ঢাকা ০৩:০৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

পুলিশের মারধর ও তল্লাশি: আইন কী বলে?

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১২:৪৭:৪৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ০ বার পড়া হয়েছে

রাজধানীর ধানমন্ডি লেক ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মাদকবিরোধী অভিযানের নামে সাধারণ শিক্ষার্থী, পথচারী এবং বিনোদনপ্রেমীদের জেরা, তল্লাশি ও লাঠিপেটার ঘটনা সম্প্রতি ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা গেছে, পুলিশ সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই নাগরিকদের পকেট, মানিব্যাগ এবং ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন চেক করছে। এমনকি এক শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় শারীরিক নির্যাতনের ঘটনাও ঘটেছে। মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবীরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, বাংলাদেশের কোনো আইনই পুলিশকে সাধারণ মানুষকে মারধরের অধিকার দেয়নি।

জিজ্ঞাসাবাদ ও তল্লাশির আইনি সীমাবদ্ধতা পুলিশ আইন ১৮৬১-এর ২৩ ধারা এবং ফৌজদারি কার্যবিধির (সিআরপিসি) ১৬১ ধারা অনুযায়ী, অপরাধ প্রতিরোধে পুলিশ যে কাউকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে। তবে এই ক্ষমতার একটি স্পষ্ট সীমারেখা রয়েছে। পুলিশ আপনার পরিচয় বা গন্তব্য জানতে চাইলে আপনি উত্তর দিতে পারেন, কিন্তু এমন কোনো উত্তর দিতে আপনি বাধ্য নন যা আপনাকে কোনো অপরাধে ফাঁসিয়ে দিতে পারে। অর্থাৎ, নিজেকে দোষী সাব্যস্ত করার বিরুদ্ধে আপনার পূর্ণ আইনি সুরক্ষা রয়েছে।

তল্লাশির ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির ১০৩ ধারা অনুযায়ী প্রক্রিয়াটি হতে হবে স্বচ্ছ। কোনো ব্যক্তিকে তল্লাশির সময় স্থানীয় অন্তত দুজন গণ্যমান্য ব্যক্তিকে সাক্ষী হিসেবে রাখা বাধ্যতামূলক। সাম্প্রতিক অভিযানে পুলিশকে একাকী তল্লাশি চালাতে দেখা গেছে, যা আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এছাড়া ৫২ ধারা অনুযায়ী, কোনো নারীকে তল্লাশি করতে হলে অবশ্যই নারী পুলিশ সদস্যের উপস্থিতি প্রয়োজন; পুরুষ পুলিশের কোনো নারীর দেহ স্পর্শ করার এখতিয়ার নেই।

ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মোবাইল ফোন চেক বর্তমানে পুলিশের হাতে হেনস্তার বড় মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে মোবাইল ফোন চেক করা। অথচ বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৩(খ) অনুচ্ছেদ প্রত্যেক নাগরিকের চিঠিপত্র ও যোগাযোগের গোপনীয়তা রক্ষার গ্যারান্টি দিয়েছে। কোনো সুনির্দিষ্ট মামলা বা আদালতের নির্দেশ ছাড়া পুলিশ কারও ফোন চেক করতে পারে না। সাইবার নিরাপত্তা আইন-২০২৩ বা অন্য কোনো আইনেও পুলিশকে রাস্তাঘাটে সাধারণ মানুষের ফোন ‘র‍্যান্ডম চেক’ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী, তদন্তের প্রয়োজনে ডিভাইস জব্দ করতে হলেও সুনির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।

মারধর ও নির্যাতন: আইনের চোখে দণ্ডনীয় অপরাধ নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩ অনুযায়ী পুলিশি হেফাজতে বা অভিযানে কাউকে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করা একটি ভয়াবহ ফৌজদারি অপরাধ। ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৬ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে গ্রেফতারের সময় কেবল পালিয়ে যাওয়া ঠেকাতে যতটুকু প্রয়োজন, তার বেশি বলপ্রয়োগ করা যাবে না। অর্থাৎ, কেউ যদি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে, তবে তাকে চড়-থাপ্পড় বা লাঠিপেটা করা সম্পূর্ণ বেআইনি। কোনো কর্মকর্তার নির্যাতনে মৃত্যু হলে তার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।

আইনজীবীদের মতে, পুলিশের মূল দায়িত্ব জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিছু সদস্যের বিতর্কিত ও বেআইনি কর্মকাণ্ড পুরো বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করছে। আইনের শাসনের স্বার্থে পুলিশের পেশাগত আচরণে জবাবদিহি এবং মানবাধিকার সচেতনতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

জেনেভা বৈঠকের আগে ইউক্রেনে রাশিয়ার ব্যাপক হামলা, শিশুসহ আহত ২৩

পুলিশের মারধর ও তল্লাশি: আইন কী বলে?

আপডেট সময় : ১২:৪৭:৪৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

রাজধানীর ধানমন্ডি লেক ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মাদকবিরোধী অভিযানের নামে সাধারণ শিক্ষার্থী, পথচারী এবং বিনোদনপ্রেমীদের জেরা, তল্লাশি ও লাঠিপেটার ঘটনা সম্প্রতি ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা গেছে, পুলিশ সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই নাগরিকদের পকেট, মানিব্যাগ এবং ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন চেক করছে। এমনকি এক শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় শারীরিক নির্যাতনের ঘটনাও ঘটেছে। মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবীরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, বাংলাদেশের কোনো আইনই পুলিশকে সাধারণ মানুষকে মারধরের অধিকার দেয়নি।

জিজ্ঞাসাবাদ ও তল্লাশির আইনি সীমাবদ্ধতা পুলিশ আইন ১৮৬১-এর ২৩ ধারা এবং ফৌজদারি কার্যবিধির (সিআরপিসি) ১৬১ ধারা অনুযায়ী, অপরাধ প্রতিরোধে পুলিশ যে কাউকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে। তবে এই ক্ষমতার একটি স্পষ্ট সীমারেখা রয়েছে। পুলিশ আপনার পরিচয় বা গন্তব্য জানতে চাইলে আপনি উত্তর দিতে পারেন, কিন্তু এমন কোনো উত্তর দিতে আপনি বাধ্য নন যা আপনাকে কোনো অপরাধে ফাঁসিয়ে দিতে পারে। অর্থাৎ, নিজেকে দোষী সাব্যস্ত করার বিরুদ্ধে আপনার পূর্ণ আইনি সুরক্ষা রয়েছে।

তল্লাশির ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির ১০৩ ধারা অনুযায়ী প্রক্রিয়াটি হতে হবে স্বচ্ছ। কোনো ব্যক্তিকে তল্লাশির সময় স্থানীয় অন্তত দুজন গণ্যমান্য ব্যক্তিকে সাক্ষী হিসেবে রাখা বাধ্যতামূলক। সাম্প্রতিক অভিযানে পুলিশকে একাকী তল্লাশি চালাতে দেখা গেছে, যা আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এছাড়া ৫২ ধারা অনুযায়ী, কোনো নারীকে তল্লাশি করতে হলে অবশ্যই নারী পুলিশ সদস্যের উপস্থিতি প্রয়োজন; পুরুষ পুলিশের কোনো নারীর দেহ স্পর্শ করার এখতিয়ার নেই।

ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মোবাইল ফোন চেক বর্তমানে পুলিশের হাতে হেনস্তার বড় মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে মোবাইল ফোন চেক করা। অথচ বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৩(খ) অনুচ্ছেদ প্রত্যেক নাগরিকের চিঠিপত্র ও যোগাযোগের গোপনীয়তা রক্ষার গ্যারান্টি দিয়েছে। কোনো সুনির্দিষ্ট মামলা বা আদালতের নির্দেশ ছাড়া পুলিশ কারও ফোন চেক করতে পারে না। সাইবার নিরাপত্তা আইন-২০২৩ বা অন্য কোনো আইনেও পুলিশকে রাস্তাঘাটে সাধারণ মানুষের ফোন ‘র‍্যান্ডম চেক’ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী, তদন্তের প্রয়োজনে ডিভাইস জব্দ করতে হলেও সুনির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।

মারধর ও নির্যাতন: আইনের চোখে দণ্ডনীয় অপরাধ নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩ অনুযায়ী পুলিশি হেফাজতে বা অভিযানে কাউকে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করা একটি ভয়াবহ ফৌজদারি অপরাধ। ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৬ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে গ্রেফতারের সময় কেবল পালিয়ে যাওয়া ঠেকাতে যতটুকু প্রয়োজন, তার বেশি বলপ্রয়োগ করা যাবে না। অর্থাৎ, কেউ যদি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে, তবে তাকে চড়-থাপ্পড় বা লাঠিপেটা করা সম্পূর্ণ বেআইনি। কোনো কর্মকর্তার নির্যাতনে মৃত্যু হলে তার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।

আইনজীবীদের মতে, পুলিশের মূল দায়িত্ব জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিছু সদস্যের বিতর্কিত ও বেআইনি কর্মকাণ্ড পুরো বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করছে। আইনের শাসনের স্বার্থে পুলিশের পেশাগত আচরণে জবাবদিহি এবং মানবাধিকার সচেতনতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।