মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করুন
০৪:১০ অপরাহ্ন | ২৯শে অক্টোবর ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ | বৃহঃস্পতিবার, ১৩ই কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১৭ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি

নির্বাচিত সরকারের সামনে অর্থনীতির ৬টি পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ

  • হালনাগাদ সময় : ০২:০৯:২৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ১২৮ বার পড়া হয়েছে

শনিবার আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল (আইএমএফ) প্রকাশিত বাংলাদেশবিষয়ক এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর যে সরকারই দায়িত্ব নিক না কেন, তাদের ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনর্গঠনে কঠোর চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। গত ২৬ জানুয়ারি আইএমএফ-এর নির্বাহী পর্ষদে অনুমোদিত এই প্রতিবেদনে ঋণের কিস্তি ছাড়ের ক্ষেত্রে নির্বাচিত সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকারকে পূর্বশর্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

নির্বাচিত সরকারের সামনে ৬টি প্রধান চ্যালেঞ্জ:

আইএমএফ-এর মতে, নতুন সরকারকে নিচের ৬টি ক্ষেত্রে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে:

১. আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা: ভঙ্গুর ব্যাংকিং ব্যবস্থায় গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং তারল্য সংকট নিরসন।
২. বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান: স্থবির হয়ে পড়া বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো এবং যুবসমাজের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি।
৩. রাজস্ব সংস্কার: কর-জিডিপি অনুপাত বর্তমানে ৮% থেকে বাড়িয়ে ২০৩৪-৩৫ সালের মধ্যে ১০.৫%-এ উন্নীত করা।
৪. বিনিময় হার পদ্ধতি: ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হারের নতুন কাঠামো (Crawling Peg বা বাজারভিত্তিক) পুরোপুরি কার্যকর করা।
৫. মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ: বর্তমানে ৮.৯% হারে থাকা মূল্যস্ফীতিকে ৭%-এর নিচে নামিয়ে আনা।
৬. প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার: নেতিবাচক ধারা থেকে প্রবৃদ্ধি ফিরিয়ে এনে ৬ শতাংশে উন্নীত করা।


চিহ্নিত ঝুঁকি ও অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতা

প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বেশ কিছু অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঝুঁকি শনাক্ত করা হয়েছে:

  • রাজস্ব ঘাটতি: প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী হওয়ায় এবং বিনিয়োগে স্থবিরতার কারণে রাজস্ব আহরণ অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।
  • ব্যাংকিং খাতের লোকসান: সরকারি ব্যাংকগুলোর অব্যাহত লোকসান এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা আর্থিক খাতের টেকসই উন্নয়নে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
  • ব্যয় বৃদ্ধি: নতুন সরকার আসার পর রাজনৈতিক চাপে সরকারি খরচ বেড়ে যেতে পারে, যা অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে।
  • রপ্তানি ঝুঁকি: তৈরি পোশাক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অংশীদারিত্ব হ্রাস বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে বিপদে ফেলতে পারে।
  • রোহিঙ্গা সংকট: আন্তর্জাতিক সহায়তা কমলে রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও এর আশেপাশে সামাজিক ও আর্থিক ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আইএমএফ-এর অর্থনৈতিক পূর্বাভাস (২০২৫-২৬):

আইএমএফ বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির কিছু গুরুত্বপূর্ণ সূচকের পূর্বাভাস দিয়েছে:

সূচকবর্তমান পূর্বাভাস (২০২৫-২৬)দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য
জিডিপি প্রবৃদ্ধি৪.৭%৬%
মূল্যস্ফীতি৮.৯%৬% (আগামী বছর)
বেসরকারি ঋণপ্রবৃদ্ধি৭.৬% (ইতিহাসে সর্বনিম্ন)উচ্চতর প্রবৃদ্ধি
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ৩০.৮ বিলিয়ন ডলার৩৫.৮ বিলিয়ন ডলার (আগামী বছর)

সুপারিশ ও সংস্কারের পথনকশা

আইএমএফ স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান গত দুই দশকের অর্থনৈতিক রূপান্তরের কাঠামোগত দুর্বলতা ও শাসনব্যবস্থার গলদগুলো উন্মোচিত করেছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সংস্থাটি নিম্নোক্ত সুপারিশ করেছে:

  • সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি: মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের নিচে না আসা পর্যন্ত চড়া সুদের হার বজায় রাখা।
  • ভর্তুকি নিয়ন্ত্রণ: অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় কমানো এবং জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি হ্রাস করা।
  • সুশাসন ও দুর্নীতি দমন: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা এবং মানি লন্ডারিং রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া।
  • জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) সংস্কার: রাজস্বনীতিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এনবিআর-এর আমূল পরিবর্তন।

আইএমএফ মনে করে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা উন্মোচনে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জনের কোনো বিকল্প নেই। নতুন নির্বাচিত সরকার যদি এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় দৃঢ় অঙ্গীকার প্রদর্শন না করে, তবে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার অসম্ভব হয়ে পড়বে।

