ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন নগরবাসী। এ নিয়ে হতাশ নগরীর বাসিন্দারা। অধিকাংশ ওয়ার্ডে কাউন্সিলর না থাকায় জন্মনিবন্ধন সনদ, মৃত্যু সনদ, সনদ সংশোধন, নাগরিকত্ব সনদ সরবরাহসহ নানা ধরনের সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা।
নগরীর বাসিন্দারা বলছেন, সিটি করপোরেশনে পূর্ণকালীন প্রশাসক না থাকায় এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কাউন্সিলরদের অনুপস্থিতিতে নাগরিকরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন সনদ, ওয়ারিশান সনদ এবং ট্রেড লাইসেন্সের মতো জরুরি সনদ পেতে নাগরিকদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এ ছাড়া নিয়মিত তদারকির অভাবে শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। প্রশাসক শূন্যতা এবং কাউন্সিলররা না থাকায় নতুন প্রকল্পের অনুমোদন ও চলমান উন্নয়ন কাজগুলো ধীরগতিতে চলছে। অনেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর আত্মগোপনে থাকায় সাধারণ মানুষ তাদের জরুরি সমস্যা সমাধানের জন্য নির্দিষ্ট কোনও প্রতিনিধি খুঁজে পাচ্ছেন না।
সিটিজেন চার্টার অনুযায়ী, ওয়ার্ড কাউন্সিলর কার্যালয় থেকে জন্মনিবন্ধন সনদ, মৃত্যুসনদ, সনদ সংশোধন, নাগরিকত্ব সনদ, চারিত্রিক সনদ, উত্তরাধিকার (ওয়ারিশ) সনদ, ভূমিহীন সনদ, টিসিবি কার্ড, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ভাতার সত্যায়িত সনদসহ বিভিন্ন সনদ দেওয়া হয়। এ ছাড়া ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কার্যালয় থেকে বিভিন্ন প্রত্যয়নপত্র, অনাপত্তিপত্র (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে), জাতীয় পরিচয়পত্র ও ভোটার তালিকায় যাচাইকারী হিসেবে স্বাক্ষর দিতে হয় কাউন্সিলরকে। মামলা থাকাসহ নানা কারণে সিটি করপোরেশনের ১৪টি ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আত্মগোপনে। এ অবস্থায় মানুষ নানা ধরনের সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এসব সনদ পেতে হলে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের সই প্রয়োজন। নিয়মিত কাজের অংশ হিসেবে মশক ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কাজের তদারকি এবং টিসিবির পণ্য বিতরণের কাজও পরিচালিত হয় কাউন্সিলর কার্যালয় থেকে। কিন্তু কাউন্সিলররা আত্মগোপনে থাকায় তাদের কার্যালয়গুলো বন্ধ রয়েছে। ফলে ভোগান্তিতে পড়েছেন সেবাগ্রহীতারা।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আত্মগোপনে চলে যান বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র ও বেশিরভাগ কাউন্সিলর। এরপর বিভাগীয় কমিশনারকে সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি প্রত্যেক ওয়ার্ডে বিভিন্ন সরকারি দফতরের কর্মকর্তাদের প্রশাসকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরপর থেকে জনপ্রতিনিধি ছাড়াই চলছে কার্যক্রম। ফলে নাগরিক সেবাবঞ্চিত হওয়ার কথা বলছেন নগরবাসী।
ভোগান্তির কথা জানিয়ে ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা কামরুল হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জনপ্রতিনিধি না থাকায় সিটি করপোরেশনে সেবা নিতে গেলে নাগরিকদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। বিশেষ করে জন্ম নিবন্ধন, মৃত্যু সনদ, জাতীয় পরিচয়পত্র আগে খুব সহজেই পাওয়া যেতো। নির্বাচিত কাউন্সিলর ও মেয়র না থাকায় এই সেবাগুলো পেতে দিনের পর দিন ঘুরতে হয়। প্রশাসকের কাছে সহজেই সেবা পাওয়া যায় না।’
একই কথা বলেছেন ১০ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা কমলা রানী। তিনি বলেন, ‘আগে কাউন্সিলরদের কাছে গেলে সব ধরনের কাজ হতো। এখন কোনও কাজে কাউন্সিলর অফিসে গেলে কাউকে ঠিকমতো পাওয়া যায় না। বিশেষ করে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে কোনোদিন কাউন্সিলরের অফিসে দেখা যায় না। এতে যেকোনো কাজের জন্য ভোগান্তি পোহাতে হয়।’
