ঢাকা ১১:০৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তাপ ও টালমাটাল জ্বালানি বাজার: চরম অনিশ্চয়তায় বিশ্ব অর্থনীতি

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা নতুন মোড় নেওয়ায় বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতি। কয়েক সপ্তাহের আপেক্ষিক স্বস্তি কাটিয়ে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা তীব্র হয়েছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়তে পারে, যা শেষ পর্যন্ত বৈশ্বিক অর্থনীতিকে মন্দার দিকে ঠেলে দেবে।

সাম্প্রতিক সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জ্বালানি সমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্য। বিশেষ করে কাতার ও সৌদি আরবের মতো শীর্ষ উৎপাদনকারী দেশগুলোর তেল-গ্যাস স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলার আশঙ্কা বাজারকে অস্থির করে তুলেছে। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ৩০ শতাংশ এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের ১৭ শতাংশ এই অঞ্চল থেকে আসে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো হরমোজ প্রণালি, যার মধ্য দিয়ে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবাহিত হয়। এই রুটটি কোনো কারণে বন্ধ হয়ে গেলে বা বাধাগ্রস্ত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানির দাম বাড়লে এর সরাসরি প্রভাব পড়ে পণ্য ও সেবার মূল্যে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো মূল্যস্ফীতি সামাল দিতে সুদের হার বাড়াতে বাধ্য হয়। এতে ঋণ গ্রহণ ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে ভোক্তা ব্যয় ও ব্যবসায়িক বিনিয়োগে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ কেনেথ এস রোগফ সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন, অনেকেই এই সংঘাতকে স্বল্পমেয়াদি মনে করলেও ইতিহাস ভিন্ন কথা বলে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের উদাহরণ টেনে তিনি জানান, অনিশ্চয়তার এই সময়ে পরিস্থিতি যেকোনো দিকে মোড় নিতে পারে।

যদিও বর্তমান প্রেক্ষাপট ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকটের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন, কারণ যুক্তরাষ্ট্র এখন বড় মাপের তেল উৎপাদনকারী দেশ এবং চীন ও ইউরোপ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। তবুও বিশ্ব অর্থনীতি এখনো খনিজ তেলের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। হরমোজ প্রণালি কয়েক সপ্তাহের জন্য অবরুদ্ধ থাকলেও সার ও পেট্রোকেমিক্যাল পণ্যের উৎপাদন ব্যাহত হবে। এর ফলে খাদ্য উৎপাদন খরচ বেড়ে গিয়ে দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকার সাব-সাহারান দেশগুলোতে খাদ্যনিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

এই সংকটে সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছে ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ার শিল্পোন্নত দেশগুলো। বিশেষ করে চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও জার্মানি আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তাদের উৎপাদন খাত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে অস্থিরতা লক্ষ্য করা গেছে। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ফলে ভারতের মতো উদীয়মান অর্থনীতিগুলোও বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়তে পারে।

বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিশ্ব অর্থনীতিকে বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে হলে দ্রুত কূটনৈতিক সমাধানের কোনো বিকল্প নেই। অন্যথায়, জ্বালানি সংকটের এই ঢেউ উন্নয়নশীল থেকে উন্নত—সব দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে তছনছ করে দিতে পারে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তাপ ও টালমাটাল জ্বালানি বাজার: চরম অনিশ্চয়তায় বিশ্ব অর্থনীতি

আপডেট সময় : ০৯:৩৬:২৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৪ মার্চ ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা নতুন মোড় নেওয়ায় বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতি। কয়েক সপ্তাহের আপেক্ষিক স্বস্তি কাটিয়ে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা তীব্র হয়েছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়তে পারে, যা শেষ পর্যন্ত বৈশ্বিক অর্থনীতিকে মন্দার দিকে ঠেলে দেবে।

সাম্প্রতিক সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জ্বালানি সমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্য। বিশেষ করে কাতার ও সৌদি আরবের মতো শীর্ষ উৎপাদনকারী দেশগুলোর তেল-গ্যাস স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলার আশঙ্কা বাজারকে অস্থির করে তুলেছে। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ৩০ শতাংশ এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের ১৭ শতাংশ এই অঞ্চল থেকে আসে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো হরমোজ প্রণালি, যার মধ্য দিয়ে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবাহিত হয়। এই রুটটি কোনো কারণে বন্ধ হয়ে গেলে বা বাধাগ্রস্ত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানির দাম বাড়লে এর সরাসরি প্রভাব পড়ে পণ্য ও সেবার মূল্যে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো মূল্যস্ফীতি সামাল দিতে সুদের হার বাড়াতে বাধ্য হয়। এতে ঋণ গ্রহণ ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে ভোক্তা ব্যয় ও ব্যবসায়িক বিনিয়োগে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ কেনেথ এস রোগফ সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন, অনেকেই এই সংঘাতকে স্বল্পমেয়াদি মনে করলেও ইতিহাস ভিন্ন কথা বলে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের উদাহরণ টেনে তিনি জানান, অনিশ্চয়তার এই সময়ে পরিস্থিতি যেকোনো দিকে মোড় নিতে পারে।

যদিও বর্তমান প্রেক্ষাপট ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকটের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন, কারণ যুক্তরাষ্ট্র এখন বড় মাপের তেল উৎপাদনকারী দেশ এবং চীন ও ইউরোপ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। তবুও বিশ্ব অর্থনীতি এখনো খনিজ তেলের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। হরমোজ প্রণালি কয়েক সপ্তাহের জন্য অবরুদ্ধ থাকলেও সার ও পেট্রোকেমিক্যাল পণ্যের উৎপাদন ব্যাহত হবে। এর ফলে খাদ্য উৎপাদন খরচ বেড়ে গিয়ে দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকার সাব-সাহারান দেশগুলোতে খাদ্যনিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

এই সংকটে সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছে ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ার শিল্পোন্নত দেশগুলো। বিশেষ করে চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও জার্মানি আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তাদের উৎপাদন খাত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে অস্থিরতা লক্ষ্য করা গেছে। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ফলে ভারতের মতো উদীয়মান অর্থনীতিগুলোও বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়তে পারে।

বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিশ্ব অর্থনীতিকে বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে হলে দ্রুত কূটনৈতিক সমাধানের কোনো বিকল্প নেই। অন্যথায়, জ্বালানি সংকটের এই ঢেউ উন্নয়নশীল থেকে উন্নত—সব দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে তছনছ করে দিতে পারে।