ঢাকা ০২:১৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬

বহুমুখী সংকটে তারেক রহমানের সরকার: জ্বালানি ও হামের প্রাদুর্ভাব সামলাতে হিমশিম

২০২৬ সালের ৪ এপ্রিল, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের শপথ গ্রহণের পর আজ সরকারের কার্যকর ৪৫তম দিন পূর্ণ হয়েছে। তবে এই অল্প সময়ের মধ্যেই নতুন সরকার এক নজিরবিহীন বহুমুখী সংকটের মুখে পড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ ডলার সংকটের কারণে এলসি (LC) খুলতে না পারায় দেশের জ্বালানি মজুত প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। রাজধানীর তেজগাঁও, কল্যাণপুরসহ সারাদেশের ফিলিং স্টেশনগুলোতে এখন মাইলের পর মাইল যানবাহনের দীর্ঘ সারি।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার ‘ডিজিটাল ফুয়েল পাস’ বা কিউআর কোড সিস্টেম চালু করেছে, যেখানে মোটরসাইকেলের জন্য সপ্তাহে মাত্র ৫ লিটার এবং ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য ২০ লিটার তেল বরাদ্দ করা হয়েছে। জ্বালানি সাশ্রয়ে রাত ৮টার পর দোকানপাট বন্ধ এবং এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সংসদে দাবি করেছেন, প্রকৃত সংকটের চেয়ে ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত তেল সংগ্রহের প্রবণতাই এই দীর্ঘ সারির প্রধান কারণ।

জ্বালানি সংকটের সমান্তরালে দেশজুড়ে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া হামের প্রাদুর্ভাব সরকারকে চরম নৈতিক ও প্রশাসনিক চাপের মুখে ফেলেছে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই হাম ও এর পরবর্তী জটিলতায় (নিউমোনিয়া ও এনসেফালাইটিস) অন্তত ৩৮ থেকে ৫২ জন শিশুর মৃত্যু নিশ্চিত হওয়া গেছে, যার মধ্যে শুধু মার্চ মাসেই মারা গেছে ৩২ জন। ঢাকা ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ দেশের ৫৬টি জেলায় এই সংক্রমণ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।

বিশেষ করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (রামেক) গত কয়েক দিনে ৬ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং বর্তমানে সেখানে ১৩০ জন শিশু চিকিৎসাধীন। আইসিইউ ও ভেন্টিলেটরের তীব্র সংকটে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন অভিভাবকরা। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনায় আজ ৪ এপ্রিল থেকে ৬ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের জন্য বিশেষ ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’ বা জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ইতিমধ্যে সকল চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর ছুটি পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বাতিল ঘোষণা করেছে।

এই দ্বিমুখী সংকট সামাল দিতে সরকার বর্তমানে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিকভাবে ব্যাপক চাপের মুখে রয়েছে। তেলের পাম্পগুলোতে বিশৃঙ্খলা ও কালোবাজারি রুখতে ইতিমধ্যে বিজিবি (BGB) মোতায়েন করা হয়েছে। অন্যদিকে, জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট আজ বিকেলে বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে সংবিধান সংস্কার ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দিয়েছে, যা সরকারের জন্য নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

বিএনপির স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক ডা. রফিকুল ইসলাম রাজশাহী সফর শেষে জানিয়েছেন, টিকার ঘাটতি ও পুষ্টিহীনতাই এই মৃত্যুর অন্যতম কারণ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জরুরি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন এবং আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বিকল্প রুটে (সৌদি আরব বা রাশিয়া) তেল আমদানির চেষ্টা চালাচ্ছেন। সরকারের জন্য এই মুহূর্তটি একটি বড় অগ্নিপরীক্ষা, যেখানে একদিকে অর্থনৈতিক মন্দা ও জ্বালানি হাহাকার এবং অন্যদিকে শিশু মৃত্যুর মিছিল জনমনে তীব্র অসন্তোষ ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

