প্রায় সাত দশক ধরে মাত্রাতিরিক্ত দূষণ আর অনিয়ন্ত্রিত মৎস্য শিকারের কবলে পড়ে মৃতপ্রায় হয়ে গিয়েছিল চীনের ইয়াংসি নদী। তবে চীন সরকারের কঠোর পদক্ষেপ ও মাছ ধরার ওপর দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞা জারির ফলে নদীটি এখন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেতে শুরু করেছে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্স’-এ প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে এই আশাব্যঞ্জক তথ্য উঠে এসেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ইয়াংসি নদীতে মাছ ধরা বন্ধ করার ফলে গত কয়েক বছরে সেখানে মাছের উপস্থিতি বা ‘বায়োমাস’ দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে ফিরে এসেছে বেশ কিছু বিপন্ন জলজ প্রজাতি। ফ্রান্সের তুলুজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সেবাস্তিয়ান ব্রোস ও তার গবেষক দল এই পরিবর্তনগুলো বিশ্লেষণ করেছেন। তাদের মতে, এটি কেবল মাছের সংখ্যাই বাড়ায়নি, বরং নদীর পানি বিশুদ্ধকরণেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। গত ২০ বছরের মