ঢাকা ১১:৪২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬

নেত্রকোনার আকাশ-বাতাস বিষাক্ত: অবৈধ ইটভাটার দাপটে বিপন্ন পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:০৫:৩৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ১ বার পড়া হয়েছে

নেত্রকোনা জেলায় অবৈধ ইটভাটার আগ্রাসন কোনোভাবেই থামছে না। কৃষিজমি ধ্বংস, জনস্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব এবং পরিবেশের চরম অবনতির পাশাপাশি আইন অমান্য করে নির্বিচারে ইট পোড়ানোর নৈরাজ্য চলছে। স্থানীয় প্রশাসন মাঝে মাঝে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করলেও তা কেবল লোক দেখানো, কারণ অবৈধ ভাটাগুলো বন্ধ করার কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। ফলে, পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে জনজীবন চরম হুমকির মুখে পড়ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নেত্রকোনা জেলায় মোট ৪০টি ইটভাটার মধ্যে বর্তমানে ৩২টি ভাটা সক্রিয় রয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই ৩২টি ভাটার মধ্যে মাত্র চারটি পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নিয়ে বৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে। বাকি ২৮টি ভাটা সম্পূর্ণ অবৈধভাবে, কোনো প্রকার অনুমতি ছাড়াই ইট উৎপাদন করে চলেছে। মৌসুমের শুরুতে স্থানীয় প্রশাসন ছয়টি ভাটিতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জরিমানা করলেও, ইট পোড়ানোর কার্যক্রম বন্ধ করার কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এই পরিস্থিতিতে, স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর উদ্বেগ কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকছে, বাস্তবে কোনো পরিবর্তন আসছে না।

নেত্রকোনা জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং ইটভাটা সংগঠনগুলোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জেলার নয়টি উপজেলায় মোট ৪০টি ইটভাটা রয়েছে। এর মধ্যে এ বছর ৩২টি ভাটা ইট উৎপাদনে নিয়োজিত। এই ভাটাগুলোতে প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার শ্রমিক কাজ করে, যা একটি বড় জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে। প্রতিটি ভাটা থেকে বছরে প্রায় ৬৫ লাখ থেকে ১ কোটি পিসের বেশি ইট উৎপাদিত হয়। পরিবেশবাদী সংগঠন ‘বারসিক’ এর আঞ্চলিক সমন্বয়কারী অহিদুর রহমান বলেন, “প্রকৃতিকে রক্ষা করার জন্য ইটভাটা স্থাপন ও পরিচালনার নির্দিষ্ট নিয়মকানুন রয়েছে। কিন্তু অনেকেই তা মানছে না। এর ফলে আমাদের চারপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে।”

নেত্রকোনা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আবদুল্লাহ আল মতিন স্বীকার করেছেন যে, জেলায় চালু থাকা ৩২টি ইটভাটার মধ্যে মাত্র চারটির পরিবেশ ছাড়পত্র রয়েছে। তিনি জানান, এ বছর কেন্দুয়া, মদন ও আটপাড়া উপজেলায় কয়েকটি অবৈধ ভাটায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা করা হয়েছে। তবে, মামলা-মোকদ্দমার জটিলতার কারণে অবৈধ ভাটাগুলো পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি আরও বলেন, অভিযান অব্যাহত থাকবে।

অন্যদিকে, নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক সাইফুর রহমান জানিয়েছেন যে, পরিবেশ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসন যৌথভাবে অবৈধ ইটভাটাগুলোতে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জরিমানা আদায় করছে। সরকারি জমি এবং নদী ও বিলের অংশ থেকে মাটি সংগ্রহের বিষয়ে তিনি বলেন, “সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।” তবে, এই ব্যবস্থাগুলো কতটা কার্যকর হবে এবং অবৈধ ইটভাটার আগ্রাসন কবে বন্ধ হবে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন রয়েই গেছে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরান-ইসরাইল সংঘাত: ইসরাইলের দাবি, আকাশপথে ২০০০টির বেশি বোমা বর্ষণ

নেত্রকোনার আকাশ-বাতাস বিষাক্ত: অবৈধ ইটভাটার দাপটে বিপন্ন পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য

আপডেট সময় : ০৯:০৫:৩৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

নেত্রকোনা জেলায় অবৈধ ইটভাটার আগ্রাসন কোনোভাবেই থামছে না। কৃষিজমি ধ্বংস, জনস্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব এবং পরিবেশের চরম অবনতির পাশাপাশি আইন অমান্য করে নির্বিচারে ইট পোড়ানোর নৈরাজ্য চলছে। স্থানীয় প্রশাসন মাঝে মাঝে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করলেও তা কেবল লোক দেখানো, কারণ অবৈধ ভাটাগুলো বন্ধ করার কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। ফলে, পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে জনজীবন চরম হুমকির মুখে পড়ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নেত্রকোনা জেলায় মোট ৪০টি ইটভাটার মধ্যে বর্তমানে ৩২টি ভাটা সক্রিয় রয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই ৩২টি ভাটার মধ্যে মাত্র চারটি পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নিয়ে বৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে। বাকি ২৮টি ভাটা সম্পূর্ণ অবৈধভাবে, কোনো প্রকার অনুমতি ছাড়াই ইট উৎপাদন করে চলেছে। মৌসুমের শুরুতে স্থানীয় প্রশাসন ছয়টি ভাটিতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জরিমানা করলেও, ইট পোড়ানোর কার্যক্রম বন্ধ করার কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এই পরিস্থিতিতে, স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর উদ্বেগ কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকছে, বাস্তবে কোনো পরিবর্তন আসছে না।

নেত্রকোনা জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং ইটভাটা সংগঠনগুলোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জেলার নয়টি উপজেলায় মোট ৪০টি ইটভাটা রয়েছে। এর মধ্যে এ বছর ৩২টি ভাটা ইট উৎপাদনে নিয়োজিত। এই ভাটাগুলোতে প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার শ্রমিক কাজ করে, যা একটি বড় জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে। প্রতিটি ভাটা থেকে বছরে প্রায় ৬৫ লাখ থেকে ১ কোটি পিসের বেশি ইট উৎপাদিত হয়। পরিবেশবাদী সংগঠন ‘বারসিক’ এর আঞ্চলিক সমন্বয়কারী অহিদুর রহমান বলেন, “প্রকৃতিকে রক্ষা করার জন্য ইটভাটা স্থাপন ও পরিচালনার নির্দিষ্ট নিয়মকানুন রয়েছে। কিন্তু অনেকেই তা মানছে না। এর ফলে আমাদের চারপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে।”

নেত্রকোনা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আবদুল্লাহ আল মতিন স্বীকার করেছেন যে, জেলায় চালু থাকা ৩২টি ইটভাটার মধ্যে মাত্র চারটির পরিবেশ ছাড়পত্র রয়েছে। তিনি জানান, এ বছর কেন্দুয়া, মদন ও আটপাড়া উপজেলায় কয়েকটি অবৈধ ভাটায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা করা হয়েছে। তবে, মামলা-মোকদ্দমার জটিলতার কারণে অবৈধ ভাটাগুলো পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি আরও বলেন, অভিযান অব্যাহত থাকবে।

অন্যদিকে, নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক সাইফুর রহমান জানিয়েছেন যে, পরিবেশ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসন যৌথভাবে অবৈধ ইটভাটাগুলোতে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জরিমানা আদায় করছে। সরকারি জমি এবং নদী ও বিলের অংশ থেকে মাটি সংগ্রহের বিষয়ে তিনি বলেন, “সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।” তবে, এই ব্যবস্থাগুলো কতটা কার্যকর হবে এবং অবৈধ ইটভাটার আগ্রাসন কবে বন্ধ হবে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন রয়েই গেছে।