নানা নাটকীয়তা, রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং সবশেষে প্রকৃতির রুদ্ররোষে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মধ্য দিয়ে আজ রবিবার (১৫ মার্চ) পর্দা নামছে বাঙালির প্রাণের মেলা অমর একুশে বইমেলার। দেরিতে শুরু হওয়া এবং পবিত্র রমজান মাসের প্রভাবে এবারের মেলা প্রকাশকদের জন্য নিয়ে এসেছে চরম আর্থিক বিপর্যয়। প্রকাশকদের দাবি অনুযায়ী, এবারের ব্যবসায়িক পরিস্থিতি ২০২১ সালের করোনাকালীন সময়ের চেয়েও ভয়াবহ।
জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের কারণে নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে, গত ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে এবারের মেলা শুরু হয়। প্রকাশকদের একটি বড় অংশ ঈদের পর মেলা আয়োজনের দাবি জানালেও বাংলা একাডেমি তাতে সায় দেয়নি। স্টল ভাড়া মওকুফ এবং প্যাভিলিয়ন সরিয়ে নেওয়ার মতো নজিরবিহীন সব সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে মেলা শুরু হলেও শুরু থেকেই পাঠক উপস্থিতিতে ভাটা লক্ষ্য করা গেছে। বাংলা একাডেমির তথ্যমতে, গত বছর নতুন বই প্রকাশিত হয়েছিল ৩,২৯৯টি, যা এবার কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১,৩৩৭টিতে। প্রকাশক ঐক্যের দেওয়া তথ্যমতে, ২০২৪ সালের তুলনায় গত বছর বিক্রি ৬০ শতাংশ কমেছিল আর এ বছর ২০২৫ সালের তুলনায় বিক্রি কমেছে প্রায় ৮০ শতাংশ। প্রায় ৯০ শতাংশ প্রকাশকের স্টল নির্মাণের প্রাথমিক খরচও ওঠেনি এবং ৩০ শতাংশ প্রকাশকের ৫ হাজার টাকার বইও বিক্রি হয়নি। পুথিনিলয় পাবলিকেশনের স্বত্বাধিকারী শ্যামল পাল জানান, গতবারের বিক্রির ১০ ভাগের এক ভাগও হয়নি, এমনকি স্টল কর্মীর বেতন ওঠানোই এখন দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মেলার শেষ লগ্নে যখন কিছুটা বিক্রির আশা ছিল, ঠিক তখনই গত শুক্রবার সন্ধ্যার আকস্মিক বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়া মেলার চিত্র বদলে দেয়। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের নিচু এলাকা এবং লেকপাড়ের স্টলগুলোতে পানি জমে শত শত বই ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে। ‘চমনপ্রকাশ’ ও ‘প্রিয় বাংলা’র মতো প্রকাশনীগুলোর শতাধিক বই পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। শনিবার সকালে মেলা প্রাঙ্গণে স্টলের সামনে পলিথিনে বই শুকানোর দৃশ্য ছিল অত্যন্ত করুণ। কর্দমাক্ত মাঠ এবং স্টলের সামনে জমে থাকা পানির কারণে শেষ সময়েও পাঠক মেলাবিমুখ ছিলেন।
বৃষ্টির পর পানি নিষ্কাশনে গাফিলতির অভিযোগ উঠলেও বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ড. মোহাম্মদ আজম জানিয়েছেন, যান্ত্রিকভাবে মাঠের পানি সরিয়ে যাতায়াত নির্বিঘ্ন করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়েছে। তবে প্রকাশকদের অভিযোগ, মাঠের নাব্য সংকটের কারণে লেকপাড়ের স্টলগুলো প্রতিবছরই এমন ঝুঁকির মুখে পড়ে। অপ্রাপ্তি আর দীর্ঘশ্বাসের মধ্য দিয়ে শেষ হওয়া এবারের বইমেলা প্রকাশনা শিল্পের জন্য একটি বড় ধাক্কা। রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক মন্দা এবং প্রকৃতির বৈরিতায় যে ক্ষত তৈরি হলো, তা কাটিয়ে উঠতে প্রকাশকদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হবে।
রিপোর্টারের নাম 





















