ঢাকা ১১:৫৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬

৮০০ কোটির স্বপ্ন, সৃজনশীল অর্থনীতির সামনে কত বাধা?

কয়েক বছর আগেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক আদিবাসী শিক্ষার্থী হ্লাথোয়াইছা চাকের ভবিষ্যৎ নিয়ে তার পরিবারে ছিল অনিশ্চয়তা। গ্রাফিক ডিজাইন শিখে ফ্রিল্যান্সিং শুরু করার পর পরিবারের অনেকেই মনে করেছিলেন, এটি দিয়ে স্থায়ী জীবিকা গড়া সম্ভব নয়। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্টদের জন্য কাজ করে মাসে লক্ষাধিক টাকা আয় করতে শুরু করেন। পাশের বাড়ির তরুণেরা যখন চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, তখন তিনি নিজের দক্ষতা ও সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে বৈশ্বিক বাজারে জায়গা করে নিয়েছেন।

এই গল্পটি কেবল একজন তরুণের সাফল্যের গল্প নয়; বরং সৃজনশীল অর্থনীতির শক্তির একটি বাস্তব উদাহরণ। যে অর্থনীতির মূল সম্পদ কারখানা, জমি কিংবা প্রাকৃতিক সম্পদ নয়—বরং মানুষের চিন্তা, সৃজনশীলতা, সংস্কৃতি ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা।

বিশ্বব্যাপী সৃজনশীল অর্থনীতি এখন দ্রুত বিকাশমান একটি খাত। চলচ্চিত্র, সংগীত, সফটওয়্যার, ডিজিটাল কনটেন্ট, অ্যানিমেশন, গেমিং, ফ্যাশন, হস্তশিল্প, লোকজ সংস্কৃতি—সবকিছুই এর অন্তর্ভুক্ত। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে এ খাত থেকে প্রতিবছর দুই ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি হয় এবং কর্মসংস্থান হয় প্রায় পাঁচ কোটি মানুষের। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ নারী।

বাংলাদেশও এবার প্রথমবারের মতো জাতীয় বাজেটে সৃজনশীল অর্থনীতিকে আলাদা গুরুত্ব দিয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে খাতটির জন্য সরাসরি ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) তহবিল থেকে আরও ৫০০ কোটি টাকা যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। সব মিলিয়ে ৮০০ কোটি টাকার একটি বিশেষ তহবিল গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া পূর্বাচলে প্রায় ১৬০ একর জমিতে আন্তর্জাতিক মানের একটি ‘ক্রিয়েটিভ হাব’ নির্মাণ, বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে ছোট আকারের সৃজনশীল কেন্দ্র গড়ে তোলা, ‘ক্রিয়েটেড ইন বাংলাদেশ’ নামে একটি জাতীয় ব্র্যান্ড চালু করা এবং খাতটি পরিচালনার জন্য পৃথক কর্তৃপক্ষ গঠনের কথাও বলা হয়েছে।

সরকারের লক্ষ্য, আগামী বছরগুলোতে সৃজনশীল অর্থনীতির অবদান জিডিপির ১ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করা এবং অন্তত পাঁচ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা।

তবে প্রশ্ন হচ্ছে, এই লক্ষ্য কতটা বাস্তবসম্মত?

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সৃজনশীল অর্থনীতির অবদান দেশের মোট জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক ১৭ শতাংশ। টাকার অঙ্কে এর পরিমাণ প্রায় ৯ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। যদিও এ খাতের প্রবৃদ্ধির হার ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ, তবুও জিডিপিতে অবদানের দিক থেকে এটি এখনও খুবই ছোট।

তুলনামূলকভাবে ফিলিপাইনে সৃজনশীল অর্থনীতির অবদান ৭ দশমিক ৩ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ায় ৭ দশমিক ৮ শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্রে ৪ দশমিক ২ শতাংশ এবং ভারতে প্রায় আড়াই শতাংশ। সেই তুলনায় বাংলাদেশের সামনে পথ অনেক দীর্ঘ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বরাদ্দ বৃদ্ধি অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে শুধু অর্থ বরাদ্দ কিংবা বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণ করলেই সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশ নিশ্চিত হয় না।

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মেধাস্বত্বের সুরক্ষা। দেশে এখনও কপিরাইট লঙ্ঘন, পাইরেসি এবং আইডিয়া চুরির ঘটনা ব্যাপকভাবে ঘটে। একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা, সফটওয়্যার ডেভেলপার কিংবা কনটেন্ট নির্মাতা যদি তার সৃষ্টিকর্মের নিরাপত্তা নিয়ে আস্থাহীনতায় ভোগেন, তাহলে তিনি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে আগ্রহ হারাতে পারেন।

