ঢাকা ১১:৪২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬

শতবর্ষী চা বাগানেও নারী শ্রমিকের ভাগ্যের চাকা ঘুরছে না: বঞ্চনা আর অবহেলা যেন নিত্যসঙ্গী

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:০৬:১২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

সিলেটের সবুজ চা বাগানগুলো ‘দুটি পাতা ও একটি কুঁড়ির’ দেশ হিসেবে পরিচিত হলেও, এই শিল্পের অবিচ্ছেদ্য অংশ নারী চা শ্রমিকদের জীবন আজও বঞ্চনা আর অবহেলায় আচ্ছন্ন। চা শিল্পের উন্নয়নে তাদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও গুরুত্বপূর্ণ অবদান সত্ত্বেও, ন্যায্য মজুরি বা মৌলিক অধিকারের ছিটেফোঁটাও তাদের ভাগ্যে জোটেনি। দীর্ঘকাল ধরে তারা অর্ধাহার-অনাহারে মানবেতর জীবন যাপন করছেন, যা দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন চিত্রের এক করুণ প্রতিফলন।

চা বাগানের ভেতরে ও বাইরে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটা এই নারী শ্রমিকরা তাদের জীবনের বিনিময়ে যা আয় করেন, তা দিয়ে কোনোমতে দিন গুজরান করেন। সকালে গৃহস্থালির কাজ সেরে দলবদ্ধভাবে তারা বাগানে আসেন, আর সারাদিন দাঁড়িয়ে চায়ের কোমল পাতা তুলে সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরেন মাত্র ১০২ টাকা হাতে নিয়ে। অথচ সমাজের অন্যান্য পেশার নারীরা কমবেশি সম্মান পেলেও, চা শ্রমিক নারীরা আজীবন উপেক্ষিত। ন্যায্য মজুরি, মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, উন্নত আবাসন, সুপেয় জল এবং স্যানিটেশনের মতো মৌলিক সুবিধাগুলো তাদের নাগালের বাইরে। যেন এই পাহাড়ের কোলে জন্ম নেওয়াই তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় অপরাধ।

২০০৭ সালে যেখানে তাদের দৈনিক মজুরি ছিল মাত্র ৩২ টাকা, তাThe পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে সামান্য বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ৭৫ টাকায়। কিন্তু শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের দাবি, দৈনিক মজুরি অন্তত ২৫০-৩০০ টাকায় উন্নীত করা হোক। উৎসব ভাতা কিছুটা বাড়লেও, অনেক বৃদ্ধ চা শ্রমিক সমাজসেবা মন্ত্রণালয় থেকে বছরে মাত্র ৫ হাজার টাকার খাদ্য সহায়তা পাচ্ছেন, তাও বহু আন্দোলন-সংগ্রামের পর।

নবীগঞ্জের ভবান চা বাগানের স্থায়ী চা শ্রমিক অনিকা রানি (৪০) প্রায় ১৫ বছর বয়স থেকে এই পেশায় যুক্ত। তার মা-ও ছিলেন চা শ্রমিক। স্কুল দূরে হওয়ায় এবং অভাবের সংসারে অনিকা বর্ণমালা শেখার বাইরে বেশিদূর এগোতে পারেননি। দৈনিক ১৫-২০ কেজি চা পাতা তুলে তার আয় হয় মাত্র ৭৫ টাকা। নির্দিষ্ট পরিমাণ পাতা তুলতে না পারলে আয় আরও কমে যায়। সংসার চালানোর জন্য তাকে বাড়তি কাজ করতে হয়, তবুও জিনিসপত্রের ঊর্ধ্বমুখী দামের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জীবন চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে অনিকা রানির মতো হাজারো নারী চা শ্রমিকের। “চলাই যায় না,” আক্ষেপ করে বলেন অনিকা। “আমি আর আমার স্বামী কাজ করি, কিন্তু ঘরে ছয়জন নির্ভরশীল। বর্তমানে যে রুজি পাই, তা দিয়ে কোনোমতেই চলে না। আমাদের অবস্থা খুবই খারাপ।”

