একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হলেও, দেশজুড়ে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা থামছে না। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে, যা জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এসব ঘটনার বিচার দাবিতে বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ-সমাবেশ অব্যাহত রয়েছে।
জীবননগর (চুয়াডাঙ্গা):
চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার হাসাদাহ এলাকায় বিএনপি-জামায়াতের সংঘর্ষে এক জামায়াত নেতার মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বিক্ষোভ মিছিল করেছে। গতকাল রোববার সকালে উপজেলা জামায়াতের কার্যালয় থেকে শুরু হওয়া মিছিলটি শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে বাসস্ট্যান্ডে এক সংক্ষিপ্ত সমাবেশে মিলিত হয়। সমাবেশে বক্তারা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের অবিলম্বে গ্রেপ্তারের দাবি জানান এবং আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার না হলে কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সুটিয়া গ্রামের জামায়াত সমর্থক সোহাগের সঙ্গে হাসাদাহ ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা মেহেদীর পূর্ব বিরোধ ছিল। এ বিরোধ মীমাংসার জন্য শনিবার রাতে হাসাদাহ বাজারে উভয় পক্ষের বৈঠকের কথা থাকলেও, সন্ধ্যার দিকে কথা কাটাকাটি থেকে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। সংঘর্ষে সুটিয়া গ্রামের বাসিন্দা ও বাঁকা ইউনিয়ন জামায়াতের আমির মফিজুর রহমানসহ বেশ কয়েকজন আহত হন। আহতদের মধ্যে মফিজুর রহমান চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। অন্যদিকে, সংঘর্ষে মেহেদী হাসান, তার বাবা জসিম উদ্দিন এবং তৌফিক হোসেন আহত হয়েছেন। মফিজুর রহমানের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে এবং তার জানাজা গ্রামের বাড়িতে অনুষ্ঠিত হয়েছে। জীবননগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ঘটনার তদন্ত চলছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
বাগেরহাট:
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হলেও, বাগেরহাট জেলা এখন রাজনৈতিক অস্থিরতায় জর্জরিত। নির্বাচনের পর থেকেই জেলার বিভিন্ন স্থানে বিএনপি, জামায়াত এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। আধিপত্য বিস্তার, মৎস্য ঘের দখল এবং দলীয় কোন্দলকে কেন্দ্র করে জেলার প্রতিটি উপজেলা উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। গত ১৩ ফেব্রুয়ারি বাগেরহাট সদর উপজেলার গোটাপাড়া ইউনিয়নে স্বতন্ত্র ও বিএনপি প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে ওসমান গনি সরদার নামে একজন নিহত হন। এই ঘটনায় বিএনপি নেতাকর্মীদের আসামি করে সদর মডেল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। এছাড়া, সদর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে বিএনপি ও জামায়াত সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন।
রামপালে মৎস্য ঘের দখলকে কেন্দ্র করে বিএনপির দুই গ্রুপের অভ্যন্তরীণ কোন্দল চরমে পৌঁছেছে। প্রতিপক্ষের হামলায় শহীদ শেখ নামে এক স্থানীয় বিএনপি নেতা গুরুতর আহত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এই ঘটনায় ১৩ জনের নাম উল্লেখ করে রামপাল থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। অন্যদিকে, গত ২৪শে ফেব্রুয়ারি রামপালের ভোজপড়িয়া ইউনিয়নে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ইউনিয়ন বিএনপি সভাপতি আল আমিন গ্রুপ ও প্রিন্স গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে নারীসহ ছয়জন আহত হয়েছেন।
কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ):
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে বিএনপির প্রার্থী রাশেদ খানের কার্যালয়ে দুপক্ষের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শুক্রবার সকালে রাশেদ খানের কার্যালয়ে বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে সংর্ঘষ ও মারধরের ঘটনা ঘটে। এ সময় দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের ওপরও হামলা করা হয়। এতে কালীগঞ্জ থানার তিনজন পুলিশ সদস্য আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এই ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সোনারগাঁ (নারায়ণগঞ্জ):
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে পরাজিত স্বতন্ত্র প্রার্থী মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিনের কর্মী যুবদল নেতা আশরাফ প্রধানসহ তিন বাড়িতে গত শুক্রবার রাতে পিরোজপুর ইউনিয়নের প্রতাপের চর এলাকায় হামলার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ সময় ঘরবাড়ি, দোকান, গাড়ি ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ তোলা হয়। হামলায় তিনজন আহত হয়েছেন, যাদের সোনারগাঁ উপজেলা হাসপাতালসহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এদিকে, সোনারগাঁ উপজেলা যুবদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আশরাফ প্রধান তার নিরাপত্তা চেয়ে গত শনিবার প্রতাপের চর এলাকায় এক সংবাদ সম্মেলন করেছেন।
মুক্তাগাছা (ময়মনসিংহ):
ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুপক্ষের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় পাঁচ পুলিশ সদস্যসহ উভয় পক্ষের ১৫ জন আহত হয়েছেন। শনিবার ইফতারের আগে থেকে শুরু হওয়া এই সংঘর্ষের সময় দুপক্ষের লোকজন লাঠিসোঁটা ও দেশি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ১২টি দোকান ভাঙচুর করে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। উভয় পক্ষের ইট-পাটকেলের আঘাতে পুলিশ সদস্যসহ ১৫ জন আহত হন।
নলডাঙ্গা (নাটোর):
নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলায় যুবদলের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় সাংগঠনিক ব্যবস্থা হিসেবে দুই যুবদল নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। গত শুক্রবার সংঘটিত সহিংস ঘটনার পর দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। উপজেলার পিঁপরুল ইউনিয়নের বাঁশভাগ পূর্বপাড়া এলাকায় পূর্ববিরোধের জেরে যুবদলের দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটে, যাতে অন্তত ছয়জন আহত হন।
কেশবপুর (যশোর):
যশোরের কেশবপুর স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা মিন্টু রহমান জিকোকে শহর থেকে তুলে নিয়ে মারপিটসহ তার কাছ থেকে সাড়ে ২৭ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শেখ সহীদসহ তিনজনের বিরুদ্ধে কেশবপুর থানায় অভিযোগ করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, তদন্ত শেষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চাটমোহর (পাবনা):
হাটের টেন্ডার শিডিউল দাখিল এবং ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে হামলা-মারপিটের ঘটনায় পাবনার চাটমোহরে বিএনপি ও জামায়াত পাল্টাপাল্টি মামলা দায়ের করেছে। এতে দুই দলের ৩১ জন নেতাকর্মী আসামি হয়েছেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে চাটমোহরের রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
রিপোর্টারের নাম 





















