ঢাকা ০৫:১১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে ব্যবসা বন্ধের হুঁশিয়ারি, ব্যবসায়ীদের দাবি স্বচ্ছতা ও আইনের শাসন

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১০:২১:৫২ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে এবং অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নয়ন ও চাঁদাবাজি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। সংগঠনটি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে, তাদের এই দাবি পূরণ না হলে ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ার মতো কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবেন তারা।

গত সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) মতিঝিলের ডিসিসিআই অডিটোরিয়ামে ‘বিদ্যমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে নবগঠিত সরকারের নিকট ডিসিসিআইর প্রত্যাশা’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়। সংবাদ সম্মেলনে ডিসিসিআই সভাপতি তাসকিন আহমেদ দেশের অর্থনীতি ও বাণিজ্যের সামগ্রিক চিত্র উপস্থাপন করেন।

তাসকিন আহমেদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের রক্তে রক্তে চাঁদাবাজি ঢুকে গেছে। ফ্যাক্টরিতে ট্রাক ঢোকা থেকে শুরু করে বের হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে চাঁদা দিতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল হচ্ছে, যার ফলে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত রাস্তায় নামতে বাধ্য হচ্ছে।”

তিনি দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে বলেন, ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও অনিয়ম কমেনি, বরং কিছু ক্ষেত্রে এর বিস্তৃতি ঘটেছে। পুলিশ, প্রশাসন, আয়কর দপ্তরসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতার অভাব স্পষ্ট। এই সমস্যাগুলোর সমাধান না হলে অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ডিসিসিআইয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, চাঁদাবাজি এবং অনানুষ্ঠানিক লেনদেনের কারণে ব্যবসার ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা নতুন বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে। সংগঠনটির মতে, উৎপাদক পর্যায়ে পণ্য স্বল্পমূল্যে বিক্রি হলেও অবৈধ আদায় এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যের কারণে বাজারে ভোক্তাদের পণ্যের জন্য বহুগুণ বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।

সংবাদ সম্মেলনে সরকারের কাছে চারটি প্রধান দাবি উত্থাপন করা হয়। এগুলো হলো: দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কার্যকর উন্নয়ন, চাঁদাবাজি সম্পূর্ণভাবে নির্মূল, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্নীতিমুক্ত করা এবং বিনিয়োগবান্ধব আর্থিক নীতি প্রণয়ন। পাশাপাশি, ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণখেলাপি নয় এমন ব্যবসায়ীদের পুনঃঅর্থায়নের মাধ্যমে ব্যবসায় ফিরিয়ে আনা এবং ব্যাংক ঋণের সুদহার সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনার আহ্বান জানানো হয়।

রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার প্রসঙ্গে তাসকিন আহমেদ বলেন, কর কাঠামো জটিল হওয়ায় কর-জিডিপি অনুপাত কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বাড়ছে না। এ জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের পৃথকীকরণ এবং দ্রুত অটোমেশন প্রয়োজন। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করলে স্বল্প সময়ের মধ্যেই এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব।

বিনিয়োগ সহজীকরণের বিষয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সিঙ্গেল উইন্ডো ব্যবস্থা কার্যকর করার তাগিদ দেন ডিসিসিআই সভাপতি। তাঁর মতে, অতিরিক্ত কাগজপত্র এবং দীর্ঘসূত্রতা উদ্যোক্তাদের জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।

শ্রমবাজার পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয় সংবাদ সম্মেলনে। ডিসিসিআই জানায়, দেশে প্রায় ২৬ লাখ মানুষ কর্মহীন অবস্থায় রয়েছে। কারিগরি শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে বেসরকারি খাতকে শক্তিশালী করা গেলে কর্মসংস্থান বাড়বে এবং চাঁদাবাজির প্রবণতাও ধীরে ধীরে কমে আসবে বলে সংগঠনটি বিশ্বাস করে।

ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক ইস্যুতে বেসরকারি খাতের একাধিক অনুরোধ সত্ত্বেও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাড়াহুড়ো করে যুক্তরাষ্ট্রপন্থি চুক্তি সই করেছে বলে অভিযোগ করেন তাসকিন আহমেদ। চুক্তিটি পুনর্বিবেচনার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের রায়ের মাধ্যমে চুক্তিটি অবৈধ ঘোষিত হলে ভালো, নতুবা নতুন সরকারকে দ্রুত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

রপ্তানি বৈচিত্র্য বাড়ানোর লক্ষ্যে চামড়া, হালকা প্রকৌশলসহ মোট ৩০টি খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে উন্নয়নের ওপর জোর দেয় সংগঠনটি। ডিসিসিআই নেতারা মনে করেন, এসব খাতে পরিকল্পিত সহায়তা প্রদান করলে অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে এবং উদ্যোক্তাদের আস্থা পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে। সংবাদ সম্মেলনে ডিসিসিআইয়ের অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় নেতারাও উপস্থিত ছিলেন।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

রাজনগরে ক্রিকেট খেলা নিয়ে বিরোধ: ছুরিকাঘাতে হিফজ বিভাগের ছাত্র নিহত

চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে ব্যবসা বন্ধের হুঁশিয়ারি, ব্যবসায়ীদের দাবি স্বচ্ছতা ও আইনের শাসন

আপডেট সময় : ১০:২১:৫২ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে এবং অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নয়ন ও চাঁদাবাজি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। সংগঠনটি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে, তাদের এই দাবি পূরণ না হলে ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ার মতো কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবেন তারা।

গত সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) মতিঝিলের ডিসিসিআই অডিটোরিয়ামে ‘বিদ্যমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে নবগঠিত সরকারের নিকট ডিসিসিআইর প্রত্যাশা’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়। সংবাদ সম্মেলনে ডিসিসিআই সভাপতি তাসকিন আহমেদ দেশের অর্থনীতি ও বাণিজ্যের সামগ্রিক চিত্র উপস্থাপন করেন।

তাসকিন আহমেদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের রক্তে রক্তে চাঁদাবাজি ঢুকে গেছে। ফ্যাক্টরিতে ট্রাক ঢোকা থেকে শুরু করে বের হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে চাঁদা দিতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল হচ্ছে, যার ফলে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত রাস্তায় নামতে বাধ্য হচ্ছে।”

তিনি দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে বলেন, ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও অনিয়ম কমেনি, বরং কিছু ক্ষেত্রে এর বিস্তৃতি ঘটেছে। পুলিশ, প্রশাসন, আয়কর দপ্তরসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতার অভাব স্পষ্ট। এই সমস্যাগুলোর সমাধান না হলে অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ডিসিসিআইয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, চাঁদাবাজি এবং অনানুষ্ঠানিক লেনদেনের কারণে ব্যবসার ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা নতুন বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে। সংগঠনটির মতে, উৎপাদক পর্যায়ে পণ্য স্বল্পমূল্যে বিক্রি হলেও অবৈধ আদায় এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যের কারণে বাজারে ভোক্তাদের পণ্যের জন্য বহুগুণ বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।

সংবাদ সম্মেলনে সরকারের কাছে চারটি প্রধান দাবি উত্থাপন করা হয়। এগুলো হলো: দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কার্যকর উন্নয়ন, চাঁদাবাজি সম্পূর্ণভাবে নির্মূল, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্নীতিমুক্ত করা এবং বিনিয়োগবান্ধব আর্থিক নীতি প্রণয়ন। পাশাপাশি, ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণখেলাপি নয় এমন ব্যবসায়ীদের পুনঃঅর্থায়নের মাধ্যমে ব্যবসায় ফিরিয়ে আনা এবং ব্যাংক ঋণের সুদহার সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনার আহ্বান জানানো হয়।

রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার প্রসঙ্গে তাসকিন আহমেদ বলেন, কর কাঠামো জটিল হওয়ায় কর-জিডিপি অনুপাত কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বাড়ছে না। এ জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের পৃথকীকরণ এবং দ্রুত অটোমেশন প্রয়োজন। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করলে স্বল্প সময়ের মধ্যেই এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব।

বিনিয়োগ সহজীকরণের বিষয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সিঙ্গেল উইন্ডো ব্যবস্থা কার্যকর করার তাগিদ দেন ডিসিসিআই সভাপতি। তাঁর মতে, অতিরিক্ত কাগজপত্র এবং দীর্ঘসূত্রতা উদ্যোক্তাদের জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।

শ্রমবাজার পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয় সংবাদ সম্মেলনে। ডিসিসিআই জানায়, দেশে প্রায় ২৬ লাখ মানুষ কর্মহীন অবস্থায় রয়েছে। কারিগরি শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে বেসরকারি খাতকে শক্তিশালী করা গেলে কর্মসংস্থান বাড়বে এবং চাঁদাবাজির প্রবণতাও ধীরে ধীরে কমে আসবে বলে সংগঠনটি বিশ্বাস করে।

ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক ইস্যুতে বেসরকারি খাতের একাধিক অনুরোধ সত্ত্বেও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাড়াহুড়ো করে যুক্তরাষ্ট্রপন্থি চুক্তি সই করেছে বলে অভিযোগ করেন তাসকিন আহমেদ। চুক্তিটি পুনর্বিবেচনার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের রায়ের মাধ্যমে চুক্তিটি অবৈধ ঘোষিত হলে ভালো, নতুবা নতুন সরকারকে দ্রুত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

রপ্তানি বৈচিত্র্য বাড়ানোর লক্ষ্যে চামড়া, হালকা প্রকৌশলসহ মোট ৩০টি খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে উন্নয়নের ওপর জোর দেয় সংগঠনটি। ডিসিসিআই নেতারা মনে করেন, এসব খাতে পরিকল্পিত সহায়তা প্রদান করলে অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে এবং উদ্যোক্তাদের আস্থা পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে। সংবাদ সম্মেলনে ডিসিসিআইয়ের অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় নেতারাও উপস্থিত ছিলেন।