স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে চূড়ান্ত উত্তরণের সময়সীমা আরও তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার জন্য জাতিসংঘের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং বৈশ্বিক নানা চ্যালেঞ্জ বিবেচনা করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গত বুধবার অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী স্বাক্ষরিত একটি চিঠি জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) কাছে পাঠানো হয়েছে।
ইআরডি সূত্রে জানা গেছে, ওই চিঠিতে এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতির সময়কাল ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে। আগের নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশের এই উত্তরণ সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। বর্তমানে এই চূড়ান্ত উত্তরণ প্রক্রিয়ার তৃতীয় পর্যালোচনা চলছে।
জাতিসংঘের কাছে পাঠানো চিঠিতে বাংলাদেশ উল্লেখ করেছে, এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের জন্য যে প্রস্তুতির সময় পাওয়া গিয়েছিল, তার একটি বড় অংশ অতিবাহিত হয়েছে কোভিড-১৯ মহামারির পরবর্তী ধাক্কা সামলাতে। এর পরপরই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের আকাশচুম্বী দাম, বিশ্বজুড়ে কঠোর মুদ্রানীতি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং বিশ্ব বাণিজ্যে চলমান অস্থিরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির সীমাবদ্ধতার কথাও চিঠিতে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, দেশে বিনিয়োগের হার হ্রাস, রাজস্ব আদায়ে মন্থর গতি এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার ফলে প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কারগুলো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছাতে পারেনি। ফলে এলডিসি পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যে ধরনের নীতিগত ও অবকাঠামোগত প্রস্তুতি দরকার ছিল, তা এখনো পুরোপুরি সম্পন্ন হয়নি।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বর্তমান বৈশ্বিক বাণিজ্যিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে রয়েছে। বিশেষ করে ইউরোপীয় বাজারে ‘জিএসপি প্লাস’ সুবিধা পাওয়া নিয়ে সংশয় এবং প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার দেশগুলোর নীতিগত পরিবর্তন বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতাকে চাপের মুখে ফেলতে পারে। এই ঝুঁকিগুলো কাটিয়ে উঠতে এবং টেকসই উত্তরণ নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত সময়ের প্রয়োজন বলে মনে করছে সরকার। এই লক্ষ্যে একটি ‘ক্রাইসিস অ্যাসেসমেন্ট’ বা সংকটকালীন মূল্যায়নের মাধ্যমে সময় বৃদ্ধির আবেদন জানানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সিডিপির ২৪ থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারির বৈঠকের পর আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে একটি প্রাথমিক মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি হতে পারে। পরবর্তীতে সিডিপির পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশের ভিত্তিতে আগামী সেপ্টেম্বর মাসে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ১৯৭৫ সাল থেকে এলডিসিভুক্ত দেশ হিসেবে শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সুবিধা ভোগ করে আসছে। ২০১৮ ও ২০২১ সালের মূল্যায়নে বাংলাদেশ উত্তরণের সব শর্ত পূরণ করায় ২০২৪ সালেই এলডিসি থেকে বের হওয়ার কথা ছিল। তবে করোনা মহামারির কারণে সেই সময় ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল। সম্প্রতি সলোমন দ্বীপপুঞ্জ, মালদ্বীপ ও নেপালের মতো দেশগুলোও নানা প্রতিকূলতার কারণে তাদের এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা পরিবর্তন করেছে। বাংলাদেশও এখন সেই পথেই হাঁটছে।
রিপোর্টারের নাম 

