সকালে লাল চা আর শুকনো রুটি দিয়ে দিনের শুরু হয় তাদের। এরপর সকাল ৯টায় তারা বাগানে চলে আসেন। দুপুরের খাবার হিসেবে তারা সঙ্গে নিয়ে আসেন কচি কুঁড়ি চা পাতা, আলু, কাঁচা মরিচ ও মুড়ি। দেশের অন্যান্য জনগোষ্ঠীর তুলনায় চা শ্রমিকরা সবদিক দিয়ে পিছিয়ে থাকার প্রধান কারণ নিরক্ষরতা। শিক্ষা খাতে বাজেটের বড় অংশ ব্যয় হলেও, চা বাগানে শিক্ষার হার অত্যন্ত নগণ্য। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য যেখানে চাকরি ও শিক্ষাক্ষেত্রে কোটা সুবিধা রয়েছে, সেখানে চা শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য তেমন কোনো বিশেষ ব্যবস্থা নেই।

নবীগঞ্জের ইমাম বাওয়ানী ভবান চা বাগানের ম্যানেজার বিনয় চন্দ্র বর্মা স্বীকার করেন যে, তাদের বাগানে স্কুল ও হাসপাতাল নেই এবং বিশুদ্ধ পানির অভাব রয়েছে। তিনি জানান, কর্তৃপক্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। এই বাগানটি তুলনামূলকভাবে নতুন হলেও, শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধা সাধ্যমতো দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তবে, এই উদ্যোগগুলো কবে বাস্তবে রূপ নেবে এবং নারী চা শ্রমিকদের বঞ্চনার অবসান ঘটাবে, সেদিকেই তাকিয়ে আছে লক্ষ লক্ষ শ্রমিক পরিবার।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরান-ইসরাইল সংঘাত: ইসরাইলের দাবি, আকাশপথে ২০০০টির বেশি বোমা বর্ষণ

শতবর্ষী চা বাগানেও নারী শ্রমিকের ভাগ্যের চাকা ঘুরছে না: বঞ্চনা আর অবহেলা যেন নিত্যসঙ্গী

আপডেট সময় : ০৯:০৬:১২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

সিলেটের সবুজ চা বাগানগুলো ‘দুটি পাতা ও একটি কুঁড়ির’ দেশ হিসেবে পরিচিত হলেও, এই শিল্পের অবিচ্ছেদ্য অংশ নারী চা শ্রমিকদের জীবন আজও বঞ্চনা আর অবহেলায় আচ্ছন্ন। চা শিল্পের উন্নয়নে তাদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও গুরুত্বপূর্ণ অবদান সত্ত্বেও, ন্যায্য মজুরি বা মৌলিক অধিকারের ছিটেফোঁটাও তাদের ভাগ্যে জোটেনি। দীর্ঘকাল ধরে তারা অর্ধাহার-অনাহারে মানবেতর জীবন যাপন করছেন, যা দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন চিত্রের এক করুণ প্রতিফলন।

চা বাগানের ভেতরে ও বাইরে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটা এই নারী শ্রমিকরা তাদের জীবনের বিনিময়ে যা আয় করেন, তা দিয়ে কোনোমতে দিন গুজরান করেন। সকালে গৃহস্থালির কাজ সেরে দলবদ্ধভাবে তারা বাগানে আসেন, আর সারাদিন দাঁড়িয়ে চায়ের কোমল পাতা তুলে সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরেন মাত্র ১০২ টাকা হাতে নিয়ে। অথচ সমাজের অন্যান্য পেশার নারীরা কমবেশি সম্মান পেলেও, চা শ্রমিক নারীরা আজীবন উপেক্ষিত। ন্যায্য মজুরি, মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, উন্নত আবাসন, সুপেয় জল এবং স্যানিটেশনের মতো মৌলিক সুবিধাগুলো তাদের নাগালের বাইরে। যেন এই পাহাড়ের কোলে জন্ম নেওয়াই তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় অপরাধ।

