ঢাকা ০৪:০৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তাপ: বিশ্ববাজারে ফের বাড়লো তেলের দাম, সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ

ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সরবরাহ সংকটের গভীর উদ্বেগের মধ্যে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আবারও বেড়েছে। বুধবার (৪ মার্চ) আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় তিন শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন এক সংকটের জন্ম দিয়েছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটাচ্ছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগের দিনের তুলনায় দাম বৃদ্ধির গতি কিছুটা কম হলেও, এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে চাপ সৃষ্টি করছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর নিরাপত্তা প্রদানে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর সম্ভাব্য সহায়তার ইঙ্গিত দেওয়ায় কিছুটা স্বস্তি এলেও বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, রাতারাতি এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

বুধবার গ্রিনিচ মান সময় ০৬৫৯-এ ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি দুই দশমিক ৬৭ ডলার বা তিন দশমিক তিন শতাংশ বেড়ে ৮৪ দশমিক শূন্য সাত ডলারে পৌঁছেছে। এটি সাম্প্রতিক মাসগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্য। একইভাবে, ইউএস ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দাম দুই দশমিক ২৪ ডলার বা তিন শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৭৬ দশমিক আট মার্কিন ডলারে বিক্রি হয়েছে, যা গত জুন মাসের পর সর্বোচ্চ। গত দুই সেশনে বিশ্ববাজারে তেলের দাম পাঁচ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে।

অনলাইন মাল্টি-অ্যাসেট ট্রেডিং পরিষেবা ওএএনডিএর বিশেষজ্ঞ কেলভিন ওং মন্তব্য করেছেন, “যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতই তেলের দাম বৃদ্ধির মূল কারণ। উত্তেজনা প্রশমনের সুস্পষ্ট সংকেত পেলেই বর্তমান ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা কমতে পারে। তবে, আপাতত এমন কোনো সংকেত দেখা যাচ্ছে না।”

মঙ্গলবার ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোগুলোতে হামলা চালিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের জ্বালানি স্থাপনায় তেহরানের হামলার প্রতিশোধ হিসেবে এই হামলা চালানো হয়েছে বলে জানা গেছে। এই সামরিক সংঘাত সরাসরি তেলের উৎপাদন ও পরিবহন ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করছে।

এদিকে, ওপেকভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল উৎপাদক ইরাকও সরবরাহ সংকটে ভূমিকা রাখছে। দেশটির সংরক্ষণ সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এবং রপ্তানি পথের অভাবে দৈনিক প্রায় ১৫ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন কমিয়েছে, যা তাদের মোট উৎপাদনের প্রায় অর্ধেক। ইরাকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেছেন, রপ্তানি পুনরায় শুরু না হলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে তাদের সম্পূর্ণ উৎপাদন বন্ধ করে দিতে হতে পারে। ইরাক প্রতিদিন প্রায় ৩০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করে।

বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক পঞ্চমাংশ সরবরাহ হয় হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে। রয়টার্স জানিয়েছে, ইরান হরমুজ প্রণালিতে ট্যাঙ্কারগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করায় বর্তমানে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের নিরাপত্তা প্রদানের আশ্বাস কিছুটা আশার আলো দেখালেও, এই জটিল ভূ-রাজনৈতিক সমস্যার দ্রুত সমাধান সম্ভব নয় বলে মত দিয়েছেন বাজার বিশেষজ্ঞরা। বিশ্ব অর্থনীতিকে তাই আরও কিছুদিন এই অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

মধ্যপ্রাচ্য সংকট: চট্টগ্রাম বিমানবন্দর থেকে একদিনে ১১, মোট ৪৬ ফ্লাইট বাতিল

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তাপ: বিশ্ববাজারে ফের বাড়লো তেলের দাম, সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ

আপডেট সময় : ০২:৪৭:৩২ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ মার্চ ২০২৬

ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সরবরাহ সংকটের গভীর উদ্বেগের মধ্যে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আবারও বেড়েছে। বুধবার (৪ মার্চ) আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় তিন শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন এক সংকটের জন্ম দিয়েছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটাচ্ছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগের দিনের তুলনায় দাম বৃদ্ধির গতি কিছুটা কম হলেও, এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে চাপ সৃষ্টি করছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর নিরাপত্তা প্রদানে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর সম্ভাব্য সহায়তার ইঙ্গিত দেওয়ায় কিছুটা স্বস্তি এলেও বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, রাতারাতি এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

বুধবার গ্রিনিচ মান সময় ০৬৫৯-এ ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি দুই দশমিক ৬৭ ডলার বা তিন দশমিক তিন শতাংশ বেড়ে ৮৪ দশমিক শূন্য সাত ডলারে পৌঁছেছে। এটি সাম্প্রতিক মাসগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্য। একইভাবে, ইউএস ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দাম দুই দশমিক ২৪ ডলার বা তিন শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৭৬ দশমিক আট মার্কিন ডলারে বিক্রি হয়েছে, যা গত জুন মাসের পর সর্বোচ্চ। গত দুই সেশনে বিশ্ববাজারে তেলের দাম পাঁচ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে।

অনলাইন মাল্টি-অ্যাসেট ট্রেডিং পরিষেবা ওএএনডিএর বিশেষজ্ঞ কেলভিন ওং মন্তব্য করেছেন, “যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতই তেলের দাম বৃদ্ধির মূল কারণ। উত্তেজনা প্রশমনের সুস্পষ্ট সংকেত পেলেই বর্তমান ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা কমতে পারে। তবে, আপাতত এমন কোনো সংকেত দেখা যাচ্ছে না।”

মঙ্গলবার ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোগুলোতে হামলা চালিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের জ্বালানি স্থাপনায় তেহরানের হামলার প্রতিশোধ হিসেবে এই হামলা চালানো হয়েছে বলে জানা গেছে। এই সামরিক সংঘাত সরাসরি তেলের উৎপাদন ও পরিবহন ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করছে।

এদিকে, ওপেকভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল উৎপাদক ইরাকও সরবরাহ সংকটে ভূমিকা রাখছে। দেশটির সংরক্ষণ সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এবং রপ্তানি পথের অভাবে দৈনিক প্রায় ১৫ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন কমিয়েছে, যা তাদের মোট উৎপাদনের প্রায় অর্ধেক। ইরাকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেছেন, রপ্তানি পুনরায় শুরু না হলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে তাদের সম্পূর্ণ উৎপাদন বন্ধ করে দিতে হতে পারে। ইরাক প্রতিদিন প্রায় ৩০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করে।

বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক পঞ্চমাংশ সরবরাহ হয় হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে। রয়টার্স জানিয়েছে, ইরান হরমুজ প্রণালিতে ট্যাঙ্কারগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করায় বর্তমানে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের নিরাপত্তা প্রদানের আশ্বাস কিছুটা আশার আলো দেখালেও, এই জটিল ভূ-রাজনৈতিক সমস্যার দ্রুত সমাধান সম্ভব নয় বলে মত দিয়েছেন বাজার বিশেষজ্ঞরা। বিশ্ব অর্থনীতিকে তাই আরও কিছুদিন এই অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।