ঢাকা ১১:৪২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬

ফসলরক্ষা বাঁধের কাজ শেষ না হওয়ায় সুনামগঞ্জের কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ

নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও সুনামগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারের কাজ এখনো আশানুরূপ শেষ হয়নি। ফলে আসন্ন বোরো মৌসুমের ফসল নিয়ে গভীর উদ্বেগ ও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় কৃষকরা। নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি বছর ১৫ ডিসেম্বর থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে এই বাঁধগুলোর কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও, মেয়াদের শেষ দিন পর্যন্ত মাত্র ৭৮ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে, কর্তৃপক্ষ আরও ১৫ দিনের সময় বৃদ্ধির আবেদন করেছে। তবে মাঠ পর্যায়ের চিত্র ভিন্ন বলে অভিযোগ উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পাউবো এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয়হীনতা, প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি গঠন ও অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রিতা এবং বিল পরিশোধ সংক্রান্ত জটিলতা কাজের গতিকে বাধাগ্রস্ত করেছে। এছাড়াও, কিছু ক্ষেত্রে নীতিমালা উপেক্ষা করে এবং প্রয়োজনীয় গণশুনানি ছাড়াই প্রকল্প অনুমোদনের অভিযোগও উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অক্ষত বা কম ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলোতে অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যেখানে জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার প্রয়োজন এমন প্রকল্পগুলোতে অর্থ বরাদ্দ কম পড়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের দেওয়া তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে জেলার ৫৩টি হাওরে মোট ৬০২ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণের জন্য ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭০২টি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। পাউবোর দাবি অনুযায়ী, মাটির কাজের প্রায় ৭৮ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। তবে, সরেজমিনে বিভিন্ন হাওর পরিদর্শনে দেখা গেছে যে, অনেক প্রকল্পেই কাজ অত্যন্ত ধীরগতিতে চলছে, কোথাও কোথাও অর্ধেক কাজও শেষ হয়নি। জেলার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ক্লোজার এখনো অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। সুনামগঞ্জের দিরাই, শাল্লা, তাহিরপুর, জগন্নাথপুর, জামালগঞ্জ এবং শান্তিগঞ্জ উপজেলার একাধিক হাওরে একই ধরনের চিত্র লক্ষ্য করা গেছে।

তাহিরপুর উপজেলার মাঠিয়ান হাওরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, আলমখালী বাঁধ নির্মাণে কিছু মাটি ফেলে রাখা হয়েছে মাত্র। বাঁধে কোনো প্রকল্পের সাইনবোর্ড নেই এবং কাজ বন্ধ রয়েছে। স্থানীয় কৃষক নুর আলম জানান, এই বাঁধের উপর মাঠিয়ান হাওরের শত শত একর জমির ফসল নির্ভর করে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এই বাঁধটির প্রতি অবহেলা করা হচ্ছে। সময়মতো এবং সঠিকভাবে কাজ সম্পন্ন না হলে, যেকোনো সময় পাহাড়ি ঢল নেমে আসলে ফসল তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তাহিরপুর উপজেলার পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মনির হোসেন জানান, এই বাঁধের কাজটি কেউ নিতে আগ্রহী হচ্ছিল না। সম্প্রতি একজনকে কাজ দেওয়া হয়েছে। তবে মাটি সংকটের কারণে কাজ কিছুটা আটকে আছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, দ্রুততম সময়ে কাজটি সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।

স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, কাগজে-কলমে কাজের অগ্রগতি দেখানো হলেও, বাস্তবে কাজের গতি সন্তোষজনক নয়। এই ধীরগতির কারণে আগাম বৃষ্টি বা আকস্মিক বন্যায় বোরো ফসলের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এদিকে, সুনামগঞ্জ হাওর বাঁচাও আন্দোলন, সুনামগঞ্জ পরিবেশ ও নদী রক্ষা আন্দোলন এবং জন উদ্যোগের মতো বিভিন্ন সংগঠন হাওর পরিদর্শন করে কাজে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছে। তাদের দাবি, দ্রুত ও স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ শেষ না হলে, হাওরের বোরো ফসল মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে।

পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, নির্বাচনজনিত কারণে বাঁধের কাজের কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। তবে, বর্ধিত সময়সীমার মধ্যেই কাজ শেষ করার সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে।

সুনামগঞ্জের বোরো ফসল সম্পূর্ণভাবে ফসলরক্ষা বাঁধের উপর নির্ভরশীল। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ ক্রমশ বাড়ছে। সময়মতো কাজ সম্পন্ন না হলে, আগাম বন্যায় ব্যাপক ফসলহানির আশঙ্কা করছেন তারা।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরান-ইসরাইল সংঘাত: ইসরাইলের দাবি, আকাশপথে ২০০০টির বেশি বোমা বর্ষণ