সৃজনশীল অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে মেধা। আর সেই মেধার সুরক্ষা নিশ্চিত না হলে অবকাঠামোগত উন্নয়নও কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।

অর্থায়নের ক্ষেত্রেও রয়েছে বড় সীমাবদ্ধতা। প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ঋণ পেতে সাধারণত স্থাবর সম্পদ বা দৃশ্যমান জামানত প্রয়োজন হয়। কিন্তু একজন সফটওয়্যার নির্মাতার সম্পদ তার কোড, একজন লেখকের সম্পদ তার পাণ্ডুলিপি কিংবা একজন নির্মাতার সম্পদ তার সৃজনশীল ধারণা। এসবকে এখনও আর্থিক সম্পদ হিসেবে মূল্যায়নের সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি।

ফলে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল, স্টার্টআপ তহবিল এবং ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগের সুযোগ না বাড়ালে সৃজনশীল খাতের উদ্যোক্তারা কাঙ্ক্ষিত অর্থায়ন পাবেন না।

দক্ষতার ঘাটতিও বড় সমস্যা। দেশে আন্তর্জাতিক মানের অ্যানিমেশন স্টুডিও, ডিজিটাল কনটেন্ট ল্যাব, চলচ্চিত্র প্রযুক্তি কেন্দ্র কিংবা গেম ডেভেলপমেন্ট অবকাঠামো এখনও সীমিত। অনেক তরুণ প্রতিভা থাকলেও তারা প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, মেন্টরশিপ ও বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ থেকে বঞ্চিত।

অন্যদিকে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিও এখনও পুরোপুরি পরিবর্তিত হয়নি। অনেক পরিবার এখনো সৃজনশীল পেশাকে স্থায়ী ক্যারিয়ার হিসেবে বিবেচনা করতে দ্বিধা করে। ফলে তরুণদের বড় একটি অংশ নিজেদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ হারায়।

তবে সম্ভাবনার জায়গাটিও কম নয়।

বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বড় ফ্রিল্যান্সিং জনশক্তির দেশ। গত এক দশকে এ খাতে কর্মসংস্থান বেড়েছে কয়েক গুণ। ইউটিউব, ডিজিটাল কনটেন্ট, অনলাইন শিক্ষা, গেমিং এবং ডিজাইনভিত্তিক কাজের বাজারও দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে।

একই সঙ্গে দেশের ঐতিহ্যবাহী পণ্য—টাঙ্গাইলের শাড়ি, রাজশাহীর সিল্ক, কুমিল্লার খাদি, নকশিকাঁথা, শীতলপাটি কিংবা লোকজ শিল্প—আধুনিক ব্র্যান্ডিং ও ডিজিটাল বিপণনের মাধ্যমে বৈশ্বিক বাজারে আরও বড় অবস্থান তৈরি করতে পারে।

নারীদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও সৃজনশীল অর্থনীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ এ খাতের অনেক কাজ ঘরে বসেই করা সম্ভব। ডিজিটাল প্রশিক্ষণ, সহজ ঋণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে হাজার হাজার নারী উদ্যোক্তা তৈরি হতে পারেন।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা দেখায়, সৃজনশীল অর্থনীতির সফলতা শুধু বাজেট বরাদ্দের ওপর নির্ভর করে না। যুক্তরাজ্য, জাপান কিংবা দক্ষিণ কোরিয়া তাদের সংস্কৃতি, সৃজনশীলতা ও মেধাকে রাষ্ট্রীয় কৌশলের অংশে পরিণত করেছে। ফলে সৃজনশীল শিল্প তাদের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাতে রূপ নিয়েছে।

বাংলাদেশও সেই পথে এগোতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, কার্যকর বাস্তবায়ন, মেধাস্বত্বের কঠোর সুরক্ষা, আধুনিক অর্থায়ন ব্যবস্থা, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি সৃজনশীল পণ্যের শক্তিশালী ব্র্যান্ডিং।

৮০০ কোটি টাকার বাজেট তাই নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা। কিন্তু এই উদ্যোগের প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে ঘোষণাগুলো কতটা বাস্তবে রূপ পায় তার ওপর। অন্যথায় সৃজনশীল অর্থনীতির এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনাও হয়তো কাগজের পাতাতেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

গুম ও নির্যাতনের অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী হাসিনাসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে আজ পঞ্চম সাক্ষীর জবানবন্দি

৮০০ কোটির স্বপ্ন, সৃজনশীল অর্থনীতির সামনে কত বাধা?

আপডেট সময় : ১০:২২:০০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬

কয়েক বছর আগেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক আদিবাসী শিক্ষার্থী হ্লাথোয়াইছা চাকের ভবিষ্যৎ নিয়ে তার পরিবারে ছিল অনিশ্চয়তা। গ্রাফিক ডিজাইন শিখে ফ্রিল্যান্সিং শুরু করার পর পরিবারের অনেকেই মনে করেছিলেন, এটি দিয়ে স্থায়ী জীবিকা গড়া সম্ভব নয়। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্টদের জন্য কাজ করে মাসে লক্ষাধিক টাকা আয় করতে শুরু করেন। পাশের বাড়ির তরুণেরা যখন চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, তখন তিনি নিজের দক্ষতা ও সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে বৈশ্বিক বাজারে জায়গা করে নিয়েছেন।

এই গল্পটি কেবল একজন তরুণের সাফল্যের গল্প নয়; বরং সৃজনশীল অর্থনীতির শক্তির একটি বাস্তব উদাহরণ। যে অর্থনীতির মূল সম্পদ কারখানা, জমি কিংবা প্রাকৃতিক সম্পদ নয়—বরং মানুষের চিন্তা, সৃজনশীলতা, সংস্কৃতি ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা।

বিশ্বব্যাপী সৃজনশীল অর্থনীতি এখন দ্রুত বিকাশমান একটি খাত। চলচ্চিত্র, সংগীত, সফটওয়্যার, ডিজিটাল কনটেন্ট, অ্যানিমেশন, গেমিং, ফ্যাশন, হস্তশিল্প, লোকজ সংস্কৃতি—সবকিছুই এর অন্তর্ভুক্ত। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে এ খাত থেকে প্রতিবছর দুই ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি হয় এবং কর্মসংস্থান হয় প্রায় পাঁচ কোটি মানুষের। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ নারী।

বাংলাদেশও এবার প্রথমবারের মতো জাতীয় বাজেটে সৃজনশীল অর্থনীতিকে আলাদা গুরুত্ব দিয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে খাতটির জন্য সরাসরি ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) তহবিল থেকে আরও ৫০০ কোটি টাকা যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। সব মিলিয়ে ৮০০ কোটি টাকার একটি বিশেষ তহবিল গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া পূর্বাচলে প্রায় ১৬০ একর জমিতে আন্তর্জাতিক মানের একটি ‘ক্রিয়েটিভ হাব’ নির্মাণ, বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে ছোট আকারের সৃজনশীল কেন্দ্র গড়ে তোলা, ‘ক্রিয়েটেড ইন বাংলাদেশ’ নামে একটি জাতীয় ব্র্যান্ড চালু করা এবং খাতটি পরিচালনার জন্য পৃথক কর্তৃপক্ষ গঠনের কথাও বলা হয়েছে।

সরকারের লক্ষ্য, আগামী বছরগুলোতে সৃজনশীল অর্থনীতির অবদান জিডিপির ১ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করা এবং অন্তত পাঁচ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা।

তবে প্রশ্ন হচ্ছে, এই লক্ষ্য কতটা বাস্তবসম্মত?

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সৃজনশীল অর্থনীতির অবদান দেশের মোট জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক ১৭ শতাংশ। টাকার অঙ্কে এর পরিমাণ প্রায় ৯ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। যদিও এ খাতের প্রবৃদ্ধির হার ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ, তবুও জিডিপিতে অবদানের দিক থেকে এটি এখনও খুবই ছোট।

তুলনামূলকভাবে ফিলিপাইনে সৃজনশীল অর্থনীতির অবদান ৭ দশমিক ৩ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ায় ৭ দশমিক ৮ শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্রে ৪ দশমিক ২ শতাংশ এবং ভারতে প্রায় আড়াই শতাংশ। সেই তুলনায় বাংলাদেশের সামনে পথ অনেক দীর্ঘ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বরাদ্দ বৃদ্ধি অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে শুধু অর্থ বরাদ্দ কিংবা বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণ করলেই সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশ নিশ্চিত হয় না।

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মেধাস্বত্বের সুরক্ষা। দেশে এখনও কপিরাইট লঙ্ঘন, পাইরেসি এবং আইডিয়া চুরির ঘটনা ব্যাপকভাবে ঘটে। একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা, সফটওয়্যার ডেভেলপার কিংবা কনটেন্ট নির্মাতা যদি তার সৃষ্টিকর্মের নিরাপত্তা নিয়ে আস্থাহীনতায় ভোগেন, তাহলে তিনি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে আগ্রহ হারাতে পারেন।

সৃজনশীল অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে মেধা। আর সেই মেধার সুরক্ষা নিশ্চিত না হলে অবকাঠামোগত উন্নয়নও কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।

অর্থায়নের ক্ষেত্রেও রয়েছে বড় সীমাবদ্ধতা। প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ঋণ পেতে সাধারণত স্থাবর সম্পদ বা দৃশ্যমান জামানত প্রয়োজন হয়। কিন্তু একজন সফটওয়্যার নির্মাতার সম্পদ তার কোড, একজন লেখকের সম্পদ তার পাণ্ডুলিপি কিংবা একজন নির্মাতার সম্পদ তার সৃজনশীল ধারণা। এসবকে এখনও আর্থিক সম্পদ হিসেবে মূল্যায়নের সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি।

ফলে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল, স্টার্টআপ তহবিল এবং ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগের সুযোগ না বাড়ালে সৃজনশীল খাতের উদ্যোক্তারা কাঙ্ক্ষিত অর্থায়ন পাবেন না।

দক্ষতার ঘাটতিও বড় সমস্যা। দেশে আন্তর্জাতিক মানের অ্যানিমেশন স্টুডিও, ডিজিটাল কনটেন্ট ল্যাব, চলচ্চিত্র প্রযুক্তি কেন্দ্র কিংবা গেম ডেভেলপমেন্ট অবকাঠামো এখনও সীমিত। অনেক তরুণ প্রতিভা থাকলেও তারা প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, মেন্টরশিপ ও বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ থেকে বঞ্চিত।

অন্যদিকে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিও এখনও পুরোপুরি পরিবর্তিত হয়নি। অনেক পরিবার এখনো সৃজনশীল পেশাকে স্থায়ী ক্যারিয়ার হিসেবে বিবেচনা করতে দ্বিধা করে। ফলে তরুণদের বড় একটি অংশ নিজেদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ হারায়।

তবে সম্ভাবনার জায়গাটিও কম নয়।

বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বড় ফ্রিল্যান্সিং জনশক্তির দেশ। গত এক দশকে এ খাতে কর্মসংস্থান বেড়েছে কয়েক গুণ। ইউটিউব, ডিজিটাল কনটেন্ট, অনলাইন শিক্ষা, গেমিং এবং ডিজাইনভিত্তিক কাজের বাজারও দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে।

একই সঙ্গে দেশের ঐতিহ্যবাহী পণ্য—টাঙ্গাইলের শাড়ি, রাজশাহীর সিল্ক, কুমিল্লার খাদি, নকশিকাঁথা, শীতলপাটি কিংবা লোকজ শিল্প—আধুনিক ব্র্যান্ডিং ও ডিজিটাল বিপণনের মাধ্যমে বৈশ্বিক বাজারে আরও বড় অবস্থান তৈরি করতে পারে।

নারীদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও সৃজনশীল অর্থনীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ এ খাতের অনেক কাজ ঘরে বসেই করা সম্ভব। ডিজিটাল প্রশিক্ষণ, সহজ ঋণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে হাজার হাজার নারী উদ্যোক্তা তৈরি হতে পারেন।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা দেখায়, সৃজনশীল অর্থনীতির সফলতা শুধু বাজেট বরাদ্দের ওপর নির্ভর করে না। যুক্তরাজ্য, জাপান কিংবা দক্ষিণ কোরিয়া তাদের সংস্কৃতি, সৃজনশীলতা ও মেধাকে রাষ্ট্রীয় কৌশলের অংশে পরিণত করেছে। ফলে সৃজনশীল শিল্প তাদের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাতে রূপ নিয়েছে।

বাংলাদেশও সেই পথে এগোতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, কার্যকর বাস্তবায়ন, মেধাস্বত্বের কঠোর সুরক্ষা, আধুনিক অর্থায়ন ব্যবস্থা, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি সৃজনশীল পণ্যের শক্তিশালী ব্র্যান্ডিং।

৮০০ কোটি টাকার বাজেট তাই নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা। কিন্তু এই উদ্যোগের প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে ঘোষণাগুলো কতটা বাস্তবে রূপ পায় তার ওপর। অন্যথায় সৃজনশীল অর্থনীতির এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনাও হয়তো কাগজের পাতাতেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।