ঢাকা ০৬:১৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬

ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোরতা ছাড়া অর্থনীতি স্থিতিশীল হবে না: এ কে আজাদ

দেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল করতে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ অপরিহার্য বলে মন্তব্য করেছেন শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী নেতা ও ইন্টারন্যাশনাল চেম্বারস অব কমার্স বাংলাদেশের (আইসিসিবি) ভাইস প্রেসিডেন্ট এ কে আজাদ। তিনি নবনির্বাচিত সরকারের সামনে খেলাপি ঋণ, বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং জ্বালানি সংকটকে অর্থনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরেছেন।

বুধবার (৪ মার্চ) রাজধানীর ব্র্যাক ইন সেন্টারে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন। ‘বাংলাদেশের উন্নয়ন: নবনির্বাচিত সরকারের জন্য স্বল্প ও মধ্যমেয়াদী অগ্রাধিকার’ শীর্ষক এই আলোচনায় তিনি দেশের অর্থনৈতিক চিত্র তুলে ধরেন।

খেলাপি ঋণের লাগাম টানার তাগিদ
এ কে আজাদ বলেন, বর্তমানে দেশে গড় খেলাপি ঋণের হার উদ্বেগজনকভাবে ৩৬ শতাংশে পৌঁছেছে, যা সরকারি ব্যাংকগুলোতে প্রায় ৫০ শতাংশ। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “এই বিপুল অর্থ কারা নিয়েছে?” ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক একটি এক্সিট পলিসি দিলেও, যারা ঋণ নিয়ে ব্যবসায় বিনিয়োগ না করে অন্য খাতে সরিয়ে নিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে দেশের অর্থনীতি কখনোই ভালো অবস্থায় ফিরবে না বলে তিনি জোরালো অভিমত ব্যক্ত করেন।

ব্যাহত বেসরকারি বিনিয়োগ, বাড়ছে সরকারি ঋণ
ব্যবসায়ী নেতা এ কে আজাদ জানান, বর্তমানে সরকারের ব্যাংকঋণ গ্রহণের হার ৩২.১৯ শতাংশ, যেখানে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি মাত্র ৬.১ শতাংশ। এতে শিল্পোদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পাচ্ছেন না। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “আমার জন্য টাকা নেই, থাকলেও নিতে পারছি না। গ্যাস সংযোগ নেই, বিদ্যুৎ সংকট— নতুন শিল্প বিনিয়োগ করবো কীভাবে?”

তিনি অভিযোগ করেন, সরকারের মোট ঋণের ৫৮ শতাংশ ব্যয় হচ্ছে বেতন-ভাতা, সুদ পরিশোধ ও ভর্তুকিতে, যা অনুৎপাদনশীল খাতে যাচ্ছে। রাজস্ব আহরণের চিত্রও আশানুরূপ নয়; অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা কম রাজস্ব এসেছে। এর প্রভাব পড়েছে জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে, যা ৩.৯৭ শতাংশে নেমে এসেছে।

জ্বালানি সংকটে শিল্প খাত বিপর্যস্ত
জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে এ কে আজাদ বলেন, হাজার হাজার নতুন গ্যাস সংযোগের আবেদন বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও তিতাসে আটকে আছে। শিল্পকারখানায় গ্যাস না পেয়ে উদ্যোক্তাদের বাড়তি খরচে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা উৎপাদন ব্যয় বাড়াচ্ছে। তিনি প্রস্তাব করেন, চুলার গ্যাস এলপিজিতে রূপান্তর করলে সেই গ্যাস শিল্পে সরবরাহ করা সম্ভব। এছাড়াও, প্রায় ১০ শতাংশ গ্যাস চোরাই লাইনে চলে যাচ্ছে দাবি করে তিনি সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও আইনের যথাযথ প্রয়োগ ছাড়া এ সংকট নিরসন সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন।

সরকারি ব্যয় পুনর্বিবেচনার আহ্বান
সরকারি ব্যয় সংকোচনের আহ্বান জানিয়ে এ কে আজাদ বলেন, মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের সংখ্যা ও কার্যকারিতা পুনর্মূল্যায়নে একটি কমিশন গঠন করা উচিত। অপ্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যয়সহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় কমানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। “যেখানে সাধারণ মানুষের তেল-চাল কেনার সামর্থ্য কমে যাচ্ছে, সেখানে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় গ্রহণযোগ্য নয়,” মন্তব্য করেন তিনি।

প্রতিযোগিতামূলক বিনিয়োগ পরিবেশের দাবি
প্রতিবেশী দেশগুলোর উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে বিনিয়োগকারীদের ক্যাপিটাল মেশিনারির ওপর ৪০ শতাংশ পর্যন্ত সহায়তা, নারী কর্মী নিয়োগে ভর্তুকি, জমি ও ইউটিলিটিতে প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। “অথচ আমি ১৩ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে পড়ে কীভাবে প্রতিযোগিতায় টিকব?”—প্রশ্ন রাখেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, শুধুমাত্র ব্যাংকঋণের সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। রাজস্ব আহরণ বাড়াতে হলে শিল্প-কারখানা চালু রাখতে হবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে এবং উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। শিল্প সচল থাকলেই ভ্যাট, আয়কর ও শুল্ক আদায় বাড়বে— ফলে অর্থনীতি গতি পাবে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

