ঢাকা ০৫:৩৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ মার্চ ২০২৬

উৎসবের মুখে তৈরি পোশাক শিল্পে নগদ সংকট: ১৪ হাজার কোটি টাকার সহজ শর্তে ঋণের দাবি

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১০:১২:৪৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৪ বার পড়া হয়েছে

পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে দেশের তৈরি পোশাক শিল্প এক গভীর নগদ সংকটের সম্মুখীন। শ্রমিকদের বেতন-ভাতা এবং উৎসব বোনাস সময়মতো পরিশোধ নিশ্চিত করতে এই শিল্পখাত সহজ শর্তে ১৪ হাজার কোটি টাকার ঋণ সহায়তা চেয়েছে। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে এক বৈঠকে এই জরুরি সহায়তা চেয়েছেন।

বৈঠক শেষে বিজিএমইএর ভাইস প্রেসিডেন্ট শিহাব উদ্দুজা চৌধুরী সাংবাদিকদের জানান, শিল্পখাতটির মাসিক বেতন-ভাতা পরিশোধের জন্য প্রায় সাড়ে ছয় থেকে সাত হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হয়। এই পরিস্থিতিতে দুই মাসের বেতন-ভাতা মেটানোর জন্য মোট ১৪ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ তহবিলের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এই অর্থ সহজ শর্তে ঋণ হিসেবে প্রদানের জন্য তারা গভর্নরকে অনুরোধ করেছেন। তিনি আরও জানান, গভর্নর এই প্রস্তাবগুলো ইতিবাচকভাবে নিয়েছেন এবং আশ্বাস দিয়েছেন। এছাড়াও, পোশাক খাতের রপ্তানি প্রণোদনার আটকে থাকা অর্থ দ্রুত ছাড় করার জন্য বিজিএমইএ আবেদন করেছে।

প্রতি ঈদ-পূর্ববর্তী সময়ে এই ধরনের সুবিধা চাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, পূর্ববর্তী আন্দোলন, শ্রমিক অসন্তোষ, নির্বাচন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতির পরিবর্তন—সব মিলিয়ে তৈরি পোশাক শিল্প বর্তমানে এক কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত সাত মাস ধরে রপ্তানি খাতে নেতিবাচক প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা শিল্প টিকিয়ে রাখাকে চ্যালেঞ্জিং করে তুলেছে। এই নগদ সংকট মোকাবেলা এবং উৎপাদন ব্যবস্থা সচল রাখার জন্য দ্রুত প্রণোদনার অর্থ ছাড় ও সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা না পেলে কারখানাগুলোর উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার এবং শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধে জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিজিএমইএ গভর্নরকে দেওয়া এক চিঠিতে উল্লেখ করেছে যে, বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠানের ঋণের আবেদন লিয়েন ব্যাংকগুলোতে জমা রয়েছে, কিছু ফাইল বাংলাদেশ ব্যাংকে অডিট প্রক্রিয়ার অধীনে এবং কিছু ফাইল সব ধরনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে অর্থ ছাড়ের অপেক্ষায় রয়েছে। এই তহবিলগুলো দ্রুত ছাড় করা হলে কারখানাগুলো তাদের নগদ প্রবাহ ব্যবস্থাপনায় কিছুটা স্বস্তি পাবে এবং নিয়মিত মজুরি ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় নির্বাহ করতে সক্ষম হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ পর্যন্ত মোট আড়াই হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা ছাড় করা হয়েছে। তবে, বস্ত্র ও পোশাক খাতে প্রায় পাঁচ হাজার ৭০০ কোটি টাকার প্রণোদনা এখনো আটকে আছে। বিজিএমইএ এই আটকে থাকা অর্থ দ্রুত ছাড়ের জন্য জোর দাবি জানিয়েছে।

চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, মাসিক মজুরির জন্য প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হয়। সেই হিসাবে, আসন্ন ঈদের আগে দুই মাসের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ সহজ শর্তে ঋণ হিসেবে প্রদান করা অত্যন্ত জরুরি। প্রস্তাবিত এই ঋণের পরিশোধের জন্য তিন মাস গ্রেস পিরিয়ডসহ মোট ১২ মাসের সময়সীমা চেয়েছেন তারা।

এছাড়াও, প্রচলিত ঋণসীমার বাইরে বিশেষ বিবেচনায় ‘সফট লোন’ সুবিধা চালু করা, প্যাকিং ক্রেডিট পুনরায় কার্যকর করা এবং সুদের হার সাত শতাংশে নামিয়ে আনার দাবি জানানো হয়েছে। প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট খাতে পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের আকার পাঁচ হাজার কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০ হাজার কোটি টাকা করার এবং তহবিলের মেয়াদ ২০৩০ সাল পর্যন্ত বৃদ্ধির প্রস্তাবও করা হয়েছে। পাশাপাশি, বিজিএমইএ কর্তৃক প্রেরিত তালিকা অনুযায়ী এসএমই শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অনুকূলে নগদ সহায়তার অর্থ দ্রুত ছাড়ের দাবি জানানো হয়।

বিজিএমইএ নেতারা মনে করছেন, শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও বোনাস সময়মতো পরিশোধ না হলে দেশে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। জাতীয় অর্থনীতির চাকা সচল রাখা এবং লাখ লাখ শ্রমিকের জীবন-জীবিকা সুরক্ষায় সরকারের সময়োপযোগী ও সহানুভূতিশীল পদক্ষেপ এই মুহূর্তে অত্যন্ত জরুরি। সংকট উত্তরণে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ শিল্প, শ্রমিক এবং সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের সহায়তা হিসেবে কাজ করবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেছেন।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ঢাবি ছাত্রদলের দুই নেতাকে অব্যাহতি: শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ কেন্দ্রীয় কমিটির

উৎসবের মুখে তৈরি পোশাক শিল্পে নগদ সংকট: ১৪ হাজার কোটি টাকার সহজ শর্তে ঋণের দাবি

আপডেট সময় : ১০:১২:৪৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে দেশের তৈরি পোশাক শিল্প এক গভীর নগদ সংকটের সম্মুখীন। শ্রমিকদের বেতন-ভাতা এবং উৎসব বোনাস সময়মতো পরিশোধ নিশ্চিত করতে এই শিল্পখাত সহজ শর্তে ১৪ হাজার কোটি টাকার ঋণ সহায়তা চেয়েছে। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে এক বৈঠকে এই জরুরি সহায়তা চেয়েছেন।

বৈঠক শেষে বিজিএমইএর ভাইস প্রেসিডেন্ট শিহাব উদ্দুজা চৌধুরী সাংবাদিকদের জানান, শিল্পখাতটির মাসিক বেতন-ভাতা পরিশোধের জন্য প্রায় সাড়ে ছয় থেকে সাত হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হয়। এই পরিস্থিতিতে দুই মাসের বেতন-ভাতা মেটানোর জন্য মোট ১৪ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ তহবিলের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এই অর্থ সহজ শর্তে ঋণ হিসেবে প্রদানের জন্য তারা গভর্নরকে অনুরোধ করেছেন। তিনি আরও জানান, গভর্নর এই প্রস্তাবগুলো ইতিবাচকভাবে নিয়েছেন এবং আশ্বাস দিয়েছেন। এছাড়াও, পোশাক খাতের রপ্তানি প্রণোদনার আটকে থাকা অর্থ দ্রুত ছাড় করার জন্য বিজিএমইএ আবেদন করেছে।

প্রতি ঈদ-পূর্ববর্তী সময়ে এই ধরনের সুবিধা চাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, পূর্ববর্তী আন্দোলন, শ্রমিক অসন্তোষ, নির্বাচন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতির পরিবর্তন—সব মিলিয়ে তৈরি পোশাক শিল্প বর্তমানে এক কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত সাত মাস ধরে রপ্তানি খাতে নেতিবাচক প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা শিল্প টিকিয়ে রাখাকে চ্যালেঞ্জিং করে তুলেছে। এই নগদ সংকট মোকাবেলা এবং উৎপাদন ব্যবস্থা সচল রাখার জন্য দ্রুত প্রণোদনার অর্থ ছাড় ও সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা না পেলে কারখানাগুলোর উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার এবং শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধে জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিজিএমইএ গভর্নরকে দেওয়া এক চিঠিতে উল্লেখ করেছে যে, বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠানের ঋণের আবেদন লিয়েন ব্যাংকগুলোতে জমা রয়েছে, কিছু ফাইল বাংলাদেশ ব্যাংকে অডিট প্রক্রিয়ার অধীনে এবং কিছু ফাইল সব ধরনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে অর্থ ছাড়ের অপেক্ষায় রয়েছে। এই তহবিলগুলো দ্রুত ছাড় করা হলে কারখানাগুলো তাদের নগদ প্রবাহ ব্যবস্থাপনায় কিছুটা স্বস্তি পাবে এবং নিয়মিত মজুরি ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় নির্বাহ করতে সক্ষম হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ পর্যন্ত মোট আড়াই হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা ছাড় করা হয়েছে। তবে, বস্ত্র ও পোশাক খাতে প্রায় পাঁচ হাজার ৭০০ কোটি টাকার প্রণোদনা এখনো আটকে আছে। বিজিএমইএ এই আটকে থাকা অর্থ দ্রুত ছাড়ের জন্য জোর দাবি জানিয়েছে।

চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, মাসিক মজুরির জন্য প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হয়। সেই হিসাবে, আসন্ন ঈদের আগে দুই মাসের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ সহজ শর্তে ঋণ হিসেবে প্রদান করা অত্যন্ত জরুরি। প্রস্তাবিত এই ঋণের পরিশোধের জন্য তিন মাস গ্রেস পিরিয়ডসহ মোট ১২ মাসের সময়সীমা চেয়েছেন তারা।

এছাড়াও, প্রচলিত ঋণসীমার বাইরে বিশেষ বিবেচনায় ‘সফট লোন’ সুবিধা চালু করা, প্যাকিং ক্রেডিট পুনরায় কার্যকর করা এবং সুদের হার সাত শতাংশে নামিয়ে আনার দাবি জানানো হয়েছে। প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট খাতে পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের আকার পাঁচ হাজার কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০ হাজার কোটি টাকা করার এবং তহবিলের মেয়াদ ২০৩০ সাল পর্যন্ত বৃদ্ধির প্রস্তাবও করা হয়েছে। পাশাপাশি, বিজিএমইএ কর্তৃক প্রেরিত তালিকা অনুযায়ী এসএমই শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অনুকূলে নগদ সহায়তার অর্থ দ্রুত ছাড়ের দাবি জানানো হয়।

বিজিএমইএ নেতারা মনে করছেন, শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও বোনাস সময়মতো পরিশোধ না হলে দেশে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। জাতীয় অর্থনীতির চাকা সচল রাখা এবং লাখ লাখ শ্রমিকের জীবন-জীবিকা সুরক্ষায় সরকারের সময়োপযোগী ও সহানুভূতিশীল পদক্ষেপ এই মুহূর্তে অত্যন্ত জরুরি। সংকট উত্তরণে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ শিল্প, শ্রমিক এবং সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের সহায়তা হিসেবে কাজ করবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেছেন।