ঢাকা ১০:৩৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬

ইরানে ট্রাম্পের ‘ট্রাম্পকার্ড’ কি তাহলে কুর্দিরাই?

ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা ভেঙে দিতে দেশটির সশস্ত্র কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর একটি জোটের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানকে অস্থিতিশীল করার যে পরিকল্পনা ওয়াশিংটন বাস্তবায়ন করছে, তাতে কুর্দিরা বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য-বিষয়ক সংবাদমাধ্যম আল-মনিটরের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্প্রতি ইরাকি কুর্দিস্তানের রাজধানী এরবিলে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কুর্দি নেতাদের এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এরই মধ্যে কুর্দি অধ্যুষিত ইরানের অন্তত ১৭টি শহরে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বাহিনী। হামলার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে গোয়েন্দা দফতর, রেভল্যুশনারি গার্ডের (আইআরজিসি) সদর দফতর এবং রাজনৈতিক বন্দিদের রাখা কারাগারগুলো।

সশস্ত্র কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর নবগঠিত জোট কোয়ালিশন অব পলিটিক্যাল ফোর্সেস অব ইরানিয়ান কুর্দিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তাদের এলাকায় একটি ‘নো ফ্লাই জোন’ ঘোষণার দাবি জানিয়েছে। ১৯৯১ সালে সাদ্দাম হোসেনের হাত থেকে কুর্দি ও শিয়াদের বাঁচাতে যেভাবে নো ফ্লাই জোন করা হয়েছিল, সেভাবেই বিমান সহায়তার নিশ্চয়তা চায় তারা। তবে মার্কিন প্রশাসন এখনও এ বিষয়ে চূড়ান্ত কোনও সিদ্ধান্ত জানায়নি।

আরও পড়ুন: ইরানে অভ্যুত্থান ঘটাতে কুর্দিদের অস্ত্র দিচ্ছে সিআইএ

ইরানে আনুমানিক ৮০ লাখ থেকে ১ কোটি ৫০ লাখ কুর্দি বাস করেন, যা তুরস্কের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। গত ২২ ফেব্রুয়ারি গঠিত ৫টি দলের এই কুর্দি জোট এক বিবৃতিতে ইরান ‘এক নির্ণায়ক ও ভাগ্যনির্ধারণী পর্যায়ে’ প্রবেশ করেছে বলে উল্লেখ করেছে। তারা ইরানি সামরিক বাহিনীকে পক্ষ ত্যাগ করে জনগণের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে।

উল্লেখ্য, গত রবিবার ইসরায়েলি হামলায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরাকি কুর্দিস্তানের শীর্ষ দুই নেতা মাসুদ বারজানি এবং বাফেল তালাবানির সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। বাফেল তালাবানি ট্রাম্পের সঙ্গে যুদ্ধের বিষয়ে আলাপের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

ইরানে ট্রাম্পের ‘ট্রাম্পকার্ড’ কি তাহলে কুর্দিরাই?

বিশ্লেষকরা বলছেন, কুর্দিরা ট্রাম্পের এই প্রস্তাবে রাজি হওয়া নিয়ে সতর্ক। এর পেছনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ‘বিশ্বাসঘাতকতা’র দীর্ঘ ইতিহাস। ১৯৭৫ সালে হেনরি কিসিঞ্জারের সময় থেকে শুরু করে অতি সম্প্রতি সিরিয়ার কুর্দিদের (এসডিএফ) ওপর আসাদ বাহিনীর হামলার সময় পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র বারবার তাদের বিপদে একা ফেলে গেছে।

মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক ঝুঁকি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান জিওপোল ল্যাবস-এর প্রতিষ্ঠাতা রামজি মারদিনি বলেন, ‘কুর্দি নেতারা মার্কিন নেতাদের প্রতিশ্রুতিকে ধ্রুব সত্য বলে ভুল করেন। বর্তমান মার্কিন জনমত এই যুদ্ধের পক্ষে নেই, যা কুর্দিদের জন্য বড় সংকেত হওয়া উচিত।’

কুর্দিদের এই বিদ্রোহ উসকে দিলে তেহরানের পাশাপাশি বাগদাদ ও আঙ্কারাও ক্ষুব্ধ হতে পারে। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান মঙ্গলবার জানিয়েছেন, তারা ইরানের পরিস্থিতির ওপর গভীর নজর রাখছেন। বিশেষ করে কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠী পিজেএকে যদি আবারও লড়াই শুরু করে, তবে তুরস্ক নিরাপত্তা হুমকিতে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে।

ইরাকি কুর্দি নেতারাও চিন্তিত যে, তারা যদি ইরানবিরোধী তৎপরতায় সরাসরি অংশ নেন, তবে তেহরান সরাসরি তাদের ওপর আঘাত হানবে। বিশেষ করে খোর মোর গ্যাস ক্ষেত্রের ওপর হামলার ঝুঁকি রয়েছে, যা এই অঞ্চলের বিদ্যুতের প্রধান উৎস।

ইতালির রোমভিত্তিক গবেষক মারিয়া ফান্তাপ্পি বলেন, ‘ইরাকি কুর্দি নেতারা তেহরানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার কারণে এখন অনেক বেশি সতর্ক। এই মুহূর্তে বৃহত্তর কুর্দিস্তানের জাতীয়তাবাদী আকাঙ্ক্ষার চেয়ে তারা নিজেদের অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে বেশি গুরুত্ব দিতে পারেন।’

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

অন্তর্বর্তী সরকারের ১৩৩ অধ্যাদেশের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে সংসদে

ইরানে ট্রাম্পের ‘ট্রাম্পকার্ড’ কি তাহলে কুর্দিরাই?

