ঢাকা ১০:৩৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৫ মার্চ ২০২৬

‘সরকারের ভেতরে থেকেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি ঠেকাতে পারিনি’: ফরিদা আখতার

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত বিতর্কিত বাণিজ্য চুক্তির আওতায় দেশটিতে উৎপাদিত অতিরিক্ত মাংস, পোল্ট্রি এবং অন্যান্য প্রাণিজ পণ্য বাংলাদেশে আমদানির বিষয়ে নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। তিনি অভিযোগ করেছেন, সরকারের ভেতরে থেকে শেষ দিন পর্যন্ত লড়াই করেও তিনি এই চুক্তি ঠেকাতে পারেননি। শনিবার (১৪ মার্চ) রাজধানীর পান্থপথে ঢাকা স্ট্রিম কার্যালয়ে আয়োজিত ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট: ক্যাবের ১৩ দফা ও জনপ্রত্যাশা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এসব বিস্ফোরক মন্তব্য করেন।

ফরিদা আখতার তাঁর বক্তব্যে চুক্তির গোপনীয়তা রক্ষার নীতির কঠোর সমালোচনা করে বলেন, “একটি দেশের সঙ্গে আরেকটি দেশের চুক্তি হচ্ছে অথচ সেখানে গোপনীয়তার দোহাই দিয়ে সবকিছু আড়াল করা হচ্ছে। এমনকি সরকারের ভেতরে থেকেও সবাই সবকিছু জানতে পারবে না—এমন পরিস্থিতি কাম্য নয়।” তিনি জানান, এই চুক্তির প্রক্রিয়াটি অনেক আগে থেকেই চলছিল এবং তিনি শুরু থেকেই দেশীয় খামারিদের সুরক্ষা ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে এর বিরোধিতা করে আসছিলেন।

সাবেক এই উপদেষ্টা জানান, ২০২৫ সালের জুনে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় যখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে মাংস, পোল্ট্রির বাচ্চা, ক্যাটফিশ ও নাড়িভুঁড়ি আমদানির অনুমোদনের প্রস্তাব দেয়, তখন তাঁর মন্ত্রণালয় থেকে বৈজ্ঞানিক ও স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে আপত্তি জানানো হয়েছিল। বিশেষ করে ‘জুনোটিক’ রোগের সম্ভাবনা এবং অ্যান্টিবায়োটিক যুক্ত পণ্যের ঝুঁকি যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছিল। ফরিদা আখতার বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের টেস্টিং ব্যবস্থা উন্নত হলেও বাংলাদেশে পণ্য প্রবেশের আগে আমাদের নিজস্ব পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকা জরুরি। কিন্তু চুক্তিতে এমন শর্ত রাখা হয়েছে যে আমাদের নিজস্ব পরীক্ষার সুযোগ নেই, তাদের দেওয়া সনদই মেনে নিতে হবে।”

যুক্তরাষ্ট্রের এই রপ্তানি প্রচেষ্টাকে ‘ডাম্পিং’ হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন, উন্নত দেশগুলোতে জেনেটিক্যালি মডিফাইড (GMO) খাবার খাইয়ে পশু পালন করা হয় এবং তাদের অতিরিক্ত উৎপাদিত বিষাক্ত মাংসের জন্য বাংলাদেশকে ‘ডাম্পিং গ্রাউন্ড’ হিসেবে ব্যবহার করার ষড়যন্ত্র চলছে। এর ফলে বাংলাদেশের প্রায় ২ কোটি খামারি এবং পশুপালন খাতের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবিকা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। সস্তায় বিদেশি মাংস বাজারে এলে দেশীয় উৎপাদন ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে বলে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

নিজের ব্যর্থতা স্বীকার করে ফরিদা আখতার বলেন, “নাগরিক হিসেবে এবং সরকারের একজন অংশীদার হিসেবে আমি আমার অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। তবে শেষ পর্যন্ত চুক্তিটি হয়ে যাওয়ায় এই না পারার দায়ভার আমারও রয়েছে।” ইউনূস সরকারের ১৮ মাসের কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনার জবাবে তিনি বলেন, সরকারের প্রতি পুরোপুরি হতাশ হওয়ার সুযোগ নেই। দীর্ঘ ১৫ বছরের পুঞ্জীভূত সমস্যা, প্রতিদিনের আন্দোলন এবং প্রশাসনিক অস্থিরতার মধ্যেও সরকার অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছে। সব কাজ শতভাগ সফল না হলেও এই সময়কে কেবল হতাশা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রতারক ধরিয়ে দিয়ে সরকারের সুস্পষ্ট বার্তা – আগারগাঁও থেকে ভিভিআইপি প্রতারক গ্রেফতার

‘সরকারের ভেতরে থেকেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি ঠেকাতে পারিনি’: ফরিদা আখতার

আপডেট সময় : ০৮:৫৮:৩০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৫ মার্চ ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত বিতর্কিত বাণিজ্য চুক্তির আওতায় দেশটিতে উৎপাদিত অতিরিক্ত মাংস, পোল্ট্রি এবং অন্যান্য প্রাণিজ পণ্য বাংলাদেশে আমদানির বিষয়ে নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। তিনি অভিযোগ করেছেন, সরকারের ভেতরে থেকে শেষ দিন পর্যন্ত লড়াই করেও তিনি এই চুক্তি ঠেকাতে পারেননি। শনিবার (১৪ মার্চ) রাজধানীর পান্থপথে ঢাকা স্ট্রিম কার্যালয়ে আয়োজিত ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট: ক্যাবের ১৩ দফা ও জনপ্রত্যাশা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এসব বিস্ফোরক মন্তব্য করেন।

ফরিদা আখতার তাঁর বক্তব্যে চুক্তির গোপনীয়তা রক্ষার নীতির কঠোর সমালোচনা করে বলেন, “একটি দেশের সঙ্গে আরেকটি দেশের চুক্তি হচ্ছে অথচ সেখানে গোপনীয়তার দোহাই দিয়ে সবকিছু আড়াল করা হচ্ছে। এমনকি সরকারের ভেতরে থেকেও সবাই সবকিছু জানতে পারবে না—এমন পরিস্থিতি কাম্য নয়।” তিনি জানান, এই চুক্তির প্রক্রিয়াটি অনেক আগে থেকেই চলছিল এবং তিনি শুরু থেকেই দেশীয় খামারিদের সুরক্ষা ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে এর বিরোধিতা করে আসছিলেন।

সাবেক এই উপদেষ্টা জানান, ২০২৫ সালের জুনে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় যখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে মাংস, পোল্ট্রির বাচ্চা, ক্যাটফিশ ও নাড়িভুঁড়ি আমদানির অনুমোদনের প্রস্তাব দেয়, তখন তাঁর মন্ত্রণালয় থেকে বৈজ্ঞানিক ও স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে আপত্তি জানানো হয়েছিল। বিশেষ করে ‘জুনোটিক’ রোগের সম্ভাবনা এবং অ্যান্টিবায়োটিক যুক্ত পণ্যের ঝুঁকি যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছিল। ফরিদা আখতার বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের টেস্টিং ব্যবস্থা উন্নত হলেও বাংলাদেশে পণ্য প্রবেশের আগে আমাদের নিজস্ব পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকা জরুরি। কিন্তু চুক্তিতে এমন শর্ত রাখা হয়েছে যে আমাদের নিজস্ব পরীক্ষার সুযোগ নেই, তাদের দেওয়া সনদই মেনে নিতে হবে।”

যুক্তরাষ্ট্রের এই রপ্তানি প্রচেষ্টাকে ‘ডাম্পিং’ হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন, উন্নত দেশগুলোতে জেনেটিক্যালি মডিফাইড (GMO) খাবার খাইয়ে পশু পালন করা হয় এবং তাদের অতিরিক্ত উৎপাদিত বিষাক্ত মাংসের জন্য বাংলাদেশকে ‘ডাম্পিং গ্রাউন্ড’ হিসেবে ব্যবহার করার ষড়যন্ত্র চলছে। এর ফলে বাংলাদেশের প্রায় ২ কোটি খামারি এবং পশুপালন খাতের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবিকা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। সস্তায় বিদেশি মাংস বাজারে এলে দেশীয় উৎপাদন ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে বলে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

নিজের ব্যর্থতা স্বীকার করে ফরিদা আখতার বলেন, “নাগরিক হিসেবে এবং সরকারের একজন অংশীদার হিসেবে আমি আমার অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। তবে শেষ পর্যন্ত চুক্তিটি হয়ে যাওয়ায় এই না পারার দায়ভার আমারও রয়েছে।” ইউনূস সরকারের ১৮ মাসের কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনার জবাবে তিনি বলেন, সরকারের প্রতি পুরোপুরি হতাশ হওয়ার সুযোগ নেই। দীর্ঘ ১৫ বছরের পুঞ্জীভূত সমস্যা, প্রতিদিনের আন্দোলন এবং প্রশাসনিক অস্থিরতার মধ্যেও সরকার অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছে। সব কাজ শতভাগ সফল না হলেও এই সময়কে কেবল হতাশা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।