ফসলরক্ষা বাঁধের কাজ শেষ না হওয়ায় সুনামগঞ্জের কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ

আপডেট সময় : ০৯:৫৬:৫৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২ মার্চ ২০২৬

নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও সুনামগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারের কাজ এখনো আশানুরূপ শেষ হয়নি। ফলে আসন্ন বোরো মৌসুমের ফসল নিয়ে গভীর উদ্বেগ ও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় কৃষকরা। নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি বছর ১৫ ডিসেম্বর থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে এই বাঁধগুলোর কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও, মেয়াদের শেষ দিন পর্যন্ত মাত্র ৭৮ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে, কর্তৃপক্ষ আরও ১৫ দিনের সময় বৃদ্ধির আবেদন করেছে। তবে মাঠ পর্যায়ের চিত্র ভিন্ন বলে অভিযোগ উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পাউবো এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয়হীনতা, প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি গঠন ও অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রিতা এবং বিল পরিশোধ সংক্রান্ত জটিলতা কাজের গতিকে বাধাগ্রস্ত করেছে। এছাড়াও, কিছু ক্ষেত্রে নীতিমালা উপেক্ষা করে এবং প্রয়োজনীয় গণশুনানি ছাড়াই প্রকল্প অনুমোদনের অভিযোগও উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অক্ষত বা কম ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলোতে অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যেখানে জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার প্রয়োজন এমন প্রকল্পগুলোতে অর্থ বরাদ্দ কম পড়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের দেওয়া তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে জেলার ৫৩টি হাওরে মোট ৬০২ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণের জন্য ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭০২টি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। পাউবোর দাবি অনুযায়ী, মাটির কাজের প্রায় ৭৮ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। তবে, সরেজমিনে বিভিন্ন হাওর পরিদর্শনে দেখা গেছে যে, অনেক প্রকল্পেই কাজ অত্যন্ত ধীরগতিতে চলছে, কোথাও কোথাও অর্ধেক কাজও শেষ হয়নি। জেলার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ক্লোজার এখনো অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। সুনামগঞ্জের দিরাই, শাল্লা, তাহিরপুর, জগন্নাথপুর, জামালগঞ্জ এবং শান্তিগঞ্জ উপজেলার একাধিক হাওরে একই ধরনের চিত্র লক্ষ্য করা গেছে।

তাহিরপুর উপজেলার মাঠিয়ান হাওরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, আলমখালী বাঁধ নির্মাণে কিছু মাটি ফেলে রাখা হয়েছে মাত্র। বাঁধে কোনো প্রকল্পের সাইনবোর্ড নেই এবং কাজ বন্ধ রয়েছে। স্থানীয় কৃষক নুর আলম জানান, এই বাঁধের উপর মাঠিয়ান হাওরের শত শত একর জমির ফসল নির্ভর করে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এই বাঁধটির প্রতি অবহেলা করা হচ্ছে। সময়মতো এবং সঠিকভাবে কাজ সম্পন্ন না হলে, যেকোনো সময় পাহাড়ি ঢল নেমে আসলে ফসল তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তাহিরপুর উপজেলার পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মনির হোসেন জানান, এই বাঁধের কাজটি কেউ নিতে আগ্রহী হচ্ছিল না। সম্প্রতি একজনকে কাজ দেওয়া হয়েছে। তবে মাটি সংকটের কারণে কাজ কিছুটা আটকে আছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, দ্রুততম সময়ে কাজটি সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।

স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, কাগজে-কলমে কাজের অগ্রগতি দেখানো হলেও, বাস্তবে কাজের গতি সন্তোষজনক নয়। এই ধীরগতির কারণে আগাম বৃষ্টি বা আকস্মিক বন্যায় বোরো ফসলের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এদিকে, সুনামগঞ্জ হাওর বাঁচাও আন্দোলন, সুনামগঞ্জ পরিবেশ ও নদী রক্ষা আন্দোলন এবং জন উদ্যোগের মতো বিভিন্ন সংগঠন হাওর পরিদর্শন করে কাজে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছে। তাদের দাবি, দ্রুত ও স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ শেষ না হলে, হাওরের বোরো ফসল মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে।

পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, নির্বাচনজনিত কারণে বাঁধের কাজের কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। তবে, বর্ধিত সময়সীমার মধ্যেই কাজ শেষ করার সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে।

সুনামগঞ্জের বোরো ফসল সম্পূর্ণভাবে ফসলরক্ষা বাঁধের উপর নির্ভরশীল। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ ক্রমশ বাড়ছে। সময়মতো কাজ সম্পন্ন না হলে, আগাম বন্যায় ব্যাপক ফসলহানির আশঙ্কা করছেন তারা।