ঢাকা ০৩:১৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

দুর্নীতির রাহুগ্রাস থেকে মুক্তি: রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারই কি একমাত্র পথ?

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১০:২৭:২১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ১ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশের নাগরিক জীবন ও রাষ্ট্রীয় সুশাসনের পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে দুর্নীতি। সচেতন সমাজ ও সাধারণ মানুষ একবাক্যে স্বীকার করেন যে, দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে থাকা এই ব্যাধিই সব সংকটের মূল। তবে দুর্নীতি দমনের আলাপ যখনই ওঠে, তখন তা প্রায়ই তাত্ত্বিক জটিলতায় আটকে যায়, ফলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আর মাঠপর্যায়ের অনিয়মগুলো আড়ালেই থেকে যায়। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত এই জঞ্জাল পরিষ্কারের চ্যালেঞ্জ নিয়ে নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি ও শরিক দলগুলোর সরকার দুর্নীতি দমনকে তাদের প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে এবং জনজীবনে স্বস্তি ফেরাতে দুর্নীতির গতিপ্রকৃতি ও এর প্রতিকার নিয়ে নির্মোহ বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে দুর্নীতি এখন এক অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। ফুটপাতের ক্ষুদ্র বিক্রেতা থেকে শুরু করে কাঁচাবাজারের সবজি বিক্রেতা—সবাইকেই প্রতিদিন এক ধরনের অঘোষিত ‘চাঁদা’ দিতে হয়, যার কোনো অংশই রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হয় না। গ্রামের কৃষক যখন তার কষ্টার্জিত ফসল বাজারে আনেন, তখন তাকেও তথাকথিত প্রভাবশালী মহলের তুষ্টির জন্য অর্থ গুনতে হয়। সাধারণ মানুষ যখন সরকারি দপ্তরে জমির খাজনা দিতে বা বিদ্যুৎ-পানির বিল পরিশোধ করতে যান, তখন ‘হাতের ময়লা’ বা বাড়তি টাকা ছাড়া ফাইল নড়ে না। চাকরিপ্রার্থী কিংবা বিদেশগামী কর্মীরাও পদে পদে এই দুর্নীতির শিকার। গত দেড় দশকে রাষ্ট্রীয় সেবা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষ নিজ দেশেই এক প্রকার পরবাসী হয়ে পড়েছিলেন। ঘুষের নাম কখনো দেওয়া হয়েছে ‘স্পিড মানি’, কখনো বা ‘বকশিশ’। এভাবে দুর্নীতিকে একটি ‘নিউ নরমাল’ বা স্বাভাবিক বাস্তবতায় রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

দুর্নীতির এই জাল শুধু ছোটখাটো লেনদেনে সীমাবদ্ধ নয়; এর শিকড় অনেক গভীরে। বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনামলে দুর্নীতিবাজদের রাষ্ট্রীয়ভাবে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। এমনকি দুর্নীতি দমন কমিশনকেও (দুদক) অনেক ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার অভিযোগ রয়েছে। বড় বড় প্রকল্প, যেমন—আদানির সঙ্গে বিদ্যুৎ চুক্তি, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অস্বাভাবিক কেনাকাটা কিংবা পদ্মা সেতুর পাঁচ গুণ বর্ধিত নির্মাণ ব্যয়—এসবের বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের কাঁধেই চাপে। ঋণের এই বিশাল বোঝা এবং ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচারের ফলে দেশের অর্থনীতি আজ খাদের কিনারায়। সাধারণ আমানতকারীরা তাদের জমানো টাকা নিয়ে শঙ্কায় থাকেন, অথচ প্রভাবশালীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যান।

এই সর্বগ্রাসী দুর্নীতি থেকে মুক্তির জন্য প্রয়োজন একটি শক্তিশালী ‘রাজনৈতিক সংকেত’। বর্তমান সরকারের জন্য এটি একটি অগ্নিপরীক্ষা। দুর্নীতি দমনে শুধু সদিচ্ছা থাকলেই হবে না, বরং এর উৎসগুলো বন্ধ করতে হবে। যারা চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ, তাদের বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেওয়া অপরিহার্য। কারণ, গণমাধ্যম ও সামাজিক আন্দোলন যদি দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরতে না পারে, তবে এই বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলা অসম্ভব।

দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠন কোনো জাদুর ছোঁয়ায় সম্ভব নয়, তবে এর সূচনা হতে হবে এখনই। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কঠোর অবস্থান এবং সংসদীয় ব্যবস্থার কার্যকর প্রয়োগই পারে দুর্নীতির এই চক্র ভাঙতে। রাষ্ট্রনায়কদের দৃঢ় অঙ্গীকার এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণই পারে বাংলাদেশকে একটি ইনসাফভিত্তিক ও দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ঈদুল ফিতরে টানা ছুটির হাতছানি: জেনে নিন সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীদের অবকাশের সময়সূচি

দুর্নীতির রাহুগ্রাস থেকে মুক্তি: রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারই কি একমাত্র পথ?

