ইসরাইলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এবং শীর্ষ কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তার মৃত্যুর ঘটনায় রাজধানী ঢাকায় তীব্র প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল রোববার, বিভিন্ন ইসলামি দল বিচ্ছিন্নভাবে আয়োজিত কর্মসূচিতে এই হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানায় এবং মুসলিম বিশ্বে চলমান হামলা বন্ধের দাবি জানায়।
খামেনি হত্যাকাণ্ড ও জামায়াতের প্রতিবাদ:
ইরানে সংঘটিত এই “ন্যাক্কারজনক হামলা” এবং দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাদের হত্যার প্রতিবাদে জামায়াতে ইসলামী রাজধানীতে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল করেছে। গতকাল বিকেলে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের উত্তর গেটে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ জামায়াতের উদ্যোগে এই কর্মসূচি পালিত হয়।
সমাবেশে জামায়াতের নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলাম এমপি বলেন, “ইরানের অগ্রযাত্রাকে সহ্য করতে না পেরেই দীর্ঘদিনের ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতায় এই হামলা করা হয়েছে।” তিনি বলেন, “এ হামলা কেবল ইরান বা মুসলমানদের বিরুদ্ধে নয়; বরং এটি সার্বভৌম দেশ, গণতান্ত্রিক সরকার ও মানবতার বিরুদ্ধে একটি স্পষ্ট আঘাত।” তিনি উল্লেখ করেন যে অতীতে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও ইরানের অগ্রগতি থামানো যায়নি এবং ভবিষ্যতেও তা থামানো যাবে না।
এটিএম আজহার বৈশ্বিক শক্তিগুলোকে এই হামলার বিরুদ্ধে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “ওআইসি ও জাতিসংঘ তাদের যথাযথ ভূমিকা পালন করছে না। অবিলম্বে তারা তাদের দায়িত্ব পালন না করলে বিশ্ব জনগণ তাদের প্রত্যাখ্যান করবে।” তিনি ইরানসহ মুসলিম বিশ্বে ইসরাইলি হামলা বন্ধের আহ্বান জানান এবং ইসরাইলি পণ্য বর্জনসহ দেশটির বিরুদ্ধে মুসলিম বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।
দলটির ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখার আমির নূরুল ইসলাম বুলবুলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মতিউর রহমান আকন্দ, ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির সেলিম উদ্দিন, দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি এবং উত্তরের সেক্রেটারি ড. রেজাউল করিম প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। সমাবেশ শেষে একটি বিক্ষোভ মিছিল পল্টন ও কাকরাইল মোড় প্রদক্ষিণ করে শান্তিনগরে গিয়ে শেষ হয়।
বিভিন্ন দলের নিন্দা ও শোক প্রকাশ:
ইরানে এই হামলার প্রতিবাদে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, বাংলাদেশ লেবার পার্টি, ইসলামী ছাত্রশিবির, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, এবং আন্তর্জাতিক মজলিসে তাহাফফুজে খতমে নবুওয়াত বাংলাদেশও পৃথক পৃথক বিবৃতিতে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক ও মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ যৌথ বিবৃতিতে বলেন, ইরান একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ। সে দেশের প্রধান ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে হত্যা করা “প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক আইন ও আন্তর্জাতিক নিয়মনীতির প্রতি স্পষ্ট অবজ্ঞা”।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির ও চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম বলেন, ইরানের প্রধান ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে নিজ বাসভবনে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে হত্যা করা “প্রতিষ্ঠিত বিশ্বব্যবস্থার প্রতি স্পষ্ট উপেক্ষা ও আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন”।
জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সভাপতি শাইখুল হাদিস মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক ও মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী বিবৃতিতে বলেন, ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যা “আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এবং জাতিসংঘ সনদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন”।
বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির আমির আল্লামা সরওয়ার কামাল আজিজি ও মহাসচিব মাওলানা মুসা বিন ইযহার যৌথ বিবৃতিতে বলেন, ইরানের সার্বভৌমত্বের ওপর এই আগ্রাসন “আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার এবং রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক সম্মানের নীতির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন”।
আন্তর্জাতিক মজলিসে তাহাফফুজে খতমে নবুওয়াত বাংলাদেশের মহাসচিব শাইখুল হাদিস আল্লামা মহিউদ্দিন রাব্বানী বিবৃতিতে বলেন, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও ইসরাইলি হিংস্রতার এই তাণ্ডব কেবল একটি ভৌগোলিক যুদ্ধ নয়, বরং এটি “ইসলামি সভ্যতা ও মুসলিম উম্মাহর সার্বভৌমত্বের ওপর সুগভীর আঘাত”।
জামায়াত আমিরের শোকবার্তা:
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন জামায়াত আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিরতা ইতোমধ্যেই আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। এ পরিস্থিতি যদি আরো সামরিক উত্তেজনার দিকে যায়, তবে তা শুধু একটি দেশের নয়; পুরো অঞ্চলের জন্য ভয়াবহ পরিণতি বয়ে আনতে পারে।” তিনি যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও ইরানসহ সংশ্লিষ্ট সবপক্ষের প্রতি অবিলম্বে সামরিক পদক্ষেপ বন্ধ করে কূটনৈতিক সমাধানের পথে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। তিনি বিশ্বশান্তি রক্ষায় জাতিসংঘ ও বিশ্বনেতাদের কার্যকর ভূমিকা পালনেরও আহ্বান জানান।
সার্বজনীন দাবি:
প্রতিবাদকারী দলগুলো জাতিসংঘ ও ওআইসির মতো আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর কার্যকর ভূমিকা পালনের দাবি জানায়। তারা মুসলিম বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার এবং এ ধরনের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান। এছাড়াও, আসন্ন সংসদ অধিবেশনে ইরানে হামলা ও খামেনির মৃত্যুর ঘটনায় নিন্দা ও শোক প্রস্তাব আনার দাবি জানানো হয়।
রিপোর্টারের নাম 
