আপডেট সময় : ০৮:৫০:০২ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ মার্চ ২০২৬

ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা ভেঙে দিতে দেশটির সশস্ত্র কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর একটি জোটের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানকে অস্থিতিশীল করার যে পরিকল্পনা ওয়াশিংটন বাস্তবায়ন করছে, তাতে কুর্দিরা বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য-বিষয়ক সংবাদমাধ্যম আল-মনিটরের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্প্রতি ইরাকি কুর্দিস্তানের রাজধানী এরবিলে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কুর্দি নেতাদের এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এরই মধ্যে কুর্দি অধ্যুষিত ইরানের অন্তত ১৭টি শহরে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বাহিনী। হামলার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে গোয়েন্দা দফতর, রেভল্যুশনারি গার্ডের (আইআরজিসি) সদর দফতর এবং রাজনৈতিক বন্দিদের রাখা কারাগারগুলো।

সশস্ত্র কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর নবগঠিত জোট কোয়ালিশন অব পলিটিক্যাল ফোর্সেস অব ইরানিয়ান কুর্দিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তাদের এলাকায় একটি ‘নো ফ্লাই জোন’ ঘোষণার দাবি জানিয়েছে। ১৯৯১ সালে সাদ্দাম হোসেনের হাত থেকে কুর্দি ও শিয়াদের বাঁচাতে যেভাবে নো ফ্লাই জোন করা হয়েছিল, সেভাবেই বিমান সহায়তার নিশ্চয়তা চায় তারা। তবে মার্কিন প্রশাসন এখনও এ বিষয়ে চূড়ান্ত কোনও সিদ্ধান্ত জানায়নি।

আরও পড়ুন: ইরানে অভ্যুত্থান ঘটাতে কুর্দিদের অস্ত্র দিচ্ছে সিআইএ

ইরানে আনুমানিক ৮০ লাখ থেকে ১ কোটি ৫০ লাখ কুর্দি বাস করেন, যা তুরস্কের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। গত ২২ ফেব্রুয়ারি গঠিত ৫টি দলের এই কুর্দি জোট এক বিবৃতিতে ইরান ‘এক নির্ণায়ক ও ভাগ্যনির্ধারণী পর্যায়ে’ প্রবেশ করেছে বলে উল্লেখ করেছে। তারা ইরানি সামরিক বাহিনীকে পক্ষ ত্যাগ করে জনগণের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে।

উল্লেখ্য, গত রবিবার ইসরায়েলি হামলায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরাকি কুর্দিস্তানের শীর্ষ দুই নেতা মাসুদ বারজানি এবং বাফেল তালাবানির সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। বাফেল তালাবানি ট্রাম্পের সঙ্গে যুদ্ধের বিষয়ে আলাপের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

ইরানে ট্রাম্পের ‘ট্রাম্পকার্ড’ কি তাহলে কুর্দিরাই?

বিশ্লেষকরা বলছেন, কুর্দিরা ট্রাম্পের এই প্রস্তাবে রাজি হওয়া নিয়ে সতর্ক। এর পেছনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ‘বিশ্বাসঘাতকতা’র দীর্ঘ ইতিহাস। ১৯৭৫ সালে হেনরি কিসিঞ্জারের সময় থেকে শুরু করে অতি সম্প্রতি সিরিয়ার কুর্দিদের (এসডিএফ) ওপর আসাদ বাহিনীর হামলার সময় পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র বারবার তাদের বিপদে একা ফেলে গেছে।

মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক ঝুঁকি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান জিওপোল ল্যাবস-এর প্রতিষ্ঠাতা রামজি মারদিনি বলেন, ‘কুর্দি নেতারা মার্কিন নেতাদের প্রতিশ্রুতিকে ধ্রুব সত্য বলে ভুল করেন। বর্তমান মার্কিন জনমত এই যুদ্ধের পক্ষে নেই, যা কুর্দিদের জন্য বড় সংকেত হওয়া উচিত।’

কুর্দিদের এই বিদ্রোহ উসকে দিলে তেহরানের পাশাপাশি বাগদাদ ও আঙ্কারাও ক্ষুব্ধ হতে পারে। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান মঙ্গলবার জানিয়েছেন, তারা ইরানের পরিস্থিতির ওপর গভীর নজর রাখছেন। বিশেষ করে কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠী পিজেএকে যদি আবারও লড়াই শুরু করে, তবে তুরস্ক নিরাপত্তা হুমকিতে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে।

ইরাকি কুর্দি নেতারাও চিন্তিত যে, তারা যদি ইরানবিরোধী তৎপরতায় সরাসরি অংশ নেন, তবে তেহরান সরাসরি তাদের ওপর আঘাত হানবে। বিশেষ করে খোর মোর গ্যাস ক্ষেত্রের ওপর হামলার ঝুঁকি রয়েছে, যা এই অঞ্চলের বিদ্যুতের প্রধান উৎস।

ইতালির রোমভিত্তিক গবেষক মারিয়া ফান্তাপ্পি বলেন, ‘ইরাকি কুর্দি নেতারা তেহরানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার কারণে এখন অনেক বেশি সতর্ক। এই মুহূর্তে বৃহত্তর কুর্দিস্তানের জাতীয়তাবাদী আকাঙ্ক্ষার চেয়ে তারা নিজেদের অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে বেশি গুরুত্ব দিতে পারেন।’