ঢাকা ০৫:২৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

গাকৃবিতে দেশের প্রথম উচ্চ খরা সহনশীল সয়াবিন উদ্ভাবন: কৃষি বিপ্লবে নতুন দিগন্ত

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৭:১৬:৩৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

দেশের কৃষিক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী সাফল্য হিসেবে গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (গাকৃবি) উদ্ভাবন করেছে উচ্চ খরা সহনশীল সয়াবিনের ইনব্রিড জাত ‘জিএইউ সয়াবিন ৬’। বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিতত্ত্ব বিভাগের কৃষিতত্ত্ববিদ প্রফেসর ড. এম. এ. মান্নানের দীর্ঘ এক দশকের নিবিড় গবেষণায় সম্প্রতি এই নতুন জাতটি উদ্ভাবিত হয়েছে, যা প্রতিকূল পরিবেশে সয়াবিন চাষে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

গাকৃবির এই উদ্ভাবনের ফলে মোট উদ্ভাবিত ফসলের জাতের সংখ্যা দাঁড়ালো ৯৪টি। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, এই গবেষণা প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল তাইওয়ানের এশিয়ান ভেজিটেবল রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টার, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং দক্ষিণ কোরিয়া থেকে সংগৃহীত প্রায় ২৫০টি জার্মপ্লাজম দিয়ে। তিন বছরের কঠোর পরীক্ষার পর ‘জি০০০৫৬’ নামক জার্মপ্লাজমটি খরা-সহনশীল হিসেবে নির্বাচিত হয়। পরবর্তীতে ‘সলিডারিডেট নেটওয়ার্ক এশিয়া’র সহযোগিতায় নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও ভোলার উপকূলীয় চরাঞ্চলে পাঁচ বছর ধরে মাঠপর্যায়ে এর সফল মূল্যায়ন করা হয়। অবশেষে, ২০২৫ সালের ১১ নভেম্বর জাতীয় বীজ বোর্ড আনুষ্ঠানিকভাবে এই জাতের ছাড়পত্র প্রদান করে।

‘জিএইউ সয়াবিন ৬’ জাতটি ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ ফিল্ড ক্যাপাসিটির মতো কঠিন খরা পরিস্থিতিতেও টিকে থেকে উচ্চ ফলন দিতে সক্ষম। এটি উপকূলীয় চরাঞ্চলে সয়াবিন চাষের বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে বিশেষভাবে কার্যকর। এই জাতের প্রতিটি গাছে ৮০-১০০টি ফল ধরে এবং এর বড় দানার কারণে ১০০০ বীজের ওজন প্রায় ২৩০ গ্রাম হয়। সাধারণ জাতের তুলনায় এটি হেক্টর প্রতি ৩.২ থেকে ৩.৮ টন পর্যন্ত ফলন দিতে পারে। এই জাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, এর বীজে ট্রিপসিনের মাত্রা কম থাকায় পোল্ট্রি খাদ্যে প্রোটিন শোষণের হার বাড়ে, যা পোল্ট্রি শিল্পের জন্য অত্যন্ত লাভজনক। এছাড়া, তুলনামূলক কম সময়ে অর্থাৎ তিন মাস থেকে তিন মাস ১০ দিনের মধ্যেই ফসল পরিপক্ব হওয়ায় কৃষকরা দ্রুত ও অধিক ফলন পেয়ে লাভবান হতে পারবেন।

সয়াবিন পুষ্টির এক শক্তিশালী উৎস। এতে প্রায় ৪০-৪৫% উচ্চমানের প্রোটিন এবং ১৮-২০% তেল বিদ্যমান। অপরিহার্য অ্যামিনো অ্যাসিড, ভিটামিন ও খনিজ পদার্থে সমৃদ্ধ এই ফসল অপুষ্টি দূরীকরণ, হৃদরোগের ঝুঁকি হ্রাস এবং দেহের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

এই উদ্ভাবন সম্পর্কে ড. মান্নান বলেন, ‘জিএইউ সয়াবিন ৬’ জাতটি আমাদের দীর্ঘদিনের নিরলস গবেষণা, মাঠের রোদ-বৃষ্টি এবং কৃষকের স্বপ্নের সম্মিলিত ফসল। উপকূলীয় চরাঞ্চলের লবণাক্ততা, অনাবৃষ্টি ও অনিশ্চিত আবহাওয়ার মতো কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এটি অত্যন্ত ফলপ্রসূ হবে। খরা-প্রবণ জমিতে সয়াবিন চাষ এতদিন ঝুঁকিপূর্ণ ছিল, কিন্তু এই জাত সেই অনিশ্চয়তা ভেঙে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে।’

গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. জিকেএম মোস্তাফিজুর রহমান এই সাফল্যে গভীর সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, ‘জিএইউ সয়াবিন ৬’ বাংলাদেশের কৃষিতে একটি যুগান্তকারী অর্জন। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা শক্তিশালীকরণ এবং কৃষকের জীবনে স্থিতিশীলতা আনয়নে এটি টেকসই কৃষির প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।’ তিনি গবেষক দল, ল্যাব ও মাঠপর্যায়ের বিজ্ঞানীদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।

উল্লেখ্য, এই গবেষণা দল এর আগেও লবণ ও জলাবদ্ধতা-সহনশীল বৈশিষ্ট্যসহ আরও পাঁচটি উচ্চফলনশীল সয়াবিন জাত উদ্ভাবন করে সফলতার স্বাক্ষর রেখেছে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

রাজনগরে ক্রিকেট খেলা নিয়ে বিরোধ: ছুরিকাঘাতে হিফজ বিভাগের ছাত্র নিহত

গাকৃবিতে দেশের প্রথম উচ্চ খরা সহনশীল সয়াবিন উদ্ভাবন: কৃষি বিপ্লবে নতুন দিগন্ত

আপডেট সময় : ০৭:১৬:৩৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

দেশের কৃষিক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী সাফল্য হিসেবে গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (গাকৃবি) উদ্ভাবন করেছে উচ্চ খরা সহনশীল সয়াবিনের ইনব্রিড জাত ‘জিএইউ সয়াবিন ৬’। বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিতত্ত্ব বিভাগের কৃষিতত্ত্ববিদ প্রফেসর ড. এম. এ. মান্নানের দীর্ঘ এক দশকের নিবিড় গবেষণায় সম্প্রতি এই নতুন জাতটি উদ্ভাবিত হয়েছে, যা প্রতিকূল পরিবেশে সয়াবিন চাষে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

গাকৃবির এই উদ্ভাবনের ফলে মোট উদ্ভাবিত ফসলের জাতের সংখ্যা দাঁড়ালো ৯৪টি। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, এই গবেষণা প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল তাইওয়ানের এশিয়ান ভেজিটেবল রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টার, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং দক্ষিণ কোরিয়া থেকে সংগৃহীত প্রায় ২৫০টি জার্মপ্লাজম দিয়ে। তিন বছরের কঠোর পরীক্ষার পর ‘জি০০০৫৬’ নামক জার্মপ্লাজমটি খরা-সহনশীল হিসেবে নির্বাচিত হয়। পরবর্তীতে ‘সলিডারিডেট নেটওয়ার্ক এশিয়া’র সহযোগিতায় নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও ভোলার উপকূলীয় চরাঞ্চলে পাঁচ বছর ধরে মাঠপর্যায়ে এর সফল মূল্যায়ন করা হয়। অবশেষে, ২০২৫ সালের ১১ নভেম্বর জাতীয় বীজ বোর্ড আনুষ্ঠানিকভাবে এই জাতের ছাড়পত্র প্রদান করে।

‘জিএইউ সয়াবিন ৬’ জাতটি ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ ফিল্ড ক্যাপাসিটির মতো কঠিন খরা পরিস্থিতিতেও টিকে থেকে উচ্চ ফলন দিতে সক্ষম। এটি উপকূলীয় চরাঞ্চলে সয়াবিন চাষের বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে বিশেষভাবে কার্যকর। এই জাতের প্রতিটি গাছে ৮০-১০০টি ফল ধরে এবং এর বড় দানার কারণে ১০০০ বীজের ওজন প্রায় ২৩০ গ্রাম হয়। সাধারণ জাতের তুলনায় এটি হেক্টর প্রতি ৩.২ থেকে ৩.৮ টন পর্যন্ত ফলন দিতে পারে। এই জাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, এর বীজে ট্রিপসিনের মাত্রা কম থাকায় পোল্ট্রি খাদ্যে প্রোটিন শোষণের হার বাড়ে, যা পোল্ট্রি শিল্পের জন্য অত্যন্ত লাভজনক। এছাড়া, তুলনামূলক কম সময়ে অর্থাৎ তিন মাস থেকে তিন মাস ১০ দিনের মধ্যেই ফসল পরিপক্ব হওয়ায় কৃষকরা দ্রুত ও অধিক ফলন পেয়ে লাভবান হতে পারবেন।

সয়াবিন পুষ্টির এক শক্তিশালী উৎস। এতে প্রায় ৪০-৪৫% উচ্চমানের প্রোটিন এবং ১৮-২০% তেল বিদ্যমান। অপরিহার্য অ্যামিনো অ্যাসিড, ভিটামিন ও খনিজ পদার্থে সমৃদ্ধ এই ফসল অপুষ্টি দূরীকরণ, হৃদরোগের ঝুঁকি হ্রাস এবং দেহের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

এই উদ্ভাবন সম্পর্কে ড. মান্নান বলেন, ‘জিএইউ সয়াবিন ৬’ জাতটি আমাদের দীর্ঘদিনের নিরলস গবেষণা, মাঠের রোদ-বৃষ্টি এবং কৃষকের স্বপ্নের সম্মিলিত ফসল। উপকূলীয় চরাঞ্চলের লবণাক্ততা, অনাবৃষ্টি ও অনিশ্চিত আবহাওয়ার মতো কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এটি অত্যন্ত ফলপ্রসূ হবে। খরা-প্রবণ জমিতে সয়াবিন চাষ এতদিন ঝুঁকিপূর্ণ ছিল, কিন্তু এই জাত সেই অনিশ্চয়তা ভেঙে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে।’

গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. জিকেএম মোস্তাফিজুর রহমান এই সাফল্যে গভীর সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, ‘জিএইউ সয়াবিন ৬’ বাংলাদেশের কৃষিতে একটি যুগান্তকারী অর্জন। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা শক্তিশালীকরণ এবং কৃষকের জীবনে স্থিতিশীলতা আনয়নে এটি টেকসই কৃষির প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।’ তিনি গবেষক দল, ল্যাব ও মাঠপর্যায়ের বিজ্ঞানীদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।

উল্লেখ্য, এই গবেষণা দল এর আগেও লবণ ও জলাবদ্ধতা-সহনশীল বৈশিষ্ট্যসহ আরও পাঁচটি উচ্চফলনশীল সয়াবিন জাত উদ্ভাবন করে সফলতার স্বাক্ষর রেখেছে।