আপডেট সময় : ১০:২৭:২১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশের নাগরিক জীবন ও রাষ্ট্রীয় সুশাসনের পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে দুর্নীতি। সচেতন সমাজ ও সাধারণ মানুষ একবাক্যে স্বীকার করেন যে, দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে থাকা এই ব্যাধিই সব সংকটের মূল। তবে দুর্নীতি দমনের আলাপ যখনই ওঠে, তখন তা প্রায়ই তাত্ত্বিক জটিলতায় আটকে যায়, ফলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আর মাঠপর্যায়ের অনিয়মগুলো আড়ালেই থেকে যায়। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত এই জঞ্জাল পরিষ্কারের চ্যালেঞ্জ নিয়ে নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি ও শরিক দলগুলোর সরকার দুর্নীতি দমনকে তাদের প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে এবং জনজীবনে স্বস্তি ফেরাতে দুর্নীতির গতিপ্রকৃতি ও এর প্রতিকার নিয়ে নির্মোহ বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে দুর্নীতি এখন এক অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। ফুটপাতের ক্ষুদ্র বিক্রেতা থেকে শুরু করে কাঁচাবাজারের সবজি বিক্রেতা—সবাইকেই প্রতিদিন এক ধরনের অঘোষিত ‘চাঁদা’ দিতে হয়, যার কোনো অংশই রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হয় না। গ্রামের কৃষক যখন তার কষ্টার্জিত ফসল বাজারে আনেন, তখন তাকেও তথাকথিত প্রভাবশালী মহলের তুষ্টির জন্য অর্থ গুনতে হয়। সাধারণ মানুষ যখন সরকারি দপ্তরে জমির খাজনা দিতে বা বিদ্যুৎ-পানির বিল পরিশোধ করতে যান, তখন ‘হাতের ময়লা’ বা বাড়তি টাকা ছাড়া ফাইল নড়ে না। চাকরিপ্রার্থী কিংবা বিদেশগামী কর্মীরাও পদে পদে এই দুর্নীতির শিকার। গত দেড় দশকে রাষ্ট্রীয় সেবা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষ নিজ দেশেই এক প্রকার পরবাসী হয়ে পড়েছিলেন। ঘুষের নাম কখনো দেওয়া হয়েছে ‘স্পিড মানি’, কখনো বা ‘বকশিশ’। এভাবে দুর্নীতিকে একটি ‘নিউ নরমাল’ বা স্বাভাবিক বাস্তবতায় রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

দুর্নীতির এই জাল শুধু ছোটখাটো লেনদেনে সীমাবদ্ধ নয়; এর শিকড় অনেক গভীরে। বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনামলে দুর্নীতিবাজদের রাষ্ট্রীয়ভাবে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। এমনকি দুর্নীতি দমন কমিশনকেও (দুদক) অনেক ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার অভিযোগ রয়েছে। বড় বড় প্রকল্প, যেমন—আদানির সঙ্গে বিদ্যুৎ চুক্তি, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অস্বাভাবিক কেনাকাটা কিংবা পদ্মা সেতুর পাঁচ গুণ বর্ধিত নির্মাণ ব্যয়—এসবের বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের কাঁধেই চাপে। ঋণের এই বিশাল বোঝা এবং ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচারের ফলে দেশের অর্থনীতি আজ খাদের কিনারায়। সাধারণ আমানতকারীরা তাদের জমানো টাকা নিয়ে শঙ্কায় থাকেন, অথচ প্রভাবশালীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যান।

এই সর্বগ্রাসী দুর্নীতি থেকে মুক্তির জন্য প্রয়োজন একটি শক্তিশালী ‘রাজনৈতিক সংকেত’। বর্তমান সরকারের জন্য এটি একটি অগ্নিপরীক্ষা। দুর্নীতি দমনে শুধু সদিচ্ছা থাকলেই হবে না, বরং এর উৎসগুলো বন্ধ করতে হবে। যারা চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ, তাদের বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেওয়া অপরিহার্য। কারণ, গণমাধ্যম ও সামাজিক আন্দোলন যদি দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরতে না পারে, তবে এই বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলা অসম্ভব।

দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠন কোনো জাদুর ছোঁয়ায় সম্ভব নয়, তবে এর সূচনা হতে হবে এখনই। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কঠোর অবস্থান এবং সংসদীয় ব্যবস্থার কার্যকর প্রয়োগই পারে দুর্নীতির এই চক্র ভাঙতে। রাষ্ট্রনায়কদের দৃঢ় অঙ্গীকার এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণই পারে বাংলাদেশকে একটি ইনসাফভিত্তিক ও দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে।