সর্বশেষ সংসদ নির্বাচনে ঝালকাঠি-১ ও ২ আসনে জামায়াতে ইসলামী প্রার্থীরা বিজয়ী হতে না পারলেও তাদের প্রাপ্ত বিপুল ভোট স্থানীয় ও জাতীয় রাজনীতিতে এক নতুন বার্তা দিয়েছে। দুটি আসনেই বিএনপি প্রার্থীর কাছে অল্প ব্যবধানে হেরে গেলেও জেলায় দলটির ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকের ভোট বিস্ময়করভাবে বেড়ে যাওয়ায় রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। এই অপ্রত্যাশিত উত্থানকে অনেকেই জামায়াতের তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিক বিস্তৃতির ফল হিসেবে দেখছেন।
জেলা জামায়াতের অভ্যন্তরীণ জরিপে একসময় ‘সি গ্রেড’ হিসেবে বিবেচিত ঝালকাঠি-১ আসনটি এবার ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। প্রার্থী পরিবর্তনের পর ড. ফয়জুল হককে মনোনয়ন দেওয়ায় দ্রুতই ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকের জনসমর্থন বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে তিনি হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে চলে আসেন। ধানের শীষের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসন ধরে রাখতে বিএনপি সর্বশক্তি নিয়োগ করলেও, ফয়জুল হক মাত্র ৬ হাজার ৮৯০ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন। বিজয়ী বিএনপি প্রার্থী রফিকুল ইসলাম জামাল ৬২ হাজার ১০ ভোট পেলেও, ফয়জুল হক পান ৫৫ হাজার ১২০ ভোট।
ঝালকাঠি-১ আসনে জামায়াতের ভোটের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৯৯১ সালের পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে জামায়াত প্রার্থী মাওলানা মোজাম্মেল হোসাইন পেয়েছিলেন ১ হাজার ৮৬০ ভোট। ১৯৯৬ সালের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তা কমে দাঁড়ায় ৯২৫ ভোটে। সেখান থেকে সর্বশেষ নির্বাচনে দলটির ভোট জ্যামিতিক প্রগতিতে বেড়ে ৫৫ হাজার ছাড়িয়ে যাওয়াকে অভাবনীয় উত্থান হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
অন্যদিকে, ঝালকাঠি-২ আসনেও জামায়াতের ভোট বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অ্যাডভোকেট হায়দার হোসেন প্রায় সাড়ে ৪ থেকে ৫ হাজার ভোট এবং ১৯৯৬ সালের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও প্রায় সমসংখ্যক ভোট পেয়েছিলেন। সর্বশেষ নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থী শেখ নেয়ামুল করিম ৭০ হাজার ৫৫৬ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। যদিও বিজয়ী বিএনপি প্রার্থী ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টোর সঙ্গে তার ভোটের ব্যবধান ছিল প্রায় ৪৪ হাজার, তবে ঝালকাঠি পৌরসভায় বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের ভোটের ব্যবধান ছিল মাত্র ১ হাজার ৪৪২ ভোট। এখানে বিএনপি ১১ হাজার ৪৯৬ ভোট এবং জামায়াত ১০ হাজার ৫৪ ভোট পায়। এছাড়া, শহরের বেশ কয়েকটি কেন্দ্রে ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীক প্রথম স্থান অধিকার করেছে। রাজনৈতিক সচেতন মহলের ধারণা, এই ভোট ব্যাংক আগামী পৌর নির্বাচনে জামায়াতকে সুবিধাজনক অবস্থানে রাখবে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ঝালকাঠি জেলায় জামায়াতের সাংগঠনিক অবস্থান বরাবরই দুর্বল ছিল। জেলার ৩২টি ইউনিয়নের কোথাও এ পর্যন্ত তাদের কোনো জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হতে পারেননি। কেবল ঝালকাঠি পৌরসভায় একটি ওয়ার্ডে তাদের একজন কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছিলেন। তবে বর্তমানে জামায়াতের প্রতিটি ইউনিয়নে কমিটি রয়েছে, যা তৃণমূল পর্যায়ে দলটির বিস্তৃতির ইঙ্গিত দেয়।
নির্বাচনকালীন চ্যালেঞ্জের মধ্যে ছিল সব কেন্দ্রে এজেন্ট দিতে পারলেও অনেক কেন্দ্র থেকে তাদের এজেন্টদের বের করে দেওয়ার ঘটনা। দলের যুব বিভাগও নির্বাচনে তেমন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। এছাড়া, নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে প্রার্থী ও গণমাধ্যমকর্মীদের সমন্বয়ের অভাব ছিল, যার ফলে অনেক তথ্য সময়মতো গণমাধ্যমকে জানানো সম্ভব হয়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জামায়াতের একাধিক নেতাকর্মী জানিয়েছেন, প্রার্থীরাও মাঠে নামতে দেরি করেছেন, যার প্রভাব ভোটের মাঠে পড়েছে।
এত সব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও জামায়াতের নেতাকর্মীরা ভোটের ফলাফলকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন। দলের ভোট বাড়ার কারণ এবং দুটি আসনে পরাজয়ের মূল্যায়ন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জেলা জামায়াতের আমির অ্যাডভোকেট হাফিজুর রহমান বলেন, “জাতীয়ভাবে জামায়াতের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি, আমাদের প্রার্থীদের ব্যাপারে কোনো ব্যক্তিগত অভিযোগ না থাকা এবং তৃণমূল পর্যন্ত সংগঠন বিস্তৃত হওয়ার কারণেই আমাদের দুটি আসনের ভোট বেড়েছে।” নির্বাচনে আসন হারানোর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, “ঝালকাঠি-১ আসনে বিভিন্ন কেন্দ্রে আমাদের এজেন্ট বের করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে ‘দাঁড়িপাল্লায়’ ভোট না দেওয়ার হুমকির কারণে তাদের ভোট আমরা পাইনি। এসব কারণে জামায়াত প্রার্থীরা বিজয়ী হতে পারেননি।”
রিপোর্টারের নাম 






