তদবিরের অভিযোগ তুলে হত্যা মামলার রায় স্থগিত রাখলেন বিচারক

ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোরতা ছাড়া অর্থনীতি স্থিতিশীল হবে না: এ কে আজাদ

আপডেট সময় : ০৪:৪৩:২০ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ মার্চ ২০২৬

দেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল করতে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ অপরিহার্য বলে মন্তব্য করেছেন শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী নেতা ও ইন্টারন্যাশনাল চেম্বারস অব কমার্স বাংলাদেশের (আইসিসিবি) ভাইস প্রেসিডেন্ট এ কে আজাদ। তিনি নবনির্বাচিত সরকারের সামনে খেলাপি ঋণ, বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং জ্বালানি সংকটকে অর্থনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরেছেন।

বুধবার (৪ মার্চ) রাজধানীর ব্র্যাক ইন সেন্টারে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন। ‘বাংলাদেশের উন্নয়ন: নবনির্বাচিত সরকারের জন্য স্বল্প ও মধ্যমেয়াদী অগ্রাধিকার’ শীর্ষক এই আলোচনায় তিনি দেশের অর্থনৈতিক চিত্র তুলে ধরেন।

খেলাপি ঋণের লাগাম টানার তাগিদ
এ কে আজাদ বলেন, বর্তমানে দেশে গড় খেলাপি ঋণের হার উদ্বেগজনকভাবে ৩৬ শতাংশে পৌঁছেছে, যা সরকারি ব্যাংকগুলোতে প্রায় ৫০ শতাংশ। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “এই বিপুল অর্থ কারা নিয়েছে?” ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক একটি এক্সিট পলিসি দিলেও, যারা ঋণ নিয়ে ব্যবসায় বিনিয়োগ না করে অন্য খাতে সরিয়ে নিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে দেশের অর্থনীতি কখনোই ভালো অবস্থায় ফিরবে না বলে তিনি জোরালো অভিমত ব্যক্ত করেন।

ব্যাহত বেসরকারি বিনিয়োগ, বাড়ছে সরকারি ঋণ
ব্যবসায়ী নেতা এ কে আজাদ জানান, বর্তমানে সরকারের ব্যাংকঋণ গ্রহণের হার ৩২.১৯ শতাংশ, যেখানে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি মাত্র ৬.১ শতাংশ। এতে শিল্পোদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পাচ্ছেন না। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “আমার জন্য টাকা নেই, থাকলেও নিতে পারছি না। গ্যাস সংযোগ নেই, বিদ্যুৎ সংকট— নতুন শিল্প বিনিয়োগ করবো কীভাবে?”

তিনি অভিযোগ করেন, সরকারের মোট ঋণের ৫৮ শতাংশ ব্যয় হচ্ছে বেতন-ভাতা, সুদ পরিশোধ ও ভর্তুকিতে, যা অনুৎপাদনশীল খাতে যাচ্ছে। রাজস্ব আহরণের চিত্রও আশানুরূপ নয়; অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা কম রাজস্ব এসেছে। এর প্রভাব পড়েছে জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে, যা ৩.৯৭ শতাংশে নেমে এসেছে।

জ্বালানি সংকটে শিল্প খাত বিপর্যস্ত
জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে এ কে আজাদ বলেন, হাজার হাজার নতুন গ্যাস সংযোগের আবেদন বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও তিতাসে আটকে আছে। শিল্পকারখানায় গ্যাস না পেয়ে উদ্যোক্তাদের বাড়তি খরচে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা উৎপাদন ব্যয় বাড়াচ্ছে। তিনি প্রস্তাব করেন, চুলার গ্যাস এলপিজিতে রূপান্তর করলে সেই গ্যাস শিল্পে সরবরাহ করা সম্ভব। এছাড়াও, প্রায় ১০ শতাংশ গ্যাস চোরাই লাইনে চলে যাচ্ছে দাবি করে তিনি সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও আইনের যথাযথ প্রয়োগ ছাড়া এ সংকট নিরসন সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন।

সরকারি ব্যয় পুনর্বিবেচনার আহ্বান
সরকারি ব্যয় সংকোচনের আহ্বান জানিয়ে এ কে আজাদ বলেন, মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের সংখ্যা ও কার্যকারিতা পুনর্মূল্যায়নে একটি কমিশন গঠন করা উচিত। অপ্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যয়সহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় কমানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। “যেখানে সাধারণ মানুষের তেল-চাল কেনার সামর্থ্য কমে যাচ্ছে, সেখানে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় গ্রহণযোগ্য নয়,” মন্তব্য করেন তিনি।

প্রতিযোগিতামূলক বিনিয়োগ পরিবেশের দাবি
প্রতিবেশী দেশগুলোর উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে বিনিয়োগকারীদের ক্যাপিটাল মেশিনারির ওপর ৪০ শতাংশ পর্যন্ত সহায়তা, নারী কর্মী নিয়োগে ভর্তুকি, জমি ও ইউটিলিটিতে প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। “অথচ আমি ১৩ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে পড়ে কীভাবে প্রতিযোগিতায় টিকব?”—প্রশ্ন রাখেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, শুধুমাত্র ব্যাংকঋণের সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। রাজস্ব আহরণ বাড়াতে হলে শিল্প-কারখানা চালু রাখতে হবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে এবং উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। শিল্প সচল থাকলেই ভ্যাট, আয়কর ও শুল্ক আদায় বাড়বে— ফলে অর্থনীতি গতি পাবে।