ঢাকা ০৩:১৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ভোটের অধিকার বনাম দুর্ভেদ্য সিঁড়ি: অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রের পথে বড় বাধা

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১০:২৩:১৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ০ বার পড়া হয়েছে

১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬। হুইলচেয়ারে বসে মায়ের হাত ধরে ভোটকেন্দ্রের দিকে যাচ্ছিলেন খুরশিদা। মনে একরাশ স্বপ্ন আর নাগরিকত্বের গর্ব। এর আগে কখনো ভোট দেওয়ার সুযোগ হয়নি তার, তাই দিনটি ছিল বিশেষ। পথে চলতে চলতে খুরশিদা অনুভব করছিলেন, তিনিও এই রাষ্ট্র ও গণতন্ত্রের একজন অপরিহার্য অংশ। কিন্তু ভোটকেন্দ্রে পৌঁছানোর পর সেই রঙিন স্বপ্ন মুহূর্তেই ফিকে হয়ে গেল। খুরশিদা জানতে পারলেন, তার ভোটকক্ষটি ভবনের তৃতীয় তলায়।

যে সিঁড়ি সাধারণ মানুষের কাছে কেবলই একটি স্থাপনা, খুরশিদার মতো মানুষের কাছে তা এক দুর্ভেদ্য দেয়াল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও কোনো সাহায্য বা বিকল্প ব্যবস্থা না পেয়ে শেষ পর্যন্ত ভোট না দিয়েই বাড়ি ফিরতে হলো তাকে। খুরশিদার এই ফিরে যাওয়া কেবল একজন ব্যক্তির ব্যর্থতা নয়, বরং আমাদের গণতন্ত্রের অন্তর্নিহিত দুর্বলতারই প্রতিফলন। যেখানে সমান অধিকার নিশ্চিত হয় না, সেখানে গণতন্ত্রের পূর্ণতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

খুরশিদার এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের লাখ লাখ প্রতিবন্ধী নাগরিকের প্রাত্যহিক বঞ্চনার একটি খণ্ডচিত্র মাত্র। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ লাখ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের প্রতিবন্ধিতা নিয়ে জীবনসংগ্রাম করছেন। ইউনিসেফের তথ্যমতে, এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রায় ১৪ লাখই শিশু। অর্থাৎ, ভবিষ্যতে এই বিশাল জনশক্তি রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে অংশগ্রহণের অপেক্ষায় থাকবে। কিন্তু আমাদের অবকাঠামো ও মানসিকতা কি তাদের বরণ করে নিতে প্রস্তুত?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৩ সালের পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বের প্রতি ছয়জনে একজন মানুষ প্রতিবন্ধিতার শিকার। এই ১.৩ বিলিয়ন মানুষ বিশ্বের বৃহত্তম সংখ্যালঘু গোষ্ঠী। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, এই জনগোষ্ঠীর প্রায় ৮০ শতাংশই বাস করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে, যেখানে অবকাঠামো ও সামাজিক ব্যবস্থা তাদের জন্য সহায়ক নয়। বিশ্বব্যাংক ও ইন্টারন‍্যাশনাল আইডিয়ার গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের তুলনায় অনেক পিছিয়ে। বিশেষ করে ভোটাধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে তাদের অংশগ্রহণ ৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত কম।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই বৈষম্য আরও প্রকট। দেশের অধিকাংশ ভোটকেন্দ্র স্থাপন করা হয় পুরোনো স্কুল ভবনগুলোতে, যেগুলোর অধিকাংশেই প্রতিবন্ধীবান্ধব পরিবেশ নেই। সেন্টার ফর ডিসেবিলিটি ইন ডেভেলপমেন্টের (সিডিডি) তথ্যমতে, দেশের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ সরকারি ভবনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রবেশের সুব্যবস্থা নেই। অন্যদিকে, ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপের ২০১৮ সালের পর্যবেক্ষণ বলছে, প্রায় ৭৫ শতাংশ ভোটকেন্দ্রে কোনো স্থায়ী র‍্যাম্প নেই। ফলে হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীরা ভোটকেন্দ্রে এলেও ভোট না দিয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হন। শুধু তাই নয়, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ভোটারদের জন্য ব্রেইল ব্যালট বা বিশেষ ভোটিং সিস্টেম না থাকায় তাদের গোপনীয়তা ও স্বাধীনতাও লঙ্ঘিত হচ্ছে।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা ১০ কোটি ছাড়িয়ে গেলেও প্রতিবন্ধী ভোটারদের বড় একটি অংশ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত থেকেছে। ইন্টারন‍্যাশনাল ফাউন্ডেশন ফর ইলেক্টোরাল সিস্টেমসের (আইএফইএস) গবেষণা বলছে, বাংলাদেশের প্রায় ৪০ শতাংশ প্রতিবন্ধী ভোটার ভোট দিতে গিয়ে সমস্যার সম্মুখীন হন এবং প্রায় ২৫ শতাংশ কেবল প্রবেশগম্যতার অভাবে ভোট দিতে পারেন না। এটি কেবল প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা নয়, বরং একটি কাঠামোগত বৈষম্য।

বিশ্বের অনেক দেশেই এই সমস্যার কার্যকর সমাধান করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৯০ সালে ‘আমেরিকানস উইথ ডিসেবিলিটিস অ্যাক্ট’ পাসের মাধ্যমে সব সরকারি ভবনে প্রতিবন্ধীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়েছে। যুক্তরাজ্যে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য চালু আছে ট্যাক্টাইল ভোটিং ডিভাইস। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতও হুইলচেয়ার সরবরাহ, স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ এবং প্রয়োজনে বাড়িতে গিয়ে ভোট গ্রহণের ব্যবস্থা চালু করেছে।

গণতন্ত্র মানে কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন নয়, বরং প্রতিটি নাগরিকের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা নিয়ে আত্মতৃপ্তির চেয়ে প্রতিটি ভোটারের ভোটকেন্দ্রে পৌঁছানোর অধিকার নিশ্চিত করা আজ সময়ের দাবি। খুরশিদার মতো নাগরিকরা যেন আর সিঁড়ির গোড়ায় থমকে না যান, সেই দায়বদ্ধতা রাষ্ট্র ও সমাজকেই নিতে হবে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ঈদুল ফিতরে টানা ছুটির হাতছানি: জেনে নিন সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীদের অবকাশের সময়সূচি

ভোটের অধিকার বনাম দুর্ভেদ্য সিঁড়ি: অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রের পথে বড় বাধা

আপডেট সময় : ১০:২৩:১৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬। হুইলচেয়ারে বসে মায়ের হাত ধরে ভোটকেন্দ্রের দিকে যাচ্ছিলেন খুরশিদা। মনে একরাশ স্বপ্ন আর নাগরিকত্বের গর্ব। এর আগে কখনো ভোট দেওয়ার সুযোগ হয়নি তার, তাই দিনটি ছিল বিশেষ। পথে চলতে চলতে খুরশিদা অনুভব করছিলেন, তিনিও এই রাষ্ট্র ও গণতন্ত্রের একজন অপরিহার্য অংশ। কিন্তু ভোটকেন্দ্রে পৌঁছানোর পর সেই রঙিন স্বপ্ন মুহূর্তেই ফিকে হয়ে গেল। খুরশিদা জানতে পারলেন, তার ভোটকক্ষটি ভবনের তৃতীয় তলায়।

যে সিঁড়ি সাধারণ মানুষের কাছে কেবলই একটি স্থাপনা, খুরশিদার মতো মানুষের কাছে তা এক দুর্ভেদ্য দেয়াল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও কোনো সাহায্য বা বিকল্প ব্যবস্থা না পেয়ে শেষ পর্যন্ত ভোট না দিয়েই বাড়ি ফিরতে হলো তাকে। খুরশিদার এই ফিরে যাওয়া কেবল একজন ব্যক্তির ব্যর্থতা নয়, বরং আমাদের গণতন্ত্রের অন্তর্নিহিত দুর্বলতারই প্রতিফলন। যেখানে সমান অধিকার নিশ্চিত হয় না, সেখানে গণতন্ত্রের পূর্ণতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

