ঢাকা ০৩:১৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে তারা জীবনকে জাহান্নাম বানাত

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৬:০৯:০৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৪ বার পড়া হয়েছে

## জুলাই বিপ্লবের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধ: সাত আসামির বিরুদ্ধে সাক্ষ্য গ্রহণ

ঢাকা: জুলাই বিপ্লবের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির বিরুদ্ধে শহীদ শরীফ ওসমান হাদীর জবানবন্দি সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছে ট্রাইব্যুনাল-২। প্রসিকিউশনের আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত এই সিদ্ধান্ত দেয়। গত বছরের ১৮ জুন এই জবানবন্দি দিয়েছিলেন হাদি।

বুধবার ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এই আবেদন মঞ্জুর করে। প্যানেলের অন্য দুই সদস্য হলেন অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মঞ্জুরুল বাছিদ এবং জেলা ও দায়রা জজ নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। এর আগে ট্রাইব্যুনাল-১ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দেওয়া বদরুদ্দীন উমরের জবানবন্দিও সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছিল।

মামলার সকল আসামি পলাতক। অপর আসামিরা হলেন: আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালি আসিফ ইনান।

জবানবন্দিতে যা উঠে এসেছে:

শহীদ শরীফ ওসমান হাদি তার জবানবন্দিতে বলেন, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে পড়াশোনা করেছেন এবং শুরু থেকেই বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তিনি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করেন যে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে তিনি একজন শরিক হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন। এই বিপ্লবের মূল কারণ ছিল বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন। ২০১৮ সালের কোটা আন্দোলন এবং বিসিএস পরীক্ষায় ৫৪ শতাংশের বেশি বিভিন্ন কোটা দিয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীদের পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

হাদি অভিযোগ করেন, শেখ হাসিনা সরকার ৫৪ শতাংশেরও বেশি বিভিন্ন কোটা ব্যবহার করে সরকারি প্রায় সব খাতে দলীয় লোকদের নিয়োগের ব্যবস্থা করেছে। ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা থাকায় বহু লোক ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষে শেখ হাসিনা সরকার আদালতের ঘাড়ে বন্দুক রেখে ২০১৮ সালের পরিপত্র বাতিল করে দেয়, যা শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদের মুখেও কার্যকর হয়নি। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অজুহাতে তারা মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলত।

১৪ জুলাইয়ের ঘটনার বিবরণ:

হাদি জানান, ১৪ জুলাই আন্দোলন জোরদার হলে শেখ হাসিনা শিক্ষার্থীদের রাজাকার বলে সম্বোধন করেন। এর প্রতিক্রিয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা হলের গেট ভেঙে রাস্তায় নেমে আসে। তিনি রামপুরায় থাকা অবস্থায় তার এক বন্ধুর সাথে ক্যাম্পাসে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কাকরাইল ও মৎস্য ভবনের সামনে তারা দেখতে পান যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও বহিরাগত সন্ত্রাসীরা রামদা, পিস্তল, চাপাতি, রড, হকিস্টিক নিয়ে অবস্থান করছে। সেখান থেকে ঢুকতে না পেরে হাইকোর্টের সামনে গেলেও একই অবস্থা দেখতে পান। তিনি তার ছোট ভাই আক্তারকে ফোন করে ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি ভালো না বলে কর্মসূচি দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দেন। পরে আক্তার তাকে ক্যাম্পাসে যেতে নিষেধ করে।

আওয়ামী লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ:

হাদির জবানবন্দি অনুযায়ী, সেদিন যুবলীগের সভাপতি পরশ, সাধারণ সম্পাদক নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম, সাধারণ সম্পাদক ইনান, তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাতের নেতৃত্বে যুবলীগ-ছাত্রলীগ মিছিল করে শিক্ষার্থীদের দেখে নেওয়ার হুমকি দেয়। তিনি অভিযোগ করেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ছাড়াও শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী সন্ত্রাসী বাহিনীর হাতে বহু মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হয়েছে। তিনি মাইনুল হোসেন খান নিখিলকে সরাসরি অস্ত্র নিয়ে গুলি চালাতে দেখেছেন এবং অনেক এমপিকেও গুলি লোড করতে দেখেছেন। তিনি বলেন, ওবায়দুল কাদের ১৪ জুলাই শেখ হাসিনার বক্তব্যের পর বলেছিলেন, আন্দোলনকারীদের দমনের জন্য ছাত্রলীগই যথেষ্ট। এর মাধ্যমে তিনি বেসামরিক একটি ছাত্রলীগকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের হত্যা করার বৈধতা দিয়েছেন।

