ঢাকা ০৫:৩৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৪:৪২:৪৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

## দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ছায়া: বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কোন পথে?

ঢাকা: সদ্য সমাপ্ত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয়তাবাদী দল ও তার মিত্রদের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে নিরঙ্কুশ বিজয় বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে এই বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেশের জন্য কতটা মঙ্গলজনক হবে, তা বুঝতে হলে অতীতের দিকে তাকাতে হবে। ২০০১ সালের জাতীয়তাবাদী দলের landslide জয় পরবর্তী জরুরি অবস্থা এবং ২০০৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর দীর্ঘ ১৭ বছরের শাসনামলের রক্তাক্ত পরিণতি, বিশেষ করে ২৪শে জুলাইয়ের ঘটনা, আজও অনেকের স্মরণে টাটকা।

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতেও দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজয়ী ক্ষমতাসীন দলগুলোর ক্ষমতা কেন্দ্রীকরণের প্রবণতা এবং তার ফলস্বরূপ সৃষ্ট বিতর্ক নতুন নয়। ১৯৮৪ সালে ভারতের কংগ্রেস, ২০১৭ সালে নেপালের কমিউনিস্ট পার্টি এবং ২০২০ সালে শ্রীলঙ্কার এসএলপিপি-র মতো দলগুলো প্রায়শই সংবিধান পরিবর্তনের মাধ্যমে ক্ষমতাকে আরও সুসংহত করার চেষ্টা করেছে, যা গণতান্ত্রিক ভারসাম্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। যদিও ভারতের ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষ ও বিচার বিভাগের শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ একক আধিপত্যকে কিছুটা হলেও সীমিত রাখতে সক্ষম হয়েছে। নেপালের সুপ্রিম কোর্ট ২০২০ সালে সংসদ ভেঙে দেওয়ার সরকারি পরিকল্পনা রুখে দিয়েছিল। তবে শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রে ২০২০ সালে ক্ষমতায় আসা এসএলপিপি ২০তম সংবিধান সংশোধনী পাসের মাধ্যমে বিচার বিভাগ ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা খর্ব করে, যা ২০২২-২৩ সালে ব্যাপক রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্ম দেয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও এমন ভূমিধস বিজয়ী দলগুলোর বিরুদ্ধে বিচার বিভাগকে কুক্ষিগত করে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ নতুন নয়।

প্রশ্ন হলো, বিএনপি কি তবে এই পথে হাঁটবে, নাকি গণতন্ত্রের পক্ষে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে? দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা বিজয়ী দলকে সংবিধান পরিবর্তনের ক্ষমতা দেয়, যা রাষ্ট্রব্যবস্থা, নির্বাচন ব্যবস্থা এবং মৌলিক কাঠামোগত বিষয়ে একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ করে দেয়। এছাড়া বড় নীতিগত ও আইনি পরিবর্তন আনাও সহজ হয়।

ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় এবারই প্রথম উচ্চকক্ষের প্রবর্তন হচ্ছে বাংলাদেশে। নিম্নকক্ষ থেকে আসা বিলগুলো যাচাই করে জনস্বার্থবিরোধী আইন বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করাই এর মূল উদ্দেশ্য। সংবিধান বা আইন সংশোধনের ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষের বিশেষ ক্ষমতা থাকবে, যদিও তারা সরকারের প্রতি অনাস্থা আনতে পারবে না। তবে উচ্চকক্ষের আসন বণ্টন নিয়ে মতপার্থক্য থেকেই যাচ্ছে। জাতীয়তাবাদী দল চেয়েছিল নিম্নকক্ষের নির্বাচিত আসন অনুযায়ী আসন বণ্টন হোক। কিন্তু জুলাই সনদের footnoted-এ উল্লেখ আছে যে, রাজনৈতিক দল বা জোট জনগণের ম্যান্ডেট পেলে তাদের ইশতেহার অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে। যদি দুই-তৃতীয়াংশে জয়ী জাতীয়তাবাদী দল তাদের মতো করে আসন বণ্টন করে, তবে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় গঠিত উচ্চকক্ষ তার মূল উদ্দেশ্য পূরণে ব্যর্থ হতে পারে। জনগণ যে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে উচ্চকক্ষের আনুপাতিক আসন বণ্টনের সম্ভাবনাকে সমর্থন করেছিল, সেই প্রত্যাশা পূরণ না হলে তা হতাশাজনক হবে।

