ঢাকা ০৮:৩৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬

ডিজেল সংকটে লাইটার জাহাজও বিপাকে: পণ্য খালাস স্থবির, বিদ্যুৎ উৎপাদনে শঙ্কার মেঘ

চট্টগ্রাম বন্দরে নদীপথে আমদানি-রপ্তানি পণ্য পরিবহণের মূল হাতিয়ার লাইটার জাহাজে ডিজেল সংকট এখন চরমে। চাহিদার মাত্র ৫ ভাগের এক ভাগ (২০ শতাংশ) জ্বালানি পাওয়ায় অধিকাংশ জাহাজ এখন অচল। ফলে মাদার ভেসেল (বড় জাহাজ) থেকে পণ্য খালাস করা যাচ্ছে না, যার বহুমুখী খেসারত দিতে হচ্ছে আমদানিকারক ও শিল্প-কারখানার মালিকদের। সবচেয়ে বড় আশঙ্কার বিষয় হলো, কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে কয়লা পৌঁছাতে না পারায় দেশজুড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

চাহিদা বনাম সরবরাহ: লাইটার জাহাজ নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেল (ডব্লিউটিসি) জানিয়েছে, প্রতিদিন অন্তত ৭০-৮০টি লাইটার জাহাজ বরাদ্দের জন্য প্রায় আড়াই লাখ লিটার ডিজেলের প্রয়োজন হয়। কিন্তু বর্তমানে মিলছে মাত্র ৪০ থেকে ৫০ হাজার লিটার। গত ১৫ দিন ধরে চলা এই সংকটের কারণে জাহাজ বরাদ্দ দেওয়া প্রায় বন্ধ রয়েছে। ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে বর্তমানে ৫০ থেকে ৬০টি মাদার ভেসেল পণ্য খালাসের অপেক্ষায় অলস বসে আছে। একটি বড় জাহাজ একদিন অতিরিক্ত বসে থাকলে আমদানিকারককে দৈনিক ২০ হাজার ডলার পর্যন্ত জরিমানা গুণতে হচ্ছে।

বিদ্যুৎ খাতে অশনিসংকেত: বর্তমানে বহির্নোঙরে ৪টি বিশাল কয়লাবাহী জাহাজ অবস্থান করছে। পায়রা, রামপাল ও বাঁশখালীর মতো বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে মাসে প্রায় ৮ লাখ টন কয়লা লাগে। কিন্তু লাইটার জাহাজ সংকটে গত এক সপ্তাহ ধরে কয়লা পরিবহণ প্রায় থমকে গেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, আগামী এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে কয়লা পৌঁছানো না গেলে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যা দেশকে অন্ধকারে নিমজ্জিত করার ঝুঁকি তৈরি করছে।

প্রশাসনিক তৎপরতা ও বিপিসির অবস্থান: সংকট উত্তরণে ডব্লিউটিসি-র নেতারা গত ২২ মার্চ অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর বাসভবনে সাক্ষাৎ করেন। মন্ত্রী বিষয়টি নিয়ে জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর সঙ্গে কথা বললেও মাঠপর্যায়ে কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়নি। এদিকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) দাবি করছে, ডিজেলের কোনো সংকট নেই। তাদের গুদামে বর্তমানে ২ লাখ টন ডিজেল মজুত রয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা—পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা তেল কোম্পানিগুলো তাদের সরবরাহ ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে।

শিল্প ও বাণিজ্যে প্রভাব: জ্বালানি সংকটের থাবা কেবল জাহাজেই নয়, পণ্য খালাসে নিয়োজিত ক্রেন, ট্রাক্টর ও ডিপোগুলোতেও পড়েছে। বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোট অ্যাসোসিয়েশন (বিকডা) জানিয়েছে, সরবরাহ কমে যাওয়ায় হ্যান্ডলিং কাজ ব্যাহত হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইন বিঘ্নিত হওয়ার অজুহাতে তেল বিপণন কোম্পানিগুলো রেশনিং পদ্ধতি চালু করায় এই কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

পারমাণবিক ইস্যু অজুহাত, যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ইরান

ডিজেল সংকটে লাইটার জাহাজও বিপাকে: পণ্য খালাস স্থবির, বিদ্যুৎ উৎপাদনে শঙ্কার মেঘ

আপডেট সময় : ০১:০০:৩০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬

চট্টগ্রাম বন্দরে নদীপথে আমদানি-রপ্তানি পণ্য পরিবহণের মূল হাতিয়ার লাইটার জাহাজে ডিজেল সংকট এখন চরমে। চাহিদার মাত্র ৫ ভাগের এক ভাগ (২০ শতাংশ) জ্বালানি পাওয়ায় অধিকাংশ জাহাজ এখন অচল। ফলে মাদার ভেসেল (বড় জাহাজ) থেকে পণ্য খালাস করা যাচ্ছে না, যার বহুমুখী খেসারত দিতে হচ্ছে আমদানিকারক ও শিল্প-কারখানার মালিকদের। সবচেয়ে বড় আশঙ্কার বিষয় হলো, কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে কয়লা পৌঁছাতে না পারায় দেশজুড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

চাহিদা বনাম সরবরাহ: লাইটার জাহাজ নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেল (ডব্লিউটিসি) জানিয়েছে, প্রতিদিন অন্তত ৭০-৮০টি লাইটার জাহাজ বরাদ্দের জন্য প্রায় আড়াই লাখ লিটার ডিজেলের প্রয়োজন হয়। কিন্তু বর্তমানে মিলছে মাত্র ৪০ থেকে ৫০ হাজার লিটার। গত ১৫ দিন ধরে চলা এই সংকটের কারণে জাহাজ বরাদ্দ দেওয়া প্রায় বন্ধ রয়েছে। ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে বর্তমানে ৫০ থেকে ৬০টি মাদার ভেসেল পণ্য খালাসের অপেক্ষায় অলস বসে আছে। একটি বড় জাহাজ একদিন অতিরিক্ত বসে থাকলে আমদানিকারককে দৈনিক ২০ হাজার ডলার পর্যন্ত জরিমানা গুণতে হচ্ছে।

বিদ্যুৎ খাতে অশনিসংকেত: বর্তমানে বহির্নোঙরে ৪টি বিশাল কয়লাবাহী জাহাজ অবস্থান করছে। পায়রা, রামপাল ও বাঁশখালীর মতো বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে মাসে প্রায় ৮ লাখ টন কয়লা লাগে। কিন্তু লাইটার জাহাজ সংকটে গত এক সপ্তাহ ধরে কয়লা পরিবহণ প্রায় থমকে গেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, আগামী এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে কয়লা পৌঁছানো না গেলে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যা দেশকে অন্ধকারে নিমজ্জিত করার ঝুঁকি তৈরি করছে।

প্রশাসনিক তৎপরতা ও বিপিসির অবস্থান: সংকট উত্তরণে ডব্লিউটিসি-র নেতারা গত ২২ মার্চ অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর বাসভবনে সাক্ষাৎ করেন। মন্ত্রী বিষয়টি নিয়ে জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর সঙ্গে কথা বললেও মাঠপর্যায়ে কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়নি। এদিকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) দাবি করছে, ডিজেলের কোনো সংকট নেই। তাদের গুদামে বর্তমানে ২ লাখ টন ডিজেল মজুত রয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা—পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা তেল কোম্পানিগুলো তাদের সরবরাহ ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে।

শিল্প ও বাণিজ্যে প্রভাব: জ্বালানি সংকটের থাবা কেবল জাহাজেই নয়, পণ্য খালাসে নিয়োজিত ক্রেন, ট্রাক্টর ও ডিপোগুলোতেও পড়েছে। বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোট অ্যাসোসিয়েশন (বিকডা) জানিয়েছে, সরবরাহ কমে যাওয়ায় হ্যান্ডলিং কাজ ব্যাহত হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইন বিঘ্নিত হওয়ার অজুহাতে তেল বিপণন কোম্পানিগুলো রেশনিং পদ্ধতি চালু করায় এই কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।