কারফিউ ও নির্দেশনার বিষয়ে অভিযোগ:

হাদি জানান, ১৮ জুলাই কারফিউ জারি নিয়ে ১৪ দলের সঙ্গে ওবায়দুল কাদের মিটিং করেন। এরপর মিডিয়া তাকে কারফিউ জারির বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি দেখামাত্র গুলি করার নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানান। তার অভিযোগ, এই নির্দেশ শুধু প্রশাসনকে নয়, বরং দলীয় সন্ত্রাসীদেরও দেওয়া হয়েছিল। জুলাইয়ের শেষের দিকে রিকশাওয়ালা, দিনমজুর, গার্মেন্টস কর্মী, শ্রমিক, শিশুসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ শহীদ হয়েছে। তিনি বলেন, এই আন্দোলন শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং যারা ১৭ বছরে গুম, ক্রসফায়ারে নিহত, জেলে বন্দি এবং বিরোধী দলের যারা ন্যায্য বিচার পায়নি, তারাও রাস্তায় নেমে এসেছিল।

গণহত্যা ও বিচার দাবি:

হাদি বলেন, ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয় থেকে ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, মহানগর থেকে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। ৪ আগস্ট ঢাকা থেকে শুরু করে প্রত্যেকটি জেলায় তারা নিরীহ নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করেছে। তিনি অভিযোগ করেন, ওবায়দুল কাদের মন্ত্রী হিসেবে নয়, দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আওয়ামী লীগকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। বাহাউদ্দিন নাছিমকে দলের সেকেন্ড সেক্রেটারি হিসেবে বিবেচনা করা হতো এবং তিনি স্বেচ্ছাসেবক লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন, যা বহু মানুষকে হত্যা করেছে। ছাত্রলীগের ইনানও তার হাতে রিক্রুট হওয়ায় ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণও তার হাতে ছিল। তিনি অভিযোগ করেন, প্রতিটি গণহত্যা সে লিড দিয়েছে, এক্সিকিউট করেছে এবং শেখ হাসিনার কাছে রিপোর্ট করেছে।

তিনি আরও বলেন, ১৪ জুলাই সাধারণ শিক্ষার্থীরা হলে ফিরে গেলেও মোহাম্মদ আলী আরাফাত প্রক্টোরিয়াল টিমের অনুমতি ছাড়াই ক্যাম্পাসে ঢুকে হুমকি-ধমকি দিয়েছেন এবং তথ্যসন্ত্রাস ছড়িয়েছেন। শহীদ আবু সাঈদকে প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যার সময় তিনি বলেছিলেন, ‘দে ওয়ার ড্রাংক’, যার মাধ্যমে তিনি নিহতদের মাদকাসক্ত বলে অপপ্রচার করেছেন।

যুবলীগের সভাপতি পরশকে শেখ হাসিনার আত্মীয় এবং মেয়র তাপসের বড় ভাই হিসেবে উল্লেখ করে হাদি বলেন, এই পরিচয় তাকে অনেক মন্ত্রীর চেয়েও শক্তিশালী করেছে। ঢাকার দখলবাজি ও হত্যাকাণ্ডে যুবলীগ সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে। ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বোনদের ওপর হামলার নির্দেশও তার ছিল বলে তিনি অভিযোগ করেন। ১৪ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মিছিল যুবলীগের সেক্রেটারি নিখিলের নেতৃত্বে হয়েছিল এবং তিনি সারা দেশে তার বাহিনী দিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন। মিরপুরের এমপি হওয়ার সুবাদে মিরপুরে আন্দোলন চলাকালীন তিনি অস্ত্র হাতে নিয়ে গুলি চালিয়ে মানুষ হত্যা করেছেন।