তিনি জানান, আগে কাউন্সিলর কিংবা মেয়রের কাছে খুব সহজেই সমস্যার কথা বলা যেতো। এখন সমস্যা নিয়ে সিটি করপোরেশনে প্রশাসকের কাছে গেলে সহজে কাজ হয় না। মৃত্যু সনদ কিংবা জন্ম নিবন্ধন জাতীয় পরিচয়পত্র, এমনকি অন্যান্য কাজ করাতে মাসের পর মাস ঘুরতে হয়।
মশক নিধন ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কার্যক্রম স্থবির হয়ে আছে বলে জানিয়েছেন ২০ নম্বর ওয়ার্ডের কেওয়াটখালির বাসিন্দা রকিব হাসান। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আগে এলাকার ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার, মশা নিধনের বিষয়ে অভিযোগ নিয়ে কাউন্সিলরদের কাছে গেলেই দ্রুত কাজ হতো। এখন যথাযথভাবে এলাকার ময়লা ও বর্জ্য পরিষ্কার করা হয় না। ড্রেনেজ ব্যবস্থা একেবারেই খারাপ অবস্থায় আছে। এ কারণে সিটি করপোরেশন এলাকায় মশার উপদ্রব চরম আকার ধারণ করেছে। দিনে-রাতে সবসময় মশার উপদ্রব দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে তারাবি নামাজ পড়তে গিয়ে মশার উপদ্রবে মুসল্লিদের খুব কষ্ট করতে হচ্ছে। এ নিয়ে সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের কাছে অভিযোগ দিয়েও কোনও কাজ হচ্ছে না।’
৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সালাম মিয়া বলেন, ‘মেয়র ও কাউন্সিলর থাকা অবস্থায় এলাকার ময়লা-আবর্জনা কর্মীরা এসে নিয়ে যেতো। এখন দীর্ঘ সময় পড়ে থাকলেও সরানো হচ্ছে না। এতে করে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। আবর্জনা-ময়লার ওপর দিয়ে মানুষকে যাতায়াত করতে হয়। নগরবাসী চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।’
একই এলাকার বাসিন্দা মরিয়ম আক্তার বলেন, ‘আবর্জনা পরিষ্কার না করায় মশার উপদ্রব চরম আকার ধারণ করেছে। আগে দেখতাম মেশিন দিয়ে মশা নিধনের ওষুধ ছিটানো হতো। কিন্তু এখন এ ধরনের কোনও কার্যক্রম দেখা যায় না। দিনের বেলাতেও মশার উপদ্রবের কারণে মশারি টানিয়ে বসে থাকতে হয়।’
ময়মনসিংহ জেলা নাগরিক আন্দোলনের সভাপতি এইএইচএম খালেকুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় সিটি করপোরেশনের যেকোনো ধরনের সেবা পেতে নগরবাসীকে ভোগান্তিত পোহাতে হচ্ছে। বিশেষ করে উন্নয়নকাজ একেবারেই থেমে গেছে। অনেক রাস্তাঘাট ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে আছে। ওয়ার্ডগুলোতে ময়লা-আবর্জনাকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। এ নিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসকসহ কর্মকর্তাদের তেমন নজরদারি দেখা যায় না। এগুলো দ্রুত সমাধান করা জরুরি।’
নগরীতে ময়লা-আবর্জনা ও মশার উপদ্রবের কথা স্বীকার করেছেন সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা এইচ কে দেবনাথ। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জনবল সঙ্কটের কারণে মশা নিধনের কাজ যথাযথভাবে করা যাচ্ছে না। এ কারণে নগরীতে মশার উপদ্রব বেড়ে গেছে। তবে সিটি করপোরেশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে দ্রুতই মশা নিধন ক্র্যাশ প্রোগ্রাম শুরু করা হবে।’
সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সুমনা আল মজীদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সিটি করপোরেশন হলেও এখনও সেই পৌরসভার জনবল দিয়েই নগরবাসীকে সেবা দিতে হচ্ছে। তবে আমরা সাধ্যমতো সেবা দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি। নগরে মশা নিধনের জন্য দ্রুতই কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
রিপোর্টারের নাম 






















