ঢাকা ০১:৩৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

রমজানে নতুন সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ: বিদ্যুৎ ও নিত্যপণ্যের বাজারে স্বস্তি মিলবে কি?

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৬:১৩:১৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৪ বার পড়া হয়েছে

মাহে রমজান—সংযম, ত্যাগ ও আত্মশুদ্ধির এক পবিত্র মাস। ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের জন্য এটি রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের বার্তা বয়ে আনে। ইবাদত-বন্দেগির পাশাপাশি এই মাসে নাগরিক দায়িত্ব, সামাজিক সংহতি ও ন্যায্যতার চর্চা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রমজান মানেই বিদ্যুৎ সরবরাহ ও নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখার এক কঠিন পরীক্ষা। ২০২৬ সালের এই পবিত্র মাসে নতুন সরকারের সামনে এই দুই খাতে জনস্বস্তি নিশ্চিত করাই হয়ে দাঁড়িয়েছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

নতুন অধ্যায়ের সূচনা ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে ৩৫ বছর পর তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে। ১৯৭১ সালের সেক্টর কমান্ডার ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সন্তান তারেক রহমান একাদশ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন, যা কাকতালীয়ভাবে মাহে রমজানের প্রারম্ভেই ঘটেছে। এই ঘটনা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

এর আগে ২০২৫ সালে ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে রমজান মাসে জনগণ দুটি বিষয়ে উল্লেখযোগ্য স্বস্তি পেয়েছিল বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে: এক, নিত্যপণ্যের মূল্য সহনীয় পর্যায়ে ছিল; দুই, সেহরি ও তারাবির সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ তুলনামূলক নিরবচ্ছিন্ন ছিল।

বিদ্যুৎ খাত: ২০২৬-এর চ্যালেঞ্জ
রমজান মানেই বিদ্যুতের ওপর বাড়তি চাপ, বিশেষ করে গরম ও কৃষি সেচ মৌসুমের কারণে। দেশের গ্রামীণ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থাগুলো প্রায় ৩.৬৪ কোটি গ্রাহককে সেবা দিয়ে থাকে, যা ১৪ কোটির বেশি মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। গত রমজানে সেহরি, ইফতার ও তারাবির সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ মোটামুটি স্থিতিশীল থাকায় ভোক্তারা সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছিলেন।

তবে প্রশ্ন উঠেছে, ২০২৬ সালে এই ক্রমবর্ধমান চাহিদা সামাল দিতে উৎপাদন ও সঞ্চালন ব্যবস্থায় কতটা প্রস্তুতি রয়েছে? বিদ্যুৎ খাতে অতীতের নীতিগত সিদ্ধান্ত, দ্রুত ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র (কুইক রেন্টাল) ও ক্যাপাসিটি চার্জের মতো বিষয়গুলো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে। নতুন সরকারের সামনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জনআস্থা পুনরুদ্ধারের এক বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।

নিত্যপণ্যের বাজার: স্বস্তি না অস্বস্তি?
বাংলাদেশে রমজান এলেই নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার এক চিরাচরিত প্রবণতা দেখা যায়, যা পশ্চিমা বিশ্বের উৎসবকেন্দ্রিক মূল্যছাড়ের সংস্কৃতির সম্পূর্ণ বিপরীত। তাই ২০২৬ সালের রমজানে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে— খাদ্য মজুত নিশ্চিত করা; বাজারে সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজি কঠোর হাতে দমন করা; আমদানি-সরবরাহ শৃঙ্খল অক্ষুণ্ন রাখা এবং কার্যকর তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করা।

অর্থনীতিবিদদের মতে, কেবল প্রশাসনিক নির্দেশনা নয়, কার্যকর বাজার পর্যবেক্ষণ ও দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ছাড়া দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।

প্রত্যাশা বনাম প্রাপ্তি
বিএনপি নেতৃত্বাধীন এই নতুন সরকারের প্রতি জনগণের প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি, কারণ নির্বাচনে দলটি উল্লেখযোগ্য জনসমর্থন পেয়েছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আস্থা ও ভালোবাসা যেমন পারস্পরিক, তেমনি জবাবদিহিতাও দ্বিমুখী। জনগণ সহযোগিতা করতে প্রস্তুত, কিন্তু তার বিনিময়ে চায় স্বচ্ছতা, ন্যায়বিচার ও সুশাসন।

রমজান কেবল ইবাদতের মাস নয়, এটি নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের পরীক্ষার সময়ও। বিদ্যুৎ সরবরাহ ও নিত্যপণ্যের বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পারলে ২০২৬ সালের রমজান হবে স্বস্তির। অন্যথায়, তীব্র সমালোচনা ও জনঅসন্তোষ অনিবার্য। নতুন অধ্যায়ের এই রমজান দেশের মানুষের জন্য স্বস্তি, সংযম ও সুশাসনের বার্তা বয়ে আনুক—এই প্রত্যাশা।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

শিল্প-সাহিত্যচর্চা রাজনীতির ঊর্ধ্বে: প্রধানমন্ত্রী

রমজানে নতুন সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ: বিদ্যুৎ ও নিত্যপণ্যের বাজারে স্বস্তি মিলবে কি?

আপডেট সময় : ০৬:১৩:১৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

মাহে রমজান—সংযম, ত্যাগ ও আত্মশুদ্ধির এক পবিত্র মাস। ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের জন্য এটি রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের বার্তা বয়ে আনে। ইবাদত-বন্দেগির পাশাপাশি এই মাসে নাগরিক দায়িত্ব, সামাজিক সংহতি ও ন্যায্যতার চর্চা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রমজান মানেই বিদ্যুৎ সরবরাহ ও নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখার এক কঠিন পরীক্ষা। ২০২৬ সালের এই পবিত্র মাসে নতুন সরকারের সামনে এই দুই খাতে জনস্বস্তি নিশ্চিত করাই হয়ে দাঁড়িয়েছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

নতুন অধ্যায়ের সূচনা ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে ৩৫ বছর পর তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে। ১৯৭১ সালের সেক্টর কমান্ডার ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সন্তান তারেক রহমান একাদশ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন, যা কাকতালীয়ভাবে মাহে রমজানের প্রারম্ভেই ঘটেছে। এই ঘটনা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

এর আগে ২০২৫ সালে ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে রমজান মাসে জনগণ দুটি বিষয়ে উল্লেখযোগ্য স্বস্তি পেয়েছিল বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে: এক, নিত্যপণ্যের মূল্য সহনীয় পর্যায়ে ছিল; দুই, সেহরি ও তারাবির সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ তুলনামূলক নিরবচ্ছিন্ন ছিল।

বিদ্যুৎ খাত: ২০২৬-এর চ্যালেঞ্জ
রমজান মানেই বিদ্যুতের ওপর বাড়তি চাপ, বিশেষ করে গরম ও কৃষি সেচ মৌসুমের কারণে। দেশের গ্রামীণ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থাগুলো প্রায় ৩.৬৪ কোটি গ্রাহককে সেবা দিয়ে থাকে, যা ১৪ কোটির বেশি মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। গত রমজানে সেহরি, ইফতার ও তারাবির সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ মোটামুটি স্থিতিশীল থাকায় ভোক্তারা সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছিলেন।

তবে প্রশ্ন উঠেছে, ২০২৬ সালে এই ক্রমবর্ধমান চাহিদা সামাল দিতে উৎপাদন ও সঞ্চালন ব্যবস্থায় কতটা প্রস্তুতি রয়েছে? বিদ্যুৎ খাতে অতীতের নীতিগত সিদ্ধান্ত, দ্রুত ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র (কুইক রেন্টাল) ও ক্যাপাসিটি চার্জের মতো বিষয়গুলো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে। নতুন সরকারের সামনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জনআস্থা পুনরুদ্ধারের এক বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।

নিত্যপণ্যের বাজার: স্বস্তি না অস্বস্তি?
বাংলাদেশে রমজান এলেই নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার এক চিরাচরিত প্রবণতা দেখা যায়, যা পশ্চিমা বিশ্বের উৎসবকেন্দ্রিক মূল্যছাড়ের সংস্কৃতির সম্পূর্ণ বিপরীত। তাই ২০২৬ সালের রমজানে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে— খাদ্য মজুত নিশ্চিত করা; বাজারে সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজি কঠোর হাতে দমন করা; আমদানি-সরবরাহ শৃঙ্খল অক্ষুণ্ন রাখা এবং কার্যকর তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করা।

অর্থনীতিবিদদের মতে, কেবল প্রশাসনিক নির্দেশনা নয়, কার্যকর বাজার পর্যবেক্ষণ ও দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ছাড়া দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।

প্রত্যাশা বনাম প্রাপ্তি
বিএনপি নেতৃত্বাধীন এই নতুন সরকারের প্রতি জনগণের প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি, কারণ নির্বাচনে দলটি উল্লেখযোগ্য জনসমর্থন পেয়েছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আস্থা ও ভালোবাসা যেমন পারস্পরিক, তেমনি জবাবদিহিতাও দ্বিমুখী। জনগণ সহযোগিতা করতে প্রস্তুত, কিন্তু তার বিনিময়ে চায় স্বচ্ছতা, ন্যায়বিচার ও সুশাসন।

রমজান কেবল ইবাদতের মাস নয়, এটি নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের পরীক্ষার সময়ও। বিদ্যুৎ সরবরাহ ও নিত্যপণ্যের বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পারলে ২০২৬ সালের রমজান হবে স্বস্তির। অন্যথায়, তীব্র সমালোচনা ও জনঅসন্তোষ অনিবার্য। নতুন অধ্যায়ের এই রমজান দেশের মানুষের জন্য স্বস্তি, সংযম ও সুশাসনের বার্তা বয়ে আনুক—এই প্রত্যাশা।