Share this news as a Photo Card

জনপ্রিয় সংবাদ

‘তাহসিফ আত্মহত্যা করেননি, তাকে হত্যা করা হয়েছে’: বাবার অভিযোগ

29 October 2026

টিভি ও মোবাইল ছাড়া সন্তান পালন: আসিন ও রাহুল শর্মার অনন্য উদ্যোগ

www.deshkhobor24.com |
fb/deshkhobor24bd

নির্বাচিত সরকারের সামনে অর্থনীতির ৬টি পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ

হালনাগাদ সময় : ০২:০৯:২৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

শনিবার আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল (আইএমএফ) প্রকাশিত বাংলাদেশবিষয়ক এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর যে সরকারই দায়িত্ব নিক না কেন, তাদের ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনর্গঠনে কঠোর চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। গত ২৬ জানুয়ারি আইএমএফ-এর নির্বাহী পর্ষদে অনুমোদিত এই প্রতিবেদনে ঋণের কিস্তি ছাড়ের ক্ষেত্রে নির্বাচিত সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকারকে পূর্বশর্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

নির্বাচিত সরকারের সামনে ৬টি প্রধান চ্যালেঞ্জ:

আইএমএফ-এর মতে, নতুন সরকারকে নিচের ৬টি ক্ষেত্রে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে:

১. আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা: ভঙ্গুর ব্যাংকিং ব্যবস্থায় গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং তারল্য সংকট নিরসন।
২. বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান: স্থবির হয়ে পড়া বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো এবং যুবসমাজের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি।
৩. রাজস্ব সংস্কার: কর-জিডিপি অনুপাত বর্তমানে ৮% থেকে বাড়িয়ে ২০৩৪-৩৫ সালের মধ্যে ১০.৫%-এ উন্নীত করা।
৪. বিনিময় হার পদ্ধতি: ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হারের নতুন কাঠামো (Crawling Peg বা বাজারভিত্তিক) পুরোপুরি কার্যকর করা।
৫. মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ: বর্তমানে ৮.৯% হারে থাকা মূল্যস্ফীতিকে ৭%-এর নিচে নামিয়ে আনা।
৬. প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার: নেতিবাচক ধারা থেকে প্রবৃদ্ধি ফিরিয়ে এনে ৬ শতাংশে উন্নীত করা।


চিহ্নিত ঝুঁকি ও অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতা

প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বেশ কিছু অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঝুঁকি শনাক্ত করা হয়েছে:

  • রাজস্ব ঘাটতি: প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী হওয়ায় এবং বিনিয়োগে স্থবিরতার কারণে রাজস্ব আহরণ অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।
  • ব্যাংকিং খাতের লোকসান: সরকারি ব্যাংকগুলোর অব্যাহত লোকসান এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা আর্থিক খাতের টেকসই উন্নয়নে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
  • ব্যয় বৃদ্ধি: নতুন সরকার আসার পর রাজনৈতিক চাপে সরকারি খরচ বেড়ে যেতে পারে, যা অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে।
  • রপ্তানি ঝুঁকি: তৈরি পোশাক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অংশীদারিত্ব হ্রাস বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে বিপদে ফেলতে পারে।
  • রোহিঙ্গা সংকট: আন্তর্জাতিক সহায়তা কমলে রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও এর আশেপাশে সামাজিক ও আর্থিক ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আইএমএফ-এর অর্থনৈতিক পূর্বাভাস (২০২৫-২৬):

আইএমএফ বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির কিছু গুরুত্বপূর্ণ সূচকের পূর্বাভাস দিয়েছে:

সূচকবর্তমান পূর্বাভাস (২০২৫-২৬)দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য
জিডিপি প্রবৃদ্ধি৪.৭%৬%
মূল্যস্ফীতি৮.৯%৬% (আগামী বছর)
বেসরকারি ঋণপ্রবৃদ্ধি৭.৬% (ইতিহাসে সর্বনিম্ন)উচ্চতর প্রবৃদ্ধি
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ৩০.৮ বিলিয়ন ডলার৩৫.৮ বিলিয়ন ডলার (আগামী বছর)

সুপারিশ ও সংস্কারের পথনকশা

আইএমএফ স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান গত দুই দশকের অর্থনৈতিক রূপান্তরের কাঠামোগত দুর্বলতা ও শাসনব্যবস্থার গলদগুলো উন্মোচিত করেছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সংস্থাটি নিম্নোক্ত সুপারিশ করেছে:

  • সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি: মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের নিচে না আসা পর্যন্ত চড়া সুদের হার বজায় রাখা।
  • ভর্তুকি নিয়ন্ত্রণ: অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় কমানো এবং জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি হ্রাস করা।
  • সুশাসন ও দুর্নীতি দমন: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা এবং মানি লন্ডারিং রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া।
  • জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) সংস্কার: রাজস্বনীতিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এনবিআর-এর আমূল পরিবর্তন।

আইএমএফ মনে করে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা উন্মোচনে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জনের কোনো বিকল্প নেই। নতুন নির্বাচিত সরকার যদি এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় দৃঢ় অঙ্গীকার প্রদর্শন না করে, তবে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার অসম্ভব হয়ে পড়বে।

Share this news as a Photo Card