ঢাকা ১০:২৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

‘এক হাতে ফুল, অন্য হাতে ছেঁড়া স্যান্ডেল; এরপরেই গুলিতে লুটিয়ে পড়ে আমার মেয়ে’

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৭:১৫:৪২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শহীদ মেহরুন নেছা তানহার মৃত্যুর সেই বিভীষিকাময় মুহূর্তের বর্ণনা দিতে গিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে কান্নায় ভেঙে পড়েন তার বাবা মোশারফ হোসেন। বৃহস্পতিবার (৫ ডিসেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির বিরুদ্ধে দ্বিতীয় সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেওয়ার সময় তিনি এই হৃদয়বিদারক বর্ণনা দেন।

বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনালে মোশারফ হোসেন জানান, তার মেয়ে তানহা মিরপুর শাহ আলী কলেজের অনার্স তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর তানহা ও তার ভাই বিজয় মিছিলে যোগ দিতে গণভবন এলাকায় যান। সন্ধ্যায় ঘরে ফেরার পথে তানহার সঙ্গে তার বাবার শেষবার ভিডিও কলে কথা হয়। মোশারফ হোসেন বলেন, “ভিডিও কলে দেখলাম মেয়ের এক হাতে একটি ছেঁড়া স্যান্ডেল এবং অন্য হাতে একগুচ্ছ ফুল। এর কিছুক্ষণ পরই আমার ছেলে ফোনে তানহার চিৎকার শুনতে পায়। আমার স্ত্রী ফোন করে জানায়, তানহা গুলিবিদ্ধ হয়েছে।”

দ্রুত বাসায় পৌঁছে মোশারফ হোসেন দেখতে পান, তার একমাত্র মেয়ের নিথর দেহ বুকের বাঁ পাশে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় রক্তে ভেসে যাচ্ছে। মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন। লাশ গুম হওয়ার ভয়ে দ্রুত অ্যাম্বুলেন্সে করে মরদেহ বাসায় নিয়ে আসেন এবং পরে দাফন সম্পন্ন করেন।

জবানবন্দিতে তিনি আরও উল্লেখ করেন, গত ১৯ জুলাই মিরপুর-১০ এলাকায় আন্দোলনে গিয়ে শহীদ হন তানহার মামাতো ভাই আকরাম খান রাব্বী। ভাই হারানো শোক সইতে না পেরেই তানহা আরও সক্রিয়ভাবে আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। এই দুই হত্যাকাণ্ডের জন্য তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খান কামালসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতাদের দায়ী করেন। বিশেষ করে ওবায়দুল কাদেরের ‘দেখা মাত্র গুলি’ করার উসকানিমূলক বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করে তিনি খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।

একই দিনে ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেন শহীদ আকরাম খান রাব্বীর বাবা মো. ফারুক খান। তিনি তার ছেলের মরদেহ খুঁজে পাওয়ার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। ফারুক খান জানান, ১৯ জুলাই গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর ছেলেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে গিয়ে তিনি ছেলের মরদেহ পাননি। পরে মর্গে গিয়ে ৫-৬টি লাশের স্তূপের মধ্যে তিনি তার সন্তানের নিথর দেহ খুঁজে পান। পুলিশের বাধার মুখে এবং নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে অবশেষে ছেলের দাফন সম্পন্ন করতে পেরেছিলেন তিনি।

ফারুক খানও তার ছেলে ও ভাগনি তানহা হত্যার বিচার চেয়ে শেখ হাসিনা ও ওবায়দুল কাদেরসহ তৎকালীন সরকারের মন্ত্রী-এমপি এবং দলীয় ক্যাডারদের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দায়ের করেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মঞ্জুরুল বাছিদ এবং জেলা ও দায়রা জজ নুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবির। মামলার কার্যক্রম বর্তমানে চলমান রয়েছে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

দুর্নীতির রাহুগ্রাস থেকে মুক্তি: রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারই কি একমাত্র পথ?

‘এক হাতে ফুল, অন্য হাতে ছেঁড়া স্যান্ডেল; এরপরেই গুলিতে লুটিয়ে পড়ে আমার মেয়ে’

আপডেট সময় : ০৭:১৫:৪২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শহীদ মেহরুন নেছা তানহার মৃত্যুর সেই বিভীষিকাময় মুহূর্তের বর্ণনা দিতে গিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে কান্নায় ভেঙে পড়েন তার বাবা মোশারফ হোসেন। বৃহস্পতিবার (৫ ডিসেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির বিরুদ্ধে দ্বিতীয় সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেওয়ার সময় তিনি এই হৃদয়বিদারক বর্ণনা দেন।

বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনালে মোশারফ হোসেন জানান, তার মেয়ে তানহা মিরপুর শাহ আলী কলেজের অনার্স তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর তানহা ও তার ভাই বিজয় মিছিলে যোগ দিতে গণভবন এলাকায় যান। সন্ধ্যায় ঘরে ফেরার পথে তানহার সঙ্গে তার বাবার শেষবার ভিডিও কলে কথা হয়। মোশারফ হোসেন বলেন, “ভিডিও কলে দেখলাম মেয়ের এক হাতে একটি ছেঁড়া স্যান্ডেল এবং অন্য হাতে একগুচ্ছ ফুল। এর কিছুক্ষণ পরই আমার ছেলে ফোনে তানহার চিৎকার শুনতে পায়। আমার স্ত্রী ফোন করে জানায়, তানহা গুলিবিদ্ধ হয়েছে।”

দ্রুত বাসায় পৌঁছে মোশারফ হোসেন দেখতে পান, তার একমাত্র মেয়ের নিথর দেহ বুকের বাঁ পাশে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় রক্তে ভেসে যাচ্ছে। মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন। লাশ গুম হওয়ার ভয়ে দ্রুত অ্যাম্বুলেন্সে করে মরদেহ বাসায় নিয়ে আসেন এবং পরে দাফন সম্পন্ন করেন।

জবানবন্দিতে তিনি আরও উল্লেখ করেন, গত ১৯ জুলাই মিরপুর-১০ এলাকায় আন্দোলনে গিয়ে শহীদ হন তানহার মামাতো ভাই আকরাম খান রাব্বী। ভাই হারানো শোক সইতে না পেরেই তানহা আরও সক্রিয়ভাবে আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। এই দুই হত্যাকাণ্ডের জন্য তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খান কামালসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতাদের দায়ী করেন। বিশেষ করে ওবায়দুল কাদেরের ‘দেখা মাত্র গুলি’ করার উসকানিমূলক বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করে তিনি খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।

একই দিনে ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেন শহীদ আকরাম খান রাব্বীর বাবা মো. ফারুক খান। তিনি তার ছেলের মরদেহ খুঁজে পাওয়ার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। ফারুক খান জানান, ১৯ জুলাই গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর ছেলেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে গিয়ে তিনি ছেলের মরদেহ পাননি। পরে মর্গে গিয়ে ৫-৬টি লাশের স্তূপের মধ্যে তিনি তার সন্তানের নিথর দেহ খুঁজে পান। পুলিশের বাধার মুখে এবং নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে অবশেষে ছেলের দাফন সম্পন্ন করতে পেরেছিলেন তিনি।

ফারুক খানও তার ছেলে ও ভাগনি তানহা হত্যার বিচার চেয়ে শেখ হাসিনা ও ওবায়দুল কাদেরসহ তৎকালীন সরকারের মন্ত্রী-এমপি এবং দলীয় ক্যাডারদের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দায়ের করেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মঞ্জুরুল বাছিদ এবং জেলা ও দায়রা জজ নুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবির। মামলার কার্যক্রম বর্তমানে চলমান রয়েছে।