ কি কেবলই প্রজা?

গণতন্ত্রের মূল কথা হলো জনগণই শেষ কথা। কিন্তু যখন জনগণের রায়কে উপেক্ষা করা হয়, তখন গণতন্ত্রের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ক্ষমতা কখনোই চিরস্থায়ী নয়; স্থায়ী হলো জনগণের ইচ্ছা। যারা জনগণকে উপেক্ষা করে শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলেন, তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। জাঁ জ্যাক রুশো যেমন বলেছেন, ‘সার্বভৌমত্ব জনগণের, শাসক শুধু প্রতিনিধি।’ জনগণের দেওয়া রায়কে অগ্রাহ্য করার অর্থ হলো জনগণের সার্বভৌমত্বকে অস্বীকার করা, যা ভবিষ্যতের সংকটের বীজ বপন করে।

গণভোট কোনো সাধারণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি জনগণের সরাসরি মতামত প্রকাশের মাধ্যম। এখানে সংসদ, দল বা ব্যক্তি নয়, বরং জনগণ নিজেই কথা বলেন। সেই রায় বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া মানে রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া, যা গণতন্ত্রের পরিপন্থী। যদি গণভোটের রায় বাস্তবায়নের সদিচ্ছা না থাকে, তবে গণভোট আয়োজনের উদ্দেশ্য কী? জনগণকে বিভ্রান্ত করা কি রাজনৈতিক কৌশল? নাকি ক্ষমতার দ্বন্দ্ব? এটি একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত তৈরি করছে। আজ গণভোট বাতিলের উদ্যোগ, কাল হয়তো নির্বাচন, পরশু সংবিধান পর্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। একবার যদি জনগণের সরাসরি রায়কে অকার্যকর করার সংস্কৃতি তৈরি হয়, তবে তা থামানো কঠিন হয়ে পড়ে।

বিগত দেড় দশক ধরে গুম, খুন, নিখোঁজ—এই শব্দগুলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভিধানে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে। হাজার হাজার পরিবার প্রিয়জনের অপেক্ষায় দিন গুজরান করছে, কিন্তু অনেকেই আর ফিরে আসেননি। প্রায়শই অভিযোগ উঠেছে, রাষ্ট্রীয় শক্তি ব্যবহার করে এসব ঘটনা ঘটানো হয়েছে এবং বিরোধী দলগুলোর নেতাকর্মীরা ছিলেন এদের বড় অংশ। বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, সেই দলগুলোর একটি অংশ গুমবিষয়ক অধ্যাদেশ বাতিলের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে—রাজনীতি কি স্মৃতিভ্রংশে আক্রান্ত? যারা একসময় ভুক্তভোগী ছিলেন, তারা কেন বিচার প্রক্রিয়া দুর্বল করতে চাইবেন? এটি রাজনৈতিক বাস্তবতার জটিলতা হতে পারে, কিন্তু জনগণের চোখে এটি দ্বৈত মানদণ্ড। ক্ষমতায় গেলে এক নীতি, বিরোধিতায় আরেক নীতি—এই পার্থক্য জনগণের মধ্যে বিভেদ তৈরি করে।