২০০৭ সালে যেখানে তাদের দৈনিক মজুরি ছিল মাত্র ৩২ টাকা, তাThe পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে সামান্য বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ৭৫ টাকায়। কিন্তু শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের দাবি, দৈনিক মজুরি অন্তত ২৫০-৩০০ টাকায় উন্নীত করা হোক। উৎসব ভাতা কিছুটা বাড়লেও, অনেক বৃদ্ধ চা শ্রমিক সমাজসেবা মন্ত্রণালয় থেকে বছরে মাত্র ৫ হাজার টাকার খাদ্য সহায়তা পাচ্ছেন, তাও বহু আন্দোলন-সংগ্রামের পর।

নবীগঞ্জের ভবান চা বাগানের স্থায়ী চা শ্রমিক অনিকা রানি (৪০) প্রায় ১৫ বছর বয়স থেকে এই পেশায় যুক্ত। তার মা-ও ছিলেন চা শ্রমিক। স্কুল দূরে হওয়ায় এবং অভাবের সংসারে অনিকা বর্ণমালা শেখার বাইরে বেশিদূর এগোতে পারেননি। দৈনিক ১৫-২০ কেজি চা পাতা তুলে তার আয় হয় মাত্র ৭৫ টাকা। নির্দিষ্ট পরিমাণ পাতা তুলতে না পারলে আয় আরও কমে যায়। সংসার চালানোর জন্য তাকে বাড়তি কাজ করতে হয়, তবুও জিনিসপত্রের ঊর্ধ্বমুখী দামের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জীবন চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে অনিকা রানির মতো হাজারো নারী চা শ্রমিকের। “চলাই যায় না,” আক্ষেপ করে বলেন অনিকা। “আমি আর আমার স্বামী কাজ করি, কিন্তু ঘরে ছয়জন নির্ভরশীল। বর্তমানে যে রুজি পাই, তা দিয়ে কোনোমতেই চলে না। আমাদের অবস্থা খুবই খারাপ।”

সকালে লাল চা আর শুকনো রুটি দিয়ে দিনের শুরু হয় তাদের। এরপর সকাল ৯টায় তারা বাগানে চলে আসেন। দুপুরের খাবার হিসেবে তারা সঙ্গে নিয়ে আসেন কচি কুঁড়ি চা পাতা, আলু, কাঁচা মরিচ ও মুড়ি। দেশের অন্যান্য জনগোষ্ঠীর তুলনায় চা শ্রমিকরা সবদিক দিয়ে পিছিয়ে থাকার প্রধান কারণ নিরক্ষরতা। শিক্ষা খাতে বাজেটের বড় অংশ ব্যয় হলেও, চা বাগানে শিক্ষার হার অত্যন্ত নগণ্য। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য যেখানে চাকরি ও শিক্ষাক্ষেত্রে কোটা সুবিধা রয়েছে, সেখানে চা শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য তেমন কোনো বিশেষ ব্যবস্থা নেই।

নবীগঞ্জের ইমাম বাওয়ানী ভবান চা বাগানের ম্যানেজার বিনয় চন্দ্র বর্মা স্বীকার করেন যে, তাদের বাগানে স্কুল ও হাসপাতাল নেই এবং বিশুদ্ধ পানির অভাব রয়েছে। তিনি জানান, কর্তৃপক্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। এই বাগানটি তুলনামূলকভাবে নতুন হলেও, শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধা সাধ্যমতো দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তবে, এই উদ্যোগগুলো কবে বাস্তবে রূপ নেবে এবং নারী চা শ্রমিকদের বঞ্চনার অবসান ঘটাবে, সেদিকেই তাকিয়ে আছে লক্ষ লক্ষ শ্রমিক পরিবার।