বর্তমানে বাংলাদেশ এক নাজুক অবস্থায় রয়েছে। ভঙ্গুর প্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা ও বিচার ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং করুণ অর্থনৈতিক অবস্থা বিজয়ী দলের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা বিচক্ষণতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে। পরতে পরতে ধসে যাওয়া আমলাতন্ত্র এবং উচ্চমূল্যস্ফীতি ও বেকারত্ব তো আছেই। সবচেয়ে বড় কথা, ১৭ বছরের ফ্যাসিস্ট ট্রমা এবং জুলাইয়ের রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থানের ভয়াবহ স্মৃতি থেকে মুক্তি পেতে চায় দেশ। বিজয়ী দলের জন্য এটি একটি অভূতপূর্ব সুযোগ নিজেদের একটি বিকল্প হিসেবে প্রমাণ করার এবং ক্ষমতা কুক্ষিগত করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ প্রায়শই রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক ভারসাম্য, দুর্নীতি এবং গ্রাহকতন্ত্রের জন্ম দেয়। এই অপরাজনৈতিক বলয় থেকে বের হতে না পারলে, দেশ আরও গভীর সংকটে নিপতিত হতে পারে।

সর্বোপরি, বিজয়ী দলের জন্য এটি কেবল ‘ক্ষমতা’ নয়, বরং এক বিশাল ‘দায়িত্ব’। জনগণ এবার শুধু রাষ্ট্রক্ষমতায় আসা দলের জন্যই ভোট দেয়নি, বরং জুলাই সনদের বাস্তবায়নেও ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে রায় দিয়েছে, যার একটি বড় অংশ ক্ষমতার ভারসাম্য সুনিশ্চিত করা। তাই প্রশ্ন হলো, জাতীয়তাবাদী দল কি পূর্বসূরীদের মতো ক্ষমতার বলয় নিজ সুবিধার্থে পোক্ত করবে, নাকি দায়িত্বানুভূতির সঙ্গে বিরোধী জোট এবং অন্যান্য দলকে সঙ্গে নিয়ে দেশ গড়ার কাজে হাত দেবে? বিজয়ী দলের কাছে প্রত্যাশা, ১৭ বছরের ভঙ্গুর বিশ্বাসের এই মানুষগুলোর সঙ্গে আর যেন কোনো বিশ্বাসঘাতকতা না হয়।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

জগন্নাথের বেদখল হল উদ্ধারে সব ধরনের আইনি সহায়তার আশ্বাস এমপি হামিদের

দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ

আপডেট সময় : ০৪:৪২:৪৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

## দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ছায়া: বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কোন পথে?

ঢাকা: সদ্য সমাপ্ত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয়তাবাদী দল ও তার মিত্রদের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে নিরঙ্কুশ বিজয় বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে এই বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেশের জন্য কতটা মঙ্গলজনক হবে, তা বুঝতে হলে অতীতের দিকে তাকাতে হবে। ২০০১ সালের জাতীয়তাবাদী দলের landslide জয় পরবর্তী জরুরি অবস্থা এবং ২০০৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর দীর্ঘ ১৭ বছরের শাসনামলের রক্তাক্ত পরিণতি, বিশেষ করে ২৪শে জুলাইয়ের ঘটনা, আজও অনেকের স্মরণে টাটকা।

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতেও দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজয়ী ক্ষমতাসীন দলগুলোর ক্ষমতা কেন্দ্রীকরণের প্রবণতা এবং তার ফলস্বরূপ সৃষ্ট বিতর্ক নতুন নয়। ১৯৮৪ সালে ভারতের কংগ্রেস, ২০১৭ সালে নেপালের কমিউনিস্ট পার্টি এবং ২০২০ সালে শ্রীলঙ্কার এসএলপিপি-র মতো দলগুলো প্রায়শই সংবিধান পরিবর্তনের মাধ্যমে ক্ষমতাকে আরও সুসংহত করার চেষ্টা করেছে, যা গণতান্ত্রিক ভারসাম্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। যদিও ভারতের ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষ ও বিচার বিভাগের শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ একক আধিপত্যকে কিছুটা হলেও সীমিত রাখতে সক্ষম হয়েছে। নেপালের সুপ্রিম কোর্ট ২০২০ সালে সংসদ ভেঙে দেওয়ার সরকারি পরিকল্পনা রুখে দিয়েছিল। তবে শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রে ২০২০ সালে ক্ষমতায় আসা এসএলপিপি ২০তম সংবিধান সংশোধনী পাসের মাধ্যমে বিচার বিভাগ ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা খর্ব করে, যা ২০২২-২৩ সালে ব্যাপক রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্ম দেয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও এমন ভূমিধস বিজয়ী দলগুলোর বিরুদ্ধে বিচার বিভাগকে কুক্ষিগত করে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ নতুন নয়।

