ঢাকা ০৮:৩০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

পিলখানা ট্র্যাজেডির দেড় দশক: সত্য উন্মোচন ও পূর্ণাঙ্গ ন্যায়বিচারের প্রতীক্ষায় জাতি

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:৪৪:৫২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ১ বার পড়া হয়েছে

২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর) সদর দপ্তর পিলখানায় সংঘটিত বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও সামরিক ইতিহাসের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। বার্ষিক ‘বিডিআর সপ্তাহ’ চলাকালীন শুরু হওয়া সেই বিদ্রোহ দ্রুতই এক রক্তক্ষয়ী মরণযজ্ঞে রূপ নেয়। দুই দিনব্যাপী চলা সেই নৃশংসতায় প্রাণ হারান ৭৪ জন, যার মধ্যে ৫৭ জনই ছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চৌকস কর্মকর্তা। তৎকালীন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদসহ লেফটেন্যান্ট কর্নেল থেকে শুরু করে ক্যাপ্টেন পদমর্যাদার বহু কর্মকর্তাকে অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। রেহাই পাননি পরিবারের সদস্য ও বেসামরিক কর্মচারীরাও। পিলখানার সেই পৈশাচিকতা, মরদেহ বিকৃতকরণ এবং গণকবরের দৃশ্য আজও জাতীয় স্মৃতিতে এক গভীর ক্ষত হিসেবে রয়ে গেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, পিলখানার সেই ঘটনা কেবল একটি বাহিনীর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলাভঙ্গ বা দাবি-দাওয়ার প্রতিবাদ ছিল না। সহিংসতার ধরন, সুসংগঠিত পরিকল্পনা এবং সুনির্দিষ্টভাবে সেনাবাহিনীর সিনিয়র কর্মকর্তাদের লক্ষ্যবস্তু করা বড় ধরনের ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত দেয়। দ্রুত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা এবং অস্ত্রাগার দখলের মতো ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, এটি ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত। এই ট্র্যাজেডি কেবল মানবিক বিপর্যয়ই নয়, বরং দেশের সামরিক চেইন অব কমান্ডের ওপর ছিল এক সরাসরি আঘাত। একসঙ্গে এত সংখ্যক অভিজ্ঞ কর্মকর্তার মৃত্যু বাহিনীর দীর্ঘমেয়াদী মনোবল ও সক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, যা কাটিয়ে ওঠা একটি পেশাদার বাহিনীর জন্য অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং ছিল।

ঘটনার পরবর্তী সময়ে সরকার একাধিক তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু করে। দেশের ইতিহাসে বৃহত্তম এই গণবিচারে হত্যা ও বিদ্রোহ—এই দুই ধারায় মামলা পরিচালিত হয়। ২০১৩ সালে নিম্ন আদালতের রায়ে ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং শত শত সদস্যকে বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২০১৭ সালে হাইকোর্ট ১৩৯ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে। তবে এই বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে আইন বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মধ্যে নানা বিতর্ক রয়েছে। সমালোচকদের মতে, অপরাধীদের সাজা নিশ্চিত করা হলেও বিদ্রোহের নেপথ্যের মূল পরিকল্পনাকারী বা কোনো বহিরাগত শক্তির সম্পৃক্ততা ছিল কি না, তা আজও অস্পষ্ট রয়ে গেছে। ২০১০ সালে বিডিআর-এর নাম পরিবর্তন করে ‘বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ’ (বিজিবি) রাখা এবং আইনগত সংস্কারের মাধ্যমে শৃঙ্খলা ফেরানোর চেষ্টা করা হলেও, ঘটনার পূর্ণাঙ্গ সত্য উদঘাটন ছাড়া জাতীয় আস্থা পুরোপুরি ফেরানো সম্ভব হয়নি।

দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে পিলখানা হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে কোনো গভীর ষড়যন্ত্র বা আন্তর্জাতিক যোগসূত্র ছিল কি না, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েই গেছে। সম্প্রতি অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এএলএম ফজলুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত স্বাধীন তদন্ত কমিশন ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। যদিও প্রতিবেদনটি এখনো জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি, তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে যে, কমিশন ঘটনার সমন্বিত চরিত্র এবং বহিরাগত অর্থায়ন বা প্ররোচনার সম্ভাবনাকে গুরুত্বের সাথে বিশ্লেষণ করেছে। যদি বিদেশি কোনো শক্তির সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হয়, তবে এটি কেবল অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যর্থতা নয়, বরং জাতীয় সার্বভৌমত্বের জন্য এক চরম উদ্বেগের বিষয়।

বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবং নতুন সরকারের অধীনে পিলখানা হত্যাকাণ্ডের শ্বেতপত্র প্রকাশ এখন সময়ের দাবি। নিহত সেনা কর্মকর্তাদের পরিবারগুলো দেড় দশক ধরে কেবল বিচার নয়, বরং সত্যের অপেক্ষায় দিন গুনছে। সশস্ত্র বাহিনীর পেশাদার মর্যাদা ও আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধারের জন্য চেইন অব কমান্ডের ওপর হওয়া এই আঘাতের পূর্ণাঙ্গ রহস্য উন্মোচন করা অপরিহার্য। আংশিক তথ্য বা রাজনৈতিক সুবিধাজনক ব্যাখ্যা জনমনে কেবল বিভ্রান্তিই বাড়াবে। তাই তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট পূর্ণাঙ্গভাবে প্রকাশ করা এখন রাষ্ট্রের নৈতিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নতুন সরকারের সামনে এটি একটি বড় পরীক্ষা। অতীতের অস্বচ্ছতা কাটিয়ে তদন্ত কমিশনের সুপারিশগুলো সংসদীয় বিতর্কে আনা এবং প্রয়োজনে পুনঃতদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য বের করে আনাই হবে ন্যায়বিচারের পথে বড় পদক্ষেপ। আইনের শাসন মানে কেবল অপরাধীর দণ্ড নয়, বরং ঘটনার নেপথ্যে থাকা প্রতিটি কুশীলবকে চিহ্নিত করা। পিলখানা হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত ইতিহাস ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা এবং রাষ্ট্রীয় আর্কাইভে প্রামাণ্য দলিল হিসেবে রাখা প্রয়োজন। স্বচ্ছতা রাষ্ট্রকে দুর্বল করে না, বরং শক্তিশালী করে। সত্যের মুখোমুখি হওয়ার সাহসই একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তির পরিচয়। জাতি আশা করে, পিলখানা ট্র্যাজেডির এই অমীমাংসিত অধ্যায়ের অবসান ঘটবে এবং পূর্ণাঙ্গ ন্যায়বিচারের মাধ্যমে শহীদদের পরিবার ও সশস্ত্র বাহিনীর মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

মাঠের রাজা হলেও যে অপূর্ণতা আজও পোড়ায় মেসিকে

পিলখানা ট্র্যাজেডির দেড় দশক: সত্য উন্মোচন ও পূর্ণাঙ্গ ন্যায়বিচারের প্রতীক্ষায় জাতি

আপডেট সময় : ০৯:৪৪:৫২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর) সদর দপ্তর পিলখানায় সংঘটিত বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও সামরিক ইতিহাসের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। বার্ষিক ‘বিডিআর সপ্তাহ’ চলাকালীন শুরু হওয়া সেই বিদ্রোহ দ্রুতই এক রক্তক্ষয়ী মরণযজ্ঞে রূপ নেয়। দুই দিনব্যাপী চলা সেই নৃশংসতায় প্রাণ হারান ৭৪ জন, যার মধ্যে ৫৭ জনই ছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চৌকস কর্মকর্তা। তৎকালীন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদসহ লেফটেন্যান্ট কর্নেল থেকে শুরু করে ক্যাপ্টেন পদমর্যাদার বহু কর্মকর্তাকে অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। রেহাই পাননি পরিবারের সদস্য ও বেসামরিক কর্মচারীরাও। পিলখানার সেই পৈশাচিকতা, মরদেহ বিকৃতকরণ এবং গণকবরের দৃশ্য আজও জাতীয় স্মৃতিতে এক গভীর ক্ষত হিসেবে রয়ে গেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, পিলখানার সেই ঘটনা কেবল একটি বাহিনীর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলাভঙ্গ বা দাবি-দাওয়ার প্রতিবাদ ছিল না। সহিংসতার ধরন, সুসংগঠিত পরিকল্পনা এবং সুনির্দিষ্টভাবে সেনাবাহিনীর সিনিয়র কর্মকর্তাদের লক্ষ্যবস্তু করা বড় ধরনের ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত দেয়। দ্রুত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা এবং অস্ত্রাগার দখলের মতো ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, এটি ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত। এই ট্র্যাজেডি কেবল মানবিক বিপর্যয়ই নয়, বরং দেশের সামরিক চেইন অব কমান্ডের ওপর ছিল এক সরাসরি আঘাত। একসঙ্গে এত সংখ্যক অভিজ্ঞ কর্মকর্তার মৃত্যু বাহিনীর দীর্ঘমেয়াদী মনোবল ও সক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, যা কাটিয়ে ওঠা একটি পেশাদার বাহিনীর জন্য অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং ছিল।

ঘটনার পরবর্তী সময়ে সরকার একাধিক তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু করে। দেশের ইতিহাসে বৃহত্তম এই গণবিচারে হত্যা ও বিদ্রোহ—এই দুই ধারায় মামলা পরিচালিত হয়। ২০১৩ সালে নিম্ন আদালতের রায়ে ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং শত শত সদস্যকে বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২০১৭ সালে হাইকোর্ট ১৩৯ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে। তবে এই বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে আইন বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মধ্যে নানা বিতর্ক রয়েছে। সমালোচকদের মতে, অপরাধীদের সাজা নিশ্চিত করা হলেও বিদ্রোহের নেপথ্যের মূল পরিকল্পনাকারী বা কোনো বহিরাগত শক্তির সম্পৃক্ততা ছিল কি না, তা আজও অস্পষ্ট রয়ে গেছে। ২০১০ সালে বিডিআর-এর নাম পরিবর্তন করে ‘বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ’ (বিজিবি) রাখা এবং আইনগত সংস্কারের মাধ্যমে শৃঙ্খলা ফেরানোর চেষ্টা করা হলেও, ঘটনার পূর্ণাঙ্গ সত্য উদঘাটন ছাড়া জাতীয় আস্থা পুরোপুরি ফেরানো সম্ভব হয়নি।

দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে পিলখানা হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে কোনো গভীর ষড়যন্ত্র বা আন্তর্জাতিক যোগসূত্র ছিল কি না, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েই গেছে। সম্প্রতি অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এএলএম ফজলুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত স্বাধীন তদন্ত কমিশন ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। যদিও প্রতিবেদনটি এখনো জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি, তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে যে, কমিশন ঘটনার সমন্বিত চরিত্র এবং বহিরাগত অর্থায়ন বা প্ররোচনার সম্ভাবনাকে গুরুত্বের সাথে বিশ্লেষণ করেছে। যদি বিদেশি কোনো শক্তির সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হয়, তবে এটি কেবল অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যর্থতা নয়, বরং জাতীয় সার্বভৌমত্বের জন্য এক চরম উদ্বেগের বিষয়।

বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবং নতুন সরকারের অধীনে পিলখানা হত্যাকাণ্ডের শ্বেতপত্র প্রকাশ এখন সময়ের দাবি। নিহত সেনা কর্মকর্তাদের পরিবারগুলো দেড় দশক ধরে কেবল বিচার নয়, বরং সত্যের অপেক্ষায় দিন গুনছে। সশস্ত্র বাহিনীর পেশাদার মর্যাদা ও আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধারের জন্য চেইন অব কমান্ডের ওপর হওয়া এই আঘাতের পূর্ণাঙ্গ রহস্য উন্মোচন করা অপরিহার্য। আংশিক তথ্য বা রাজনৈতিক সুবিধাজনক ব্যাখ্যা জনমনে কেবল বিভ্রান্তিই বাড়াবে। তাই তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট পূর্ণাঙ্গভাবে প্রকাশ করা এখন রাষ্ট্রের নৈতিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নতুন সরকারের সামনে এটি একটি বড় পরীক্ষা। অতীতের অস্বচ্ছতা কাটিয়ে তদন্ত কমিশনের সুপারিশগুলো সংসদীয় বিতর্কে আনা এবং প্রয়োজনে পুনঃতদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য বের করে আনাই হবে ন্যায়বিচারের পথে বড় পদক্ষেপ। আইনের শাসন মানে কেবল অপরাধীর দণ্ড নয়, বরং ঘটনার নেপথ্যে থাকা প্রতিটি কুশীলবকে চিহ্নিত করা। পিলখানা হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত ইতিহাস ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা এবং রাষ্ট্রীয় আর্কাইভে প্রামাণ্য দলিল হিসেবে রাখা প্রয়োজন। স্বচ্ছতা রাষ্ট্রকে দুর্বল করে না, বরং শক্তিশালী করে। সত্যের মুখোমুখি হওয়ার সাহসই একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তির পরিচয়। জাতি আশা করে, পিলখানা ট্র্যাজেডির এই অমীমাংসিত অধ্যায়ের অবসান ঘটবে এবং পূর্ণাঙ্গ ন্যায়বিচারের মাধ্যমে শহীদদের পরিবার ও সশস্ত্র বাহিনীর মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে।