ঢাকা ১১:১৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬

নতুন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমীকরণ: জনআকাঙ্ক্ষা বনাম পুরোনো সংঘাতের ছায়া

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১০:০০:২০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ০ বার পড়া হয়েছে

নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরশাসক এরশাদের পতনের পর বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের যে নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছিল, তার পথচলা কখনোই মসৃণ ছিল না। তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্বের পারস্পরিক প্রতিহিংসা ও অসহিষ্ণুতা সংসদীয় ব্যবস্থাকে বারবার সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠনের পর থেকেই তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার কঠোর অবস্থান ও ‘সরকারকে একদিনও শান্তিতে থাকতে না দেওয়ার’ ঘোষণা রাজনীতির মাঠে স্থায়ী অস্থিরতার বীজ বপন করেছিল। ১৯৯৪ সালের মাগুরা উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আন্দোলন এবং পরবর্তীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার দাবি শেষ পর্যন্ত ১৯৯৬ সালের জুনে আওয়ামী লীগকে দীর্ঘ ২১ বছর পর ক্ষমতায় বসায়। তবে ২০০১ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ পরাজয়ের পর শেখ হাসিনা তার রাজনৈতিক কৌশলে আমূল পরিবর্তন আনেন।

২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী প্রেক্ষাপট এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর থেকে দেশে এক দীর্ঘমেয়াদী দমনমূলক শাসনের সূচনা হয়। ভারতের সমর্থনপুষ্ট ও মহাজোটের ব্যানারে ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনা বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে নির্মূল করার নীল নকশা বাস্তবায়ন করেন। ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের বিতর্কিত ও ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি দেড় দশক ধরে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখেন। এই সময়ে সংসদকে একটি ‘রাবার স্ট্যাম্প’ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয় এবং জাতীয় পার্টিকে ‘গৃহপালিত বিরোধী দল’ হিসেবে ব্যবহার করে গণতন্ত্রের মুখোশ পরানোর চেষ্টা চলে। শেখ মুজিবুর রহমানের একদলীয় বাকশাল শাসনের আদলে শেখ হাসিনাও বিরোধী মত দমনে ‘ফাঁসি’ ও ‘গুম’-এর রাজনীতি বেছে নেন। বিশেষ করে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলায় কারারুদ্ধ করা এবং উন্নত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করার বিষয়টি ছিল চরম প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ। এমনকি শোকাতুর অবস্থায় সন্তানের মরদেহ দেখার সময়ও তাকে অবরুদ্ধ রাখা হয়েছিল।

দীর্ঘ দেড় দশকের এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির অবসান ঘটে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার এক রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে। উন্নয়নের আড়ালে মেগা দুর্নীতি, অর্থ পাচার এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কাছে জাতীয় স্বার্থ বিকিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ দাবানলের মতো জ্বলে ওঠে। কয়েক হাজার প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত এই বিজয়ে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন। এই অভ্যুত্থান ছিল কেবল সরকার পরিবর্তন নয়, বরং রাষ্ট্রের ফ্যাসিবাদী কাঠামো ভেঙে আমূল সংস্কারের এক প্রবল জনদাবি। সাম্প্রতিক নির্বাচনেও সেই আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন দেখা গেছে, যেখানে ৬২ শতাংশ মানুষ রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছেন।

তবে নতুন বাংলাদেশে গণতন্ত্রের অভিযাত্রা শুরু হতেই কিছু পুরোনো অস্বস্তির লক্ষণ ফুটে উঠছে। নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ বার্তার বিনিময় দেশবাসীকে আশান্বিত করলেও, সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে সেই আস্থার পরিবেশে ফাটল ধরেছে। ‘জুলাই সনদ’-এর ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার প্রশ্নে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের মধ্যে মতানৈক্য তৈরি হয়েছে। এর ফলে বিরোধী দল মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠান বর্জন করেছে, যা সাধারণ মানুষকে আবারও পুরোনো সংঘাতময় রাজনীতির আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।

রাজনৈতিক নেতৃত্বকে বুঝতে হবে, ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান অতীতের যেকোনো আন্দোলনের চেয়ে গুণগতভাবে ভিন্ন। এই আন্দোলনে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সাধারণ গৃহবধূরা পর্যন্ত রাজপথে নেমেছিলেন। ১৪০০-এর বেশি শহীদের রক্ত আর হাজার হাজার পঙ্গুত্ববরণকারী মানুষের ত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে আজকের এই সংসদ। বিশেষ করে ১৩৩ জন শিশুর আত্মত্যাগ আমাদের রাজনীতিকদের জন্য এক বিশাল দায়বদ্ধতা তৈরি করেছে। বর্তমান ভোটাররা অত্যন্ত সচেতন; তারা নিছক ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং একটি জবাবদিহিমূলক ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র দেখতে চায়। রাজনৈতিক দলগুলো যদি জনআকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়ে আবারও সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থ ও অবিশ্বাসের রাজনীতিতে লিপ্ত হয়, তবে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হতে পারে আরও ভয়াবহভাবে। মানুষের এই অভূতপূর্ব ম্যান্ডেটকে সম্মান জানিয়ে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে রাষ্ট্র সংস্কার সম্পন্ন করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