হরমুজ প্রণালী থেকে মাইন সরাতে ন্যাটোর সহায়তা পাবে যুক্তরাষ্ট্র: ট্রাম্প

বহুমুখী সংকটে তারেক রহমানের সরকার: জ্বালানি ও হামের প্রাদুর্ভাব সামলাতে হিমশিম

আপডেট সময় : ১০:৩৯:৫৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৪ এপ্রিল ২০২৬

২০২৬ সালের ৪ এপ্রিল, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের শপথ গ্রহণের পর আজ সরকারের কার্যকর ৪৫তম দিন পূর্ণ হয়েছে। তবে এই অল্প সময়ের মধ্যেই নতুন সরকার এক নজিরবিহীন বহুমুখী সংকটের মুখে পড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ ডলার সংকটের কারণে এলসি (LC) খুলতে না পারায় দেশের জ্বালানি মজুত প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। রাজধানীর তেজগাঁও, কল্যাণপুরসহ সারাদেশের ফিলিং স্টেশনগুলোতে এখন মাইলের পর মাইল যানবাহনের দীর্ঘ সারি।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার ‘ডিজিটাল ফুয়েল পাস’ বা কিউআর কোড সিস্টেম চালু করেছে, যেখানে মোটরসাইকেলের জন্য সপ্তাহে মাত্র ৫ লিটার এবং ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য ২০ লিটার তেল বরাদ্দ করা হয়েছে। জ্বালানি সাশ্রয়ে রাত ৮টার পর দোকানপাট বন্ধ এবং এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সংসদে দাবি করেছেন, প্রকৃত সংকটের চেয়ে ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত তেল সংগ্রহের প্রবণতাই এই দীর্ঘ সারির প্রধান কারণ।

জ্বালানি সংকটের সমান্তরালে দেশজুড়ে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া হামের প্রাদুর্ভাব সরকারকে চরম নৈতিক ও প্রশাসনিক চাপের মুখে ফেলেছে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই হাম ও এর পরবর্তী জটিলতায় (নিউমোনিয়া ও এনসেফালাইটিস) অন্তত ৩৮ থেকে ৫২ জন শিশুর মৃত্যু নিশ্চিত হওয়া গেছে, যার মধ্যে শুধু মার্চ মাসেই মারা গেছে ৩২ জন। ঢাকা ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ দেশের ৫৬টি জেলায় এই সংক্রমণ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।

বিশেষ করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (রামেক) গত কয়েক দিনে ৬ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং বর্তমানে সেখানে ১৩০ জন শিশু চিকিৎসাধীন। আইসিইউ ও ভেন্টিলেটরের তীব্র সংকটে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন অভিভাবকরা। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনায় আজ ৪ এপ্রিল থেকে ৬ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের জন্য বিশেষ ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’ বা জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ইতিমধ্যে সকল চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর ছুটি পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বাতিল ঘোষণা করেছে।

এই দ্বিমুখী সংকট সামাল দিতে সরকার বর্তমানে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিকভাবে ব্যাপক চাপের মুখে রয়েছে। তেলের পাম্পগুলোতে বিশৃঙ্খলা ও কালোবাজারি রুখতে ইতিমধ্যে বিজিবি (BGB) মোতায়েন করা হয়েছে। অন্যদিকে, জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট আজ বিকেলে বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে সংবিধান সংস্কার ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দিয়েছে, যা সরকারের জন্য নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

বিএনপির স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক ডা. রফিকুল ইসলাম রাজশাহী সফর শেষে জানিয়েছেন, টিকার ঘাটতি ও পুষ্টিহীনতাই এই মৃত্যুর অন্যতম কারণ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জরুরি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন এবং আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বিকল্প রুটে (সৌদি আরব বা রাশিয়া) তেল আমদানির চেষ্টা চালাচ্ছেন। সরকারের জন্য এই মুহূর্তটি একটি বড় অগ্নিপরীক্ষা, যেখানে একদিকে অর্থনৈতিক মন্দা ও জ্বালানি হাহাকার এবং অন্যদিকে শিশু মৃত্যুর মিছিল জনমনে তীব্র অসন্তোষ ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।