সাদ্দাম হোসেন ১৪ জুলাই রাতে ছাত্রলীগ ও বহিরাগতদের নিয়ে ক্যাম্পাসে মিছিল করেছেন এবং ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েদের পিটিয়ে রক্তাক্ত করার প্রধান হোতা তিনি। রাজু ভাস্কর্যে দাঁড়িয়ে তিনি আন্দোলনকারীদের জীবন তছনছ করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। ছাত্রলীগের সভাপতি হিসেবে তিনি সারা বাংলাদেশে ছাত্রলীগকে আন্দোলনকারীদের হত্যা করার বৈধতা দিয়েছেন।

ছাত্রলীগের সেক্রেটারি ইনান মধুর ক্যান্টিনে ভয়ংকরভাবে থ্রেট করেছেন এবং মেয়েদের গার্ডিয়ানদের ফোন করে ভয় দেখিয়েছেন। তিনি ১৭ জুলাই শেখ হাসিনার সঙ্গে হত্যা, সাফ এবং আক্রমণের বিষয়ে সরাসরি কথা বলেছেন, যার কলরেকর্ড আলজাজিরার মাধ্যমে শোনা গেছে। সেক্রেটারি হিসেবে ইনান ছাত্রলীগের কর্মীদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে অসংখ্য মানুষকে হত্যা করিয়েছেন। হাদি অসংখ্য নম্বর থেকে হত্যার হুমকি পাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে শাহবাগ থানায় জিডিও করার কথা বলেন। তিনি দ্রুত বিচার না হলে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা ভবিষ্যতে কী পরিমাণ গণহত্যা চালাবে, তা অকল্পনীয় বলে মন্তব্য করেন।

জবানবন্দির শেষে হাদি সারা দেশে আন্দোলন দমনের নামে সংঘটিত, পরিকল্পিত গণহত্যাকাণ্ডসহ বর্বরোচিত হামলার জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগ চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ, যুবলীগ সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন, ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালি আসিফ ইনানসহ ঘটনায় জড়িত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও আওয়ামী লীগের দলীয় ক্যাডারদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি জানান।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ঈদুল ফিতরে টানা ছুটির হাতছানি: জেনে নিন সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীদের অবকাশের সময়সূচি

মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে তারা জীবনকে জাহান্নাম বানাত

আপডেট সময় : ০৬:০৯:০৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

## জুলাই বিপ্লবের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধ: সাত আসামির বিরুদ্ধে সাক্ষ্য গ্রহণ

ঢাকা: জুলাই বিপ্লবের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির বিরুদ্ধে শহীদ শরীফ ওসমান হাদীর জবানবন্দি সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছে ট্রাইব্যুনাল-২। প্রসিকিউশনের আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত এই সিদ্ধান্ত দেয়। গত বছরের ১৮ জুন এই জবানবন্দি দিয়েছিলেন হাদি।

বুধবার ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এই আবেদন মঞ্জুর করে। প্যানেলের অন্য দুই সদস্য হলেন অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মঞ্জুরুল বাছিদ এবং জেলা ও দায়রা জজ নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। এর আগে ট্রাইব্যুনাল-১ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দেওয়া বদরুদ্দীন উমরের জবানবন্দিও সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছিল।

মামলার সকল আসামি পলাতক। অপর আসামিরা হলেন: আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালি আসিফ ইনান।

জবানবন্দিতে যা উঠে এসেছে:

শহীদ শরীফ ওসমান হাদি তার জবানবন্দিতে বলেন, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে পড়াশোনা করেছেন এবং শুরু থেকেই বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তিনি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করেন যে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে তিনি একজন শরিক হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন। এই বিপ্লবের মূল কারণ ছিল বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন। ২০১৮ সালের কোটা আন্দোলন এবং বিসিএস পরীক্ষায় ৫৪ শতাংশের বেশি বিভিন্ন কোটা দিয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীদের পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

হাদি অভিযোগ করেন, শেখ হাসিনা সরকার ৫৪ শতাংশেরও বেশি বিভিন্ন কোটা ব্যবহার করে সরকারি প্রায় সব খাতে দলীয় লোকদের নিয়োগের ব্যবস্থা করেছে। ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা থাকায় বহু লোক ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষে শেখ হাসিনা সরকার আদালতের ঘাড়ে বন্দুক রেখে ২০১৮ সালের পরিপত্র বাতিল করে দেয়, যা শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদের মুখেও কার্যকর হয়নি। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অজুহাতে তারা মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলত।

১৪ জুলাইয়ের ঘটনার বিবরণ:

হাদি জানান, ১৪ জুলাই আন্দোলন জোরদার হলে শেখ হাসিনা শিক্ষার্থীদের রাজাকার বলে সম্বোধন করেন। এর প্রতিক্রিয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা হলের গেট ভেঙে রাস্তায় নেমে আসে। তিনি রামপুরায় থাকা অবস্থায় তার এক বন্ধুর সাথে ক্যাম্পাসে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কাকরাইল ও মৎস্য ভবনের সামনে তারা দেখতে পান যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও বহিরাগত সন্ত্রাসীরা রামদা, পিস্তল, চাপাতি, রড, হকিস্টিক নিয়ে অবস্থান করছে। সেখান থেকে ঢুকতে না পেরে হাইকোর্টের সামনে গেলেও একই অবস্থা দেখতে পান। তিনি তার ছোট ভাই আক্তারকে ফোন করে ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি ভালো না বলে কর্মসূচি দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দেন। পরে আক্তার তাকে ক্যাম্পাসে যেতে নিষেধ করে।

আওয়ামী লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ:

হাদির জবানবন্দি অনুযায়ী, সেদিন যুবলীগের সভাপতি পরশ, সাধারণ সম্পাদক নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম, সাধারণ সম্পাদক ইনান, তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাতের নেতৃত্বে যুবলীগ-ছাত্রলীগ মিছিল করে শিক্ষার্থীদের দেখে নেওয়ার হুমকি দেয়। তিনি অভিযোগ করেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ছাড়াও শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী সন্ত্রাসী বাহিনীর হাতে বহু মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হয়েছে। তিনি মাইনুল হোসেন খান নিখিলকে সরাসরি অস্ত্র নিয়ে গুলি চালাতে দেখেছেন এবং অনেক এমপিকেও গুলি লোড করতে দেখেছেন। তিনি বলেন, ওবায়দুল কাদের ১৪ জুলাই শেখ হাসিনার বক্তব্যের পর বলেছিলেন, আন্দোলনকারীদের দমনের জন্য ছাত্রলীগই যথেষ্ট। এর মাধ্যমে তিনি বেসামরিক একটি ছাত্রলীগকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের হত্যা করার বৈধতা দিয়েছেন।

কারফিউ ও নির্দেশনার বিষয়ে অভিযোগ:

হাদি জানান, ১৮ জুলাই কারফিউ জারি নিয়ে ১৪ দলের সঙ্গে ওবায়দুল কাদের মিটিং করেন। এরপর মিডিয়া তাকে কারফিউ জারির বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি দেখামাত্র গুলি করার নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানান। তার অভিযোগ, এই নির্দেশ শুধু প্রশাসনকে নয়, বরং দলীয় সন্ত্রাসীদেরও দেওয়া হয়েছিল। জুলাইয়ের শেষের দিকে রিকশাওয়ালা, দিনমজুর, গার্মেন্টস কর্মী, শ্রমিক, শিশুসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ শহীদ হয়েছে। তিনি বলেন, এই আন্দোলন শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং যারা ১৭ বছরে গুম, ক্রসফায়ারে নিহত, জেলে বন্দি এবং বিরোধী দলের যারা ন্যায্য বিচার পায়নি, তারাও রাস্তায় নেমে এসেছিল।

গণহত্যা ও বিচার দাবি:

হাদি বলেন, ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয় থেকে ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, মহানগর থেকে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। ৪ আগস্ট ঢাকা থেকে শুরু করে প্রত্যেকটি জেলায় তারা নিরীহ নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করেছে। তিনি অভিযোগ করেন, ওবায়দুল কাদের মন্ত্রী হিসেবে নয়, দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আওয়ামী লীগকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। বাহাউদ্দিন নাছিমকে দলের সেকেন্ড সেক্রেটারি হিসেবে বিবেচনা করা হতো এবং তিনি স্বেচ্ছাসেবক লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন, যা বহু মানুষকে হত্যা করেছে। ছাত্রলীগের ইনানও তার হাতে রিক্রুট হওয়ায় ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণও তার হাতে ছিল। তিনি অভিযোগ করেন, প্রতিটি গণহত্যা সে লিড দিয়েছে, এক্সিকিউট করেছে এবং শেখ হাসিনার কাছে রিপোর্ট করেছে।

তিনি আরও বলেন, ১৪ জুলাই সাধারণ শিক্ষার্থীরা হলে ফিরে গেলেও মোহাম্মদ আলী আরাফাত প্রক্টোরিয়াল টিমের অনুমতি ছাড়াই ক্যাম্পাসে ঢুকে হুমকি-ধমকি দিয়েছেন এবং তথ্যসন্ত্রাস ছড়িয়েছেন। শহীদ আবু সাঈদকে প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যার সময় তিনি বলেছিলেন, ‘দে ওয়ার ড্রাংক’, যার মাধ্যমে তিনি নিহতদের মাদকাসক্ত বলে অপপ্রচার করেছেন।

যুবলীগের সভাপতি পরশকে শেখ হাসিনার আত্মীয় এবং মেয়র তাপসের বড় ভাই হিসেবে উল্লেখ করে হাদি বলেন, এই পরিচয় তাকে অনেক মন্ত্রীর চেয়েও শক্তিশালী করেছে। ঢাকার দখলবাজি ও হত্যাকাণ্ডে যুবলীগ সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে। ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বোনদের ওপর হামলার নির্দেশও তার ছিল বলে তিনি অভিযোগ করেন। ১৪ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মিছিল যুবলীগের সেক্রেটারি নিখিলের নেতৃত্বে হয়েছিল এবং তিনি সারা দেশে তার বাহিনী দিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন। মিরপুরের এমপি হওয়ার সুবাদে মিরপুরে আন্দোলন চলাকালীন তিনি অস্ত্র হাতে নিয়ে গুলি চালিয়ে মানুষ হত্যা করেছেন।

সাদ্দাম হোসেন ১৪ জুলাই রাতে ছাত্রলীগ ও বহিরাগতদের নিয়ে ক্যাম্পাসে মিছিল করেছেন এবং ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েদের পিটিয়ে রক্তাক্ত করার প্রধান হোতা তিনি। রাজু ভাস্কর্যে দাঁড়িয়ে তিনি আন্দোলনকারীদের জীবন তছনছ করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। ছাত্রলীগের সভাপতি হিসেবে তিনি সারা বাংলাদেশে ছাত্রলীগকে আন্দোলনকারীদের হত্যা করার বৈধতা দিয়েছেন।

ছাত্রলীগের সেক্রেটারি ইনান মধুর ক্যান্টিনে ভয়ংকরভাবে থ্রেট করেছেন এবং মেয়েদের গার্ডিয়ানদের ফোন করে ভয় দেখিয়েছেন। তিনি ১৭ জুলাই শেখ হাসিনার সঙ্গে হত্যা, সাফ এবং আক্রমণের বিষয়ে সরাসরি কথা বলেছেন, যার কলরেকর্ড আলজাজিরার মাধ্যমে শোনা গেছে। সেক্রেটারি হিসেবে ইনান ছাত্রলীগের কর্মীদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে অসংখ্য মানুষকে হত্যা করিয়েছেন। হাদি অসংখ্য নম্বর থেকে হত্যার হুমকি পাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে শাহবাগ থানায় জিডিও করার কথা বলেন। তিনি দ্রুত বিচার না হলে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা ভবিষ্যতে কী পরিমাণ গণহত্যা চালাবে, তা অকল্পনীয় বলে মন্তব্য করেন।

জবানবন্দির শেষে হাদি সারা দেশে আন্দোলন দমনের নামে সংঘটিত, পরিকল্পিত গণহত্যাকাণ্ডসহ বর্বরোচিত হামলার জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগ চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ, যুবলীগ সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন, ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালি আসিফ ইনানসহ ঘটনায় জড়িত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও আওয়ামী লীগের দলীয় ক্যাডারদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি জানান।