নীলফামারীতে মন্দিরের উঠান থেকে কৃষকের গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার, এলাকায় চাঞ্চল্য

নতুন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমীকরণ: জনআকাঙ্ক্ষা বনাম পুরোনো সংঘাতের ছায়া

আপডেট সময় : ১০:০০:২০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরশাসক এরশাদের পতনের পর বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের যে নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছিল, তার পথচলা কখনোই মসৃণ ছিল না। তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্বের পারস্পরিক প্রতিহিংসা ও অসহিষ্ণুতা সংসদীয় ব্যবস্থাকে বারবার সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠনের পর থেকেই তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার কঠোর অবস্থান ও ‘সরকারকে একদিনও শান্তিতে থাকতে না দেওয়ার’ ঘোষণা রাজনীতির মাঠে স্থায়ী অস্থিরতার বীজ বপন করেছিল। ১৯৯৪ সালের মাগুরা উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আন্দোলন এবং পরবর্তীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার দাবি শেষ পর্যন্ত ১৯৯৬ সালের জুনে আওয়ামী লীগকে দীর্ঘ ২১ বছর পর ক্ষমতায় বসায়। তবে ২০০১ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ পরাজয়ের পর শেখ হাসিনা তার রাজনৈতিক কৌশলে আমূল পরিবর্তন আনেন।

২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী প্রেক্ষাপট এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর থেকে দেশে এক দীর্ঘমেয়াদী দমনমূলক শাসনের সূচনা হয়। ভারতের সমর্থনপুষ্ট ও মহাজোটের ব্যানারে ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনা বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে নির্মূল করার নীল নকশা বাস্তবায়ন করেন। ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের বিতর্কিত ও ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি দেড় দশক ধরে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখেন। এই সময়ে সংসদকে একটি ‘রাবার স্ট্যাম্প’ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয় এবং জাতীয় পার্টিকে ‘গৃহপালিত বিরোধী দল’ হিসেবে ব্যবহার করে গণতন্ত্রের মুখোশ পরানোর চেষ্টা চলে। শেখ মুজিবুর রহমানের একদলীয় বাকশাল শাসনের আদলে শেখ হাসিনাও বিরোধী মত দমনে ‘ফাঁসি’ ও ‘গুম’-এর রাজনীতি বেছে নেন। বিশেষ করে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলায় কারারুদ্ধ করা এবং উন্নত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করার বিষয়টি ছিল চরম প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ। এমনকি শোকাতুর অবস্থায় সন্তানের মরদেহ দেখার সময়ও তাকে অবরুদ্ধ রাখা হয়েছিল।

দীর্ঘ দেড় দশকের এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির অবসান ঘটে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার এক রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে। উন্নয়নের আড়ালে মেগা দুর্নীতি, অর্থ পাচার এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কাছে জাতীয় স্বার্থ বিকিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ দাবানলের মতো জ্বলে ওঠে। কয়েক হাজার প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত এই বিজয়ে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন। এই অভ্যুত্থান ছিল কেবল সরকার পরিবর্তন নয়, বরং রাষ্ট্রের ফ্যাসিবাদী কাঠামো ভেঙে আমূল সংস্কারের এক প্রবল জনদাবি। সাম্প্রতিক নির্বাচনেও সেই আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন দেখা গেছে, যেখানে ৬২ শতাংশ মানুষ রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছেন।

তবে নতুন বাংলাদেশে গণতন্ত্রের অভিযাত্রা শুরু হতেই কিছু পুরোনো অস্বস্তির লক্ষণ ফুটে উঠছে। নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ বার্তার বিনিময় দেশবাসীকে আশান্বিত করলেও, সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে সেই আস্থার পরিবেশে ফাটল ধরেছে। ‘জুলাই সনদ’-এর ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার প্রশ্নে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের মধ্যে মতানৈক্য তৈরি হয়েছে। এর ফলে বিরোধী দল মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠান বর্জন করেছে, যা সাধারণ মানুষকে আবারও পুরোনো সংঘাতময় রাজনীতির আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।

রাজনৈতিক নেতৃত্বকে বুঝতে হবে, ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান অতীতের যেকোনো আন্দোলনের চেয়ে গুণগতভাবে ভিন্ন। এই আন্দোলনে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সাধারণ গৃহবধূরা পর্যন্ত রাজপথে নেমেছিলেন। ১৪০০-এর বেশি শহীদের রক্ত আর হাজার হাজার পঙ্গুত্ববরণকারী মানুষের ত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে আজকের এই সংসদ। বিশেষ করে ১৩৩ জন শিশুর আত্মত্যাগ আমাদের রাজনীতিকদের জন্য এক বিশাল দায়বদ্ধতা তৈরি করেছে। বর্তমান ভোটাররা অত্যন্ত সচেতন; তারা নিছক ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং একটি জবাবদিহিমূলক ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র দেখতে চায়। রাজনৈতিক দলগুলো যদি জনআকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়ে আবারও সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থ ও অবিশ্বাসের রাজনীতিতে লিপ্ত হয়, তবে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হতে পারে আরও ভয়াবহভাবে। মানুষের এই অভূতপূর্ব ম্যান্ডেটকে সম্মান জানিয়ে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে রাষ্ট্র সংস্কার সম্পন্ন করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।