সিলেটের ঐতিহ্যবাহী হযরত শাহজালাল (র.) দরগাহ প্রাঙ্গণে তারাবির নামাজ শেষে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক সারজিস আলমের রাজনৈতিক স্লোগানকে ঘিরে তীব্র সমালোচনা ও নিন্দার ঝড় উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, দরগাহের পবিত্র পরিবেশে হাজারো মানুষের সামনে সারজিস আলম একের পর এক স্লোগান দিচ্ছেন, যা দরগাহের ভাবগাম্ভীর্য ও পবিত্রতা ক্ষুণ্ন করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ঘটনাটি ঘটে গত বুধবার রাতে। এনসিপি সিলেট জেলা ও মহানগর শাখার আয়োজনে একটি বিভাগীয় ইফতার মাহফিল শেষে দলের কেন্দ্রীয় নেতারা হযরত শাহজালাল (র.) দরগাহ মসজিদে তারাবির নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষে যখন নেতারা বের হচ্ছিলেন, তখন দরগাহে উপস্থিত কয়েক হাজার মানুষ মুহুর্মুহু স্লোগান দিতে শুরু করে। একপর্যায়ে সারজিস আলম দরগাহের ভেতরে অবস্থিত নারীদের ইবাদতখানার ছাদে উঠে বিভিন্ন রাজনৈতিক স্লোগান দেন, যেখানে উপস্থিত জনতা তার সাথে কণ্ঠ মেলায়।
প্রচারিত ভিডিওতে সারজিস আলমকে ‘ইনকিলাব ইনকিলাব, জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ’, ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবর’, ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা’, ‘দালালি না রাজপথ, রাজপথ রাজপথ’, ‘আপস না সংগ্রাম, সংগ্রাম সংগ্রাম’, ‘গোলামি না আজাদি, আজাদি আজাদি’, ‘দিয়েছি তো রক্ত, আরও দেবো রক্ত’, ‘রক্তের বন্যায়, ভেসে যাবে অন্যায়’, ‘যুগে যুগে লড়ে যাবো, আমরা সবাই হাদি হবো’, ‘তুমি কে আমি কে, হাদি হাদি’ – ইত্যাদি স্লোগান দিতে শোনা যায়।
এই ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সিলেটের সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষ। সংক্ষুব্ধ নাগরিক আন্দোলন সিলেটের সমন্বয়ক আবদুল করিম চৌধুরী (কিম) সামাজিক মাধ্যমে ভিডিওটি শেয়ার করে লিখেছেন, “সুলতানুল বাঙাল হযরত শাহজালাল (র.)-এর মাজার জিয়ারতের সময় আজ পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক দল দলীয় স্লোগান দিয়ে মাজার এলাকার আদব নষ্ট করেনি। মধ্যরাতে মাজার জিয়ারতের নামে এনসিপির নেতৃবৃন্দ যে আচরণ করলেন, তা সুফি দরগাহের আদবের খেলাফ। মহিলা ইবাদতখানার উপরে উঠে সারজিস আলম স্লোগান দিলেন দিল্লি না ঢাকা! তাদের এই আচরণে আমি ক্ষুব্ধ।” তিনি আরও বলেন, “এ ঘটনায় আধ্যাত্মিক রাজধানী সিলেটের মানুষ ক্ষুব্ধ। দরগাহ শরিফের একটি নিয়ম বা উসুল আছে। এ ক্ষেত্রে সেই পবিত্রতার কিংবা নীরবতা পালন করা হয়নি।”
মাহতাব শাহ ফকির নামের একজন লিখেছেন, “কোনটা দোয়ার জায়গা আর কোনটা স্লোগানের মঞ্চ, যারা এই পার্থক্যই বুঝতে পারে না, তারা কীভাবে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেবে? সিলেট আধ্যাত্মিকতার রাজধানী। এ নগর ওলিদের স্মৃতি বহন করে। এখানে আবেগ নয়, আদবই প্রথম শর্ত। পবিত্র স্থানের মর্যাদা রক্ষা করা সবার নৈতিক দায়িত্ব। আধ্যাত্মিক পরিবেশে অপ্রাসঙ্গিক কর্মকাণ্ড কখনোই মানানসই নয়। এসব কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানাই।” মঈনুল হোসেন মনোয়ার নামের আরেকজন মন্তব্য করেছেন, “আওয়ামী লীগ-বিএনপি বেশির ভাগ সময় বাংলাদেশ শাসন করেছে। ৩৬০ আউলিয়ার শিরোমণি হযরত শাহজালাল (রা.)-এর পবিত্র দরগাহ প্রাঙ্গণে রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে কখনও এমন ন্যাক্কারজনক ঘটনার জন্ম দেয়নি। মসজিদ, ওলি, আউলিয়াদের দরগাহ শরিফ রাজনীতি চর্চার স্থান নয়। এ কেমন মূর্খতা…? ঘৃণাভরে এর নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।”
এ বিষয়ে এনসিপি সিলেট জেলার যুগ্ম আহ্বায়ক নাজিম উদ্দিন শাহান বলেন, তারাবির নামাজ শেষে দরগাহ চত্বরে প্রচুর সংখ্যক তরুণ-তরুণী (জেন-জি) জড়ো হয়েছিলেন। তারা মূলত ‘হাদি হত্যার’ বিচারের দাবিতে নানা স্লোগান দিচ্ছিলেন। সারজিস আলমও তাদের সঙ্গে স্লোগান দেন। তিনি আরও বলেন, অতীতেও দরগাহ শরিফে বিএনপি চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সিলেট সফরকালে অনেকে ‘দুলাভাই, দুলাভাই’ বলে স্লোগান দিয়েছিল, যা আবেগের বিষয় ছিল। দরগাহ শরিফের পবিত্রতা ও ভাবগাম্ভীর্য ফিরিয়ে আনতে তিনি মাজার এলাকায় মদ-গাঁজা বন্ধের দাবি জানান।
প্রসঙ্গত, ইফতার মাহফিলে সারজিস আলম তার বক্তব্যে জাতীয় নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তোলেন এবং স্থানীয় নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারকারীদের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি দেন। তিনি বলেন, জনগণের ভোটের অধিকার জনগণকেই বুঝে নিতে হবে এবং যারা ফ্যাসিবাদের দোসর বা জুলাই বিপ্লবের বিরোধী ছিল, তাদের প্রশ্রয় দিলে নিজেদেরই শেষ হতে হবে। এই বক্তব্যের পরই তিনি দরগাহে গিয়ে স্লোগান দেন।
রিপোর্টারের নাম 

