খুরশিদার এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের লাখ লাখ প্রতিবন্ধী নাগরিকের প্রাত্যহিক বঞ্চনার একটি খণ্ডচিত্র মাত্র। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ লাখ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের প্রতিবন্ধিতা নিয়ে জীবনসংগ্রাম করছেন। ইউনিসেফের তথ্যমতে, এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রায় ১৪ লাখই শিশু। অর্থাৎ, ভবিষ্যতে এই বিশাল জনশক্তি রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে অংশগ্রহণের অপেক্ষায় থাকবে। কিন্তু আমাদের অবকাঠামো ও মানসিকতা কি তাদের বরণ করে নিতে প্রস্তুত?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৩ সালের পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বের প্রতি ছয়জনে একজন মানুষ প্রতিবন্ধিতার শিকার। এই ১.৩ বিলিয়ন মানুষ বিশ্বের বৃহত্তম সংখ্যালঘু গোষ্ঠী। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, এই জনগোষ্ঠীর প্রায় ৮০ শতাংশই বাস করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে, যেখানে অবকাঠামো ও সামাজিক ব্যবস্থা তাদের জন্য সহায়ক নয়। বিশ্বব্যাংক ও ইন্টারন‍্যাশনাল আইডিয়ার গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের তুলনায় অনেক পিছিয়ে। বিশেষ করে ভোটাধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে তাদের অংশগ্রহণ ৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত কম।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই বৈষম্য আরও প্রকট। দেশের অধিকাংশ ভোটকেন্দ্র স্থাপন করা হয় পুরোনো স্কুল ভবনগুলোতে, যেগুলোর অধিকাংশেই প্রতিবন্ধীবান্ধব পরিবেশ নেই। সেন্টার ফর ডিসেবিলিটি ইন ডেভেলপমেন্টের (সিডিডি) তথ্যমতে, দেশের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ সরকারি ভবনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রবেশের সুব্যবস্থা নেই। অন্যদিকে, ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপের ২০১৮ সালের পর্যবেক্ষণ বলছে, প্রায় ৭৫ শতাংশ ভোটকেন্দ্রে কোনো স্থায়ী র‍্যাম্প নেই। ফলে হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীরা ভোটকেন্দ্রে এলেও ভোট না দিয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হন। শুধু তাই নয়, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ভোটারদের জন্য ব্রেইল ব্যালট বা বিশেষ ভোটিং সিস্টেম না থাকায় তাদের গোপনীয়তা ও স্বাধীনতাও লঙ্ঘিত হচ্ছে।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা ১০ কোটি ছাড়িয়ে গেলেও প্রতিবন্ধী ভোটারদের বড় একটি অংশ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত থেকেছে। ইন্টারন‍্যাশনাল ফাউন্ডেশন ফর ইলেক্টোরাল সিস্টেমসের (আইএফইএস) গবেষণা বলছে, বাংলাদেশের প্রায় ৪০ শতাংশ প্রতিবন্ধী ভোটার ভোট দিতে গিয়ে সমস্যার সম্মুখীন হন এবং প্রায় ২৫ শতাংশ কেবল প্রবেশগম্যতার অভাবে ভোট দিতে পারেন না। এটি কেবল প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা নয়, বরং একটি কাঠামোগত বৈষম্য।

বিশ্বের অনেক দেশেই এই সমস্যার কার্যকর সমাধান করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৯০ সালে ‘আমেরিকানস উইথ ডিসেবিলিটিস অ্যাক্ট’ পাসের মাধ্যমে সব সরকারি ভবনে প্রতিবন্ধীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়েছে। যুক্তরাজ্যে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য চালু আছে ট্যাক্টাইল ভোটিং ডিভাইস। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতও হুইলচেয়ার সরবরাহ, স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ এবং প্রয়োজনে বাড়িতে গিয়ে ভোট গ্রহণের ব্যবস্থা চালু করেছে।

গণতন্ত্র মানে কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন নয়, বরং প্রতিটি নাগরিকের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা নিয়ে আত্মতৃপ্তির চেয়ে প্রতিটি ভোটারের ভোটকেন্দ্রে পৌঁছানোর অধিকার নিশ্চিত করা আজ সময়ের দাবি। খুরশিদার মতো নাগরিকরা যেন আর সিঁড়ির গোড়ায় থমকে না যান, সেই দায়বদ্ধতা রাষ্ট্র ও সমাজকেই নিতে হবে।