প্রশ্ন হলো, বিএনপি কি তবে এই পথে হাঁটবে, নাকি গণতন্ত্রের পক্ষে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে? দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা বিজয়ী দলকে সংবিধান পরিবর্তনের ক্ষমতা দেয়, যা রাষ্ট্রব্যবস্থা, নির্বাচন ব্যবস্থা এবং মৌলিক কাঠামোগত বিষয়ে একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ করে দেয়। এছাড়া বড় নীতিগত ও আইনি পরিবর্তন আনাও সহজ হয়।

ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় এবারই প্রথম উচ্চকক্ষের প্রবর্তন হচ্ছে বাংলাদেশে। নিম্নকক্ষ থেকে আসা বিলগুলো যাচাই করে জনস্বার্থবিরোধী আইন বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করাই এর মূল উদ্দেশ্য। সংবিধান বা আইন সংশোধনের ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষের বিশেষ ক্ষমতা থাকবে, যদিও তারা সরকারের প্রতি অনাস্থা আনতে পারবে না। তবে উচ্চকক্ষের আসন বণ্টন নিয়ে মতপার্থক্য থেকেই যাচ্ছে। জাতীয়তাবাদী দল চেয়েছিল নিম্নকক্ষের নির্বাচিত আসন অনুযায়ী আসন বণ্টন হোক। কিন্তু জুলাই সনদের footnoted-এ উল্লেখ আছে যে, রাজনৈতিক দল বা জোট জনগণের ম্যান্ডেট পেলে তাদের ইশতেহার অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে। যদি দুই-তৃতীয়াংশে জয়ী জাতীয়তাবাদী দল তাদের মতো করে আসন বণ্টন করে, তবে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় গঠিত উচ্চকক্ষ তার মূল উদ্দেশ্য পূরণে ব্যর্থ হতে পারে। জনগণ যে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে উচ্চকক্ষের আনুপাতিক আসন বণ্টনের সম্ভাবনাকে সমর্থন করেছিল, সেই প্রত্যাশা পূরণ না হলে তা হতাশাজনক হবে।

বর্তমানে বাংলাদেশ এক নাজুক অবস্থায় রয়েছে। ভঙ্গুর প্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা ও বিচার ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং করুণ অর্থনৈতিক অবস্থা বিজয়ী দলের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা বিচক্ষণতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে। পরতে পরতে ধসে যাওয়া আমলাতন্ত্র এবং উচ্চমূল্যস্ফীতি ও বেকারত্ব তো আছেই। সবচেয়ে বড় কথা, ১৭ বছরের ফ্যাসিস্ট ট্রমা এবং জুলাইয়ের রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থানের ভয়াবহ স্মৃতি থেকে মুক্তি পেতে চায় দেশ। বিজয়ী দলের জন্য এটি একটি অভূতপূর্ব সুযোগ নিজেদের একটি বিকল্প হিসেবে প্রমাণ করার এবং ক্ষমতা কুক্ষিগত করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ প্রায়শই রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক ভারসাম্য, দুর্নীতি এবং গ্রাহকতন্ত্রের জন্ম দেয়। এই অপরাজনৈতিক বলয় থেকে বের হতে না পারলে, দেশ আরও গভীর সংকটে নিপতিত হতে পারে।

সর্বোপরি, বিজয়ী দলের জন্য এটি কেবল ‘ক্ষমতা’ নয়, বরং এক বিশাল ‘দায়িত্ব’। জনগণ এবার শুধু রাষ্ট্রক্ষমতায় আসা দলের জন্যই ভোট দেয়নি, বরং জুলাই সনদের বাস্তবায়নেও ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে রায় দিয়েছে, যার একটি বড় অংশ ক্ষমতার ভারসাম্য সুনিশ্চিত করা। তাই প্রশ্ন হলো, জাতীয়তাবাদী দল কি পূর্বসূরীদের মতো ক্ষমতার বলয় নিজ সুবিধার্থে পোক্ত করবে, নাকি দায়িত্বানুভূতির সঙ্গে বিরোধী জোট এবং অন্যান্য দলকে সঙ্গে নিয়ে দেশ গড়ার কাজে হাত দেবে? বিজয়ী দলের কাছে প্রত্যাশা, ১৭ বছরের ভঙ্গুর বিশ্বাসের এই মানুষগুলোর সঙ্গে আর যেন কোনো বিশ্বাসঘাতকতা না হয়।