ঢাকা ০৬:৪২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬

জ্বালানি সংকট ও ক্রোনি ক্যাপিটালিজম: অর্থনীতির কাঠামোগত সংস্কারে নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনীতি এক গভীর অনিশ্চয়তা ও কাঠামোগত সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. এম এম আকাশ এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, নতুন তারেক রহমান সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে একদিকে ৩২ বিলিয়ন ডলারের স্বস্তিদায়ক রিজার্ভ পেলেও, অন্যদিকে বৈদেশিক ঋণের বিশাল বোঝা ও বিনিয়োগ স্থবিরতার সম্মুখীন হয়েছে। তাঁর মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে তেলের উচ্চমূল্যের চেয়েও বড় ভীতি হলো ‘দুষ্প্রাপ্যতা’। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হলে সরকারকে কঠোর রেশনিং পদ্ধতির দিকে যেতে হতে পারে, যা মজুতদারদের অনৈতিক সুযোগ করে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে। ‘কস্ট-পুশ’ ইনফ্লেশন বা উৎপাদন ব্যয়জনিত মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

ড. আকাশের বিশ্লেষণে অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতের মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’ বা গোষ্ঠীস্বার্থের পুঁজিবাদ। ব্যবসায়ী, আমলা ও রাজনীতিকদের এক অশুভ ত্রিভুজ ক্ষমতার বলয় রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাট ও পুঁজি পাচারের পথ সুগম করেছে। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাত এই অপশক্তির প্রধান শিকারে পরিণত হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় খেলাপি ঋণের হার ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত উঠলেও বর্তমানে পুনঃতফসিলীকরণের মাধ্যমে কাগজে-কলমে সেই পরিমাণ কমিয়ে দেখানো হচ্ছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট বা গ্রেস পিরিয়ড দিয়ে ঋণ পুনঃতফসিল করা আসলে পুরোনো সমস্যাকেই জিইয়ে রাখা, যা ব্যাংকিং খাতের সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। ড. আকাশ মনে করেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংককে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে না পারলে খেলাপি ঋণ আদায় সম্ভব নয়। সম্প্রতি গভর্নর অপসারণের ক্ষেত্রে যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে, তাকে তিনি ‘প্রাতিষ্ঠানিক অমর্যাদা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, যেকোনো পরিবর্তন হওয়া উচিত ছিল সংসদের আইনি প্রক্রিয়ায়। নতুন সরকারের জন্য এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো—তাৎক্ষণিক জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করার পাশাপাশি দীর্ঘদিনের দুর্নীতিগ্রস্ত অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। অন্যথায় সাময়িক রিজার্ভের স্বস্তি ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপে দ্রুতই বিলীন হয়ে যেতে পারে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

ভূমধ্যসাগরে মৃত্যুঝুঁকি ও লিবিয়ার ‘গেম ঘরে’ বন্দি বাংলাদেশিরা

জ্বালানি সংকট ও ক্রোনি ক্যাপিটালিজম: অর্থনীতির কাঠামোগত সংস্কারে নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ

আপডেট সময় : ০১:৩৮:৪৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ৬ এপ্রিল ২০২৬

বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনীতি এক গভীর অনিশ্চয়তা ও কাঠামোগত সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. এম এম আকাশ এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, নতুন তারেক রহমান সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে একদিকে ৩২ বিলিয়ন ডলারের স্বস্তিদায়ক রিজার্ভ পেলেও, অন্যদিকে বৈদেশিক ঋণের বিশাল বোঝা ও বিনিয়োগ স্থবিরতার সম্মুখীন হয়েছে। তাঁর মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে তেলের উচ্চমূল্যের চেয়েও বড় ভীতি হলো ‘দুষ্প্রাপ্যতা’। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হলে সরকারকে কঠোর রেশনিং পদ্ধতির দিকে যেতে হতে পারে, যা মজুতদারদের অনৈতিক সুযোগ করে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে। ‘কস্ট-পুশ’ ইনফ্লেশন বা উৎপাদন ব্যয়জনিত মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

ড. আকাশের বিশ্লেষণে অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতের মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’ বা গোষ্ঠীস্বার্থের পুঁজিবাদ। ব্যবসায়ী, আমলা ও রাজনীতিকদের এক অশুভ ত্রিভুজ ক্ষমতার বলয় রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাট ও পুঁজি পাচারের পথ সুগম করেছে। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাত এই অপশক্তির প্রধান শিকারে পরিণত হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় খেলাপি ঋণের হার ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত উঠলেও বর্তমানে পুনঃতফসিলীকরণের মাধ্যমে কাগজে-কলমে সেই পরিমাণ কমিয়ে দেখানো হচ্ছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট বা গ্রেস পিরিয়ড দিয়ে ঋণ পুনঃতফসিল করা আসলে পুরোনো সমস্যাকেই জিইয়ে রাখা, যা ব্যাংকিং খাতের সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। ড. আকাশ মনে করেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংককে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে না পারলে খেলাপি ঋণ আদায় সম্ভব নয়। সম্প্রতি গভর্নর অপসারণের ক্ষেত্রে যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে, তাকে তিনি ‘প্রাতিষ্ঠানিক অমর্যাদা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, যেকোনো পরিবর্তন হওয়া উচিত ছিল সংসদের আইনি প্রক্রিয়ায়। নতুন সরকারের জন্য এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো—তাৎক্ষণিক জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করার পাশাপাশি দীর্ঘদিনের দুর্নীতিগ্রস্ত অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। অন্যথায় সাময়িক রিজার্ভের স্বস্তি ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপে দ্রুতই বিলীন হয়ে যেতে পারে।