ঢাকা ১০:৫৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬

শিক্ষিত ও উচ্চবিত্ত পরিবারেও কেন ‘বাল্যবিবাহ’: গবেষণায় উঠে এল নেপথ্য কারণ

বাল্যবিবাহ দীর্ঘকাল ধরে কেবল দরিদ্র বা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হলেও সাম্প্রতিক চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। এমনকি উচ্চবিত্ত ও শিক্ষিত পরিবারেও এই প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি ১৬ বছর বয়সী আলোচিত শিশুশিল্পী সিমরিন লুবাবার বিয়ের ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাল্যবিবাহ কেবল পারিবারিক সমস্যা নয়, এটি একটি গভীর সামাজিক সংকটের চিহ্ন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের তথ্যমতে, প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ মেয়ের ১৮ বছর হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে যায়, যার মধ্যে বাংলাদেশে এই হার অর্ধেকেরও বেশি। ইউনিসেফের ‘ফিয়ার ফর গার্লস সেফটি’ শীর্ষক গবেষণায় দরিদ্র পরিবারে অর্থনৈতিক চাপের কথা বলা হলেও, শিক্ষিত পরিবারে এর কারণ মূলত সামাজিক মর্যাদা রক্ষা ও নিরাপত্তার ভ্রান্ত ধারণা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক জাহিদুল ইসলাম এবং বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিশাত তাসনিম ও সবুর হোসেনের যৌথ গবেষণা থেকে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারে বাল্যবিবাহের তিনটি প্রধান কারণ উঠে এসেছে: প্রেম বা সম্পর্কের কারণে ‘বদনাম’ এড়ানোর চেষ্টা, ‘মেয়ের বয়স হয়ে গেছে’—এমন সামাজিক চাপ এবং সমাজ কী বলবে সেই ভয়। ফিলিপাইন সোশ্যাল সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণায় বলা হয়েছে, অনেক শিক্ষিত পরিবার মনে করে মেয়েদের অতিরিক্ত স্বাধীনতা বিপজ্জনক; তাই কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার আগেই তাদের বিয়ে দিয়ে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়। এছাড়া ২০২৪ সালে স্প্রিংগার জার্নালে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে গবেষক শান্তা আক্তার মিম ও তাঁর দল দেখিয়েছেন যে, ‘ভালো পাত্র’ হাতছাড়া হওয়ার ভয় শিক্ষিত সমাজেও বাল্যবিবাহকে উসকে দিচ্ছে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, কর্নেল ল স্কুলের লিগ্যাল ইনফরমেশন ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, যৌন হয়রানি থেকে মেয়েদের নিরাপদ রাখার ভুল কৌশল হিসেবে অনেক শিক্ষিত পরিবার দ্রুত বিয়েকে সমাধান মনে করে। এমনকি বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আরিফুল ইসলামের মতে, কিছু ধর্মগুরুর বক্তব্যও শিক্ষিত শ্রেণিকে প্রভাবিত করছে। ব্র্যাকের গবেষণায় দেখা গেছে, খুলনা, রাজশাহী ও রংপুর অঞ্চলে এই হার চট্টগ্রাম বা সিলেটের তুলনায় বেশি। এসডিজি অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে বাল্যবিবাহ বন্ধের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কেবল আইন কঠোর করাই যথেষ্ট নয়; বরং প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা ও পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন জরুরি। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, তথাকথিত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা মানুষের দীর্ঘদিনের বদ্ধমূল ধারণা ভাঙতে পারছে না বলেই শিক্ষিত সমাজেও এই ব্যাধি টিকে আছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

পাম্পে তেল নেই, জমিতে পানি নেই: রংপুরের বোরো ক্ষেত ফেটে চৌচির, দিশেহারা কৃষক

শিক্ষিত ও উচ্চবিত্ত পরিবারেও কেন ‘বাল্যবিবাহ’: গবেষণায় উঠে এল নেপথ্য কারণ

আপডেট সময় : ১২:০৩:৪৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল ২০২৬

বাল্যবিবাহ দীর্ঘকাল ধরে কেবল দরিদ্র বা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হলেও সাম্প্রতিক চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। এমনকি উচ্চবিত্ত ও শিক্ষিত পরিবারেও এই প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি ১৬ বছর বয়সী আলোচিত শিশুশিল্পী সিমরিন লুবাবার বিয়ের ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাল্যবিবাহ কেবল পারিবারিক সমস্যা নয়, এটি একটি গভীর সামাজিক সংকটের চিহ্ন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের তথ্যমতে, প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ মেয়ের ১৮ বছর হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে যায়, যার মধ্যে বাংলাদেশে এই হার অর্ধেকেরও বেশি। ইউনিসেফের ‘ফিয়ার ফর গার্লস সেফটি’ শীর্ষক গবেষণায় দরিদ্র পরিবারে অর্থনৈতিক চাপের কথা বলা হলেও, শিক্ষিত পরিবারে এর কারণ মূলত সামাজিক মর্যাদা রক্ষা ও নিরাপত্তার ভ্রান্ত ধারণা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক জাহিদুল ইসলাম এবং বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিশাত তাসনিম ও সবুর হোসেনের যৌথ গবেষণা থেকে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারে বাল্যবিবাহের তিনটি প্রধান কারণ উঠে এসেছে: প্রেম বা সম্পর্কের কারণে ‘বদনাম’ এড়ানোর চেষ্টা, ‘মেয়ের বয়স হয়ে গেছে’—এমন সামাজিক চাপ এবং সমাজ কী বলবে সেই ভয়। ফিলিপাইন সোশ্যাল সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণায় বলা হয়েছে, অনেক শিক্ষিত পরিবার মনে করে মেয়েদের অতিরিক্ত স্বাধীনতা বিপজ্জনক; তাই কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার আগেই তাদের বিয়ে দিয়ে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়। এছাড়া ২০২৪ সালে স্প্রিংগার জার্নালে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে গবেষক শান্তা আক্তার মিম ও তাঁর দল দেখিয়েছেন যে, ‘ভালো পাত্র’ হাতছাড়া হওয়ার ভয় শিক্ষিত সমাজেও বাল্যবিবাহকে উসকে দিচ্ছে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, কর্নেল ল স্কুলের লিগ্যাল ইনফরমেশন ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, যৌন হয়রানি থেকে মেয়েদের নিরাপদ রাখার ভুল কৌশল হিসেবে অনেক শিক্ষিত পরিবার দ্রুত বিয়েকে সমাধান মনে করে। এমনকি বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আরিফুল ইসলামের মতে, কিছু ধর্মগুরুর বক্তব্যও শিক্ষিত শ্রেণিকে প্রভাবিত করছে। ব্র্যাকের গবেষণায় দেখা গেছে, খুলনা, রাজশাহী ও রংপুর অঞ্চলে এই হার চট্টগ্রাম বা সিলেটের তুলনায় বেশি। এসডিজি অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে বাল্যবিবাহ বন্ধের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কেবল আইন কঠোর করাই যথেষ্ট নয়; বরং প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা ও পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন জরুরি। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, তথাকথিত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা মানুষের দীর্ঘদিনের বদ্ধমূল ধারণা ভাঙতে পারছে না বলেই শিক্ষিত সমাজেও এই ব্যাধি টিকে আছে।