শরীফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পর প্রায় দুই মাস অতিবাহিত হলেও, এই নৃশংস অপরাধের পেছনে মূল পরিকল্পনাকারী, তাদের সহযোগী এবং এই হত্যার উদ্দেশ্য এখনো রহস্যাবৃত। বাংলাদেশ পুলিশের তদন্ত কোন পথে এগোচ্ছে বা আদৌ তারা প্রকৃত সত্য উদঘাটনে সচেষ্ট কিনা, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়ে গেছে। কে বা কারা এই ভাড়াটে খুনিকে নিয়োগ করেছিল, তার উদ্দেশ্য কী ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অধরা। সম্প্রতি কানাডা ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ঘটে যাওয়া একই ধরনের ‘টার্গেট কিলিং’ বা লক্ষ্যবস্তু হত্যা এবং একটি হত্যা পরিকল্পনার ঘটনা ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এই দুটি ঘটনার কার্যপদ্ধতি (modus operandi) হাদি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে লক্ষণীয়ভাবে মিলে যায়।
কানাডায় ‘টার্গেট কিলিং’ এবং আন্তর্জাতিক টানাপোড়েন:
২০২৩ সালের ১৮ জুন কানাডার ব্রিটিশ কলম্বিয়া প্রদেশের সারে শহরে হরদীপ সিং নিজ্জর নামের এক ভারতীয়-কানাডিয়ান শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতাকে মুখোশধারী দুই ব্যক্তি গুলি করে হত্যা করে। নিহতের শরীরে ৩৪টি গুলি পাওয়া যায়। এই হত্যাকাণ্ডে মোট ছয়জন জড়িত ছিল বলে ধারণা করা হয়। পেশাদার খুনিরা ঘটনাস্থল থেকে হেঁটে একটি অপেক্ষমাণ গাড়িতে উঠে পালিয়ে যায়। ধারণা করা হয়, খুনিরা ভারতীয় পেশাদার খুনি অথবা দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর স্লিপার সেলের সদস্য ছিল। কানাডার গোয়েন্দা পুলিশ নিজ্জরকে সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে আগেই সতর্ক করেছিল, কিন্তু তিনি শেষ পর্যন্ত রক্ষা পাননি।
এই ঘটনার পর কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো নিজ্জর হত্যাকাণ্ডে ভারতের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তোলেন, যা দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি করে। ভারত অভিযোগ অস্বীকার করে। পরবর্তীতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও তাদের ভূখণ্ডে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে এমন হত্যা পরিকল্পনার বিষয়টি প্রকাশ করে, যা ভারতের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়।
যুক্তরাষ্ট্রে ব্যর্থ ‘র’ মিশন ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সংকট:
কানাডায় নিজ্জর হত্যাকাণ্ডের পর, ‘র’ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও গুরপতওয়ান্ত সিং পান্নুন নামের আরেক খালিস্তানপন্থী শিখ নেতাকে হত্যার পরিকল্পনা করে। এই পরিকল্পনার জন্য ‘র’ নিখিল গুপ্ত নামক এক আন্তর্জাতিক খুনিকে ভাড়া করে। তবে, এই মিশনে ‘র’ একটি বড় ভুল করে বসে। তারা যে ব্যক্তিকে ভাড়া করেছিল, সে ছিল মার্কিন পুলিশের একজন ‘আন্ডারকভার এজেন্ট’। নিখিল গুপ্ত শুধু পান্নুনকে হত্যার পরিকল্পনা জানায়নি, বরং কানাডায় ‘র’-এর কার্যক্রমের তথ্যও ফাঁস করে দেয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই তথ্য কানাডাকে জানায়, যার ফলে ট্রুডো ভারতের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তোলার সাহস পান।
নিখিল গুপ্ত পান্নুনকে হত্যার জন্য এক লাখ ডলারের চুক্তি করেছিল এবং অগ্রিম কিছু অর্থ মার্কিন পুলিশকে প্রদানও করেছিল। এই ঘটনার পর নিখিল গুপ্তকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং সে মার্কিন বিচার বিভাগের কাছে অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দেয়। মার্কিন চাপের মুখে ভারত সরকার ‘র’ কর্মকর্তা বিকাশ যাদবকে গ্রেপ্তার করে নিজেদের দায় এড়ানোর চেষ্টা করছে।
ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড: ‘র’ এবং এদেশীয় স্লিপার সেলের সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতা:
ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কানাডা ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘটনার কার্যপদ্ধতির মিল স্পষ্ট। ঘটনার কিছুদিন আগে হাদির সঙ্গে প্রধান সন্দেহভাজন হত্যাকারীর ঘনিষ্ঠতা দেখা যায়, যা একটি সুপরিকল্পিত অনুপ্রবেশের ইঙ্গিত দেয়। একজন চিহ্নিত ফ্যাসিস্ট ক্যাডার কীভাবে হাদির এত দ্রুত বিশ্বস্ত হয়ে উঠতে পারে, তা একটি বড় প্রশ্ন। এই প্রেক্ষাপটে, হাদি হত্যায় ভারতীয় ‘র’ এবং তাদের এদেশীয় স্লিপার সেলের উপস্থিতির সম্ভাবনা প্রবল।
ঘটনার দিন ফয়সল করিম মাসুদ হাদিকে গুলি করে এবং আলমগীর শেখ মোটরসাইকেল চালায়। এরপর তারা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত তথ্য অনুযায়ী, হত্যাকারীরা অল্প সময়ের মধ্যেই ভারত সীমান্ত অতিক্রম করে পালিয়ে যায়। পুলিশের ভাষ্যমতে, দুই বাংলাদেশি নাগরিক ফিলিপ পাল এবং সঞ্জয় তাদের ময়মনসিংহ সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশে সহায়তা করে। তবে মেঘালয় রাজ্য পুলিশ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। উভয় পক্ষই হত্যাকারীদের ভারত সীমান্ত অতিক্রমের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে, যা তাদের অবিশ্বাস্য দ্রুততা এবং পূর্বপরিকল্পনার ইঙ্গিত দেয়।
রহস্যের গভীরে প্রশ্ন এবং প্রত্যাশা:
ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের তদন্তের ক্ষেত্রে একটি বড় প্রশ্ন হলো, আলজাজিরার সাংবাদিক পরিচয়দানকারী ব্যক্তিটি কীভাবে এই গোপন ও সংবেদনশীল তথ্য পেলেন? তার সামরিক গোয়েন্দাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের গুঞ্জন রয়েছে, যা এই রহস্যকে আরও ঘনীভূত করেছে।
কানাডায় শিখ নেতা নিজ্জরের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে হাদি হত্যার পালিয়ে যাওয়ার ঘটনার তুলনা করলে দেখা যায়, উভয় ক্ষেত্রেই হত্যাকারীরা অত্যন্ত দ্রুত এবং সুপরিকল্পিতভাবে সীমান্ত পার হতে সক্ষম হয়েছে। কানাডার তদন্ত এখনো চলছে এবং সেখানে তিনজন ভারতীয় গ্রেপ্তার হয়েছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশে সঠিক তদন্ত হবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তদন্তে জাতিসংঘের সহায়তা চেয়ে আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়ে একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ নিয়েছে। বর্তমান নির্বাচিত সরকার যদি এই তদন্তে আন্তরিক হয় এবং মার্কিন এফবিআই ও কানাডার গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সহায়তা গ্রহণ করে, তবে ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন সম্ভব হতে পারে। সারা বিশ্বে আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে পেশাদারিত্ব, সততা এবং স্বচ্ছতা বজায় থাকুক—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
রিপোর্টারের নাম 























