যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতিতে আকস্মিক পরিবর্তন বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঘোষণা অনুযায়ী, বিশ্বের সব দেশের ওপর আরোপিত ১৫ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্ক আপাতদৃষ্টিতে কিছুটা স্বস্তি দিলেও, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১০ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশে উন্নীত হওয়ার এ সিদ্ধান্ত নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। যদিও নতুন এ হার বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তিতে নির্ধারিত ১৯ শতাংশের চেয়ে কম, তবুও নীতিগত এই দোলাচল দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তার জন্ম দিয়েছে।
মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ট্রাম্প ১৫০ দিনের জন্য ১৫ শতাংশ ট্যারিফ আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। এর আগে ১০ শতাংশ শুল্ক মঙ্গলবার থেকে কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও, এখন ১৫ শতাংশের নতুন হার কবে থেকে কার্যকর হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। এই শুল্ক কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের সঙ্গে চীন, ভিয়েতনাম, ভারতসহ অন্যান্য রপ্তানিকারক দেশের প্রতিযোগিতা ২০২৫ সালের এপ্রিলের আগের পরিস্থিতির মতোই থাকবে, যখন নির্দিষ্ট কিছু দেশের জন্য উচ্চতর পাল্টা শুল্ক প্রযোজ্য ছিল।
ট্রাম্পের নতুন এই শুল্ক ঘোষণার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাণিজ্য কাঠামোয় একটি পরিবর্তনের আভাস মিলছে। রপ্তানিকারকরা মনে করছেন, সমান শুল্ক কাঠামো প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশকে তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে আসতে পারে। ১৫ শতাংশ শুল্কারোপ করা হলেও এটি ট্রাম্পের পূর্ববর্তী ‘রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ’-এর চেয়ে কম হওয়ায় মার্কিন আমদানিকারকরা আগের চেয়ে কম খরচে পোশাক আমদানি করতে পারবেন। এর প্রভাবে দেশটির খুচরা বাজারে তৈরি পোশাকের দাম কমবে এবং সাধারণ ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে, যা শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের রপ্তানি বৃদ্ধির পথ সুগম করতে পারে।
তবে শুল্ক নিয়ে চলমান বৈশ্বিক অস্থিরতায় ট্রাম্প প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে এবং বাংলাদেশের সঙ্গে হওয়া সাম্প্রতিক বাণিজ্য চুক্তির ভবিষ্যৎ কী, তা নিয়ে নানা প্রশ্ন সামনে আসছে। শুল্ক বাতিল হলেও চুক্তির অন্য শর্তগুলো বহাল থাকবে কিনা, এ প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, ট্রাম্পের পূর্ববর্তী রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ বাতিল হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাক্ষরিত বর্তমান বাণিজ্য চুক্তিটিও বাতিল হয়ে যাবে।
অন্যদিকে, বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের পক্ষে এ ধরনের চুক্তি থেকে সরাসরি বেরিয়ে আসা সহজ হবে না। চুক্তি থেকে সরে এলে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশকে বিরূপ পরিস্থিতির মুখে পড়তে হতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে চুক্তির শর্তগুলো মেনে চলার জন্য চাপ আসতে পারে। তবে পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজ উল্লেখ করেছেন, যেহেতু ট্রাম্পের আরোপিত পাল্টা শুল্ককে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট অবৈধ ঘোষণা করেছে, সেহেতু চুক্তিতে উল্লিখিত সাড়ে ৩৭ শতাংশ শুল্কারোপের ভয় আর নেই। এটি বাংলাদেশের জন্য চুক্তি থেকে সরে আসার অথবা দেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হয়েছে এমন শর্তগুলো নিয়ে নতুন করে আলোচনার একটি সুযোগ তৈরি করেছে। তিনি পরামর্শ দেন, পুরোপুরি চুক্তি থেকে সরে না এসে, যেসব শর্তে বাংলাদেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হয়েছে, সেসব নিয়ে নতুন করে দরকষাকষির পথ তৈরি করা উচিত।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি বাজার, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের জন্য। অতিরিক্ত শুল্ক কার্যকর থাকাকালে অনেক ক্রেতা মূল্যছাড় দাবি করেন বা অর্ডার স্থগিত রাখেন, যা উৎপাদন পরিকল্পনা ও মুনাফায় চাপ সৃষ্টি করে। ১৯ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশে নেমে আসা ট্যারিফ বাংলাদেশের জন্য স্বল্পমেয়াদে সুখবর হলেও, ১৫০ দিনের পর নতুন রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত কী হবে, তা যুক্তরাষ্ট্রের তদন্ত ও নীতিমালার ওপর নির্ভর করছে। তাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, কৌশলগত সিদ্ধান্ত এবং নীতিগত দৃঢ়তা বজায় রাখা। কারণ, এই সুবিধা কেবল বাংলাদেশের জন্য নয়; চীন, ভিয়েতনাম, ভারতসহ অন্যান্য রপ্তানিকারক দেশও একই সিদ্ধান্তের আওতায় আসবে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হতে পারে এবং এই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা অপরিহার্য।
রিপোর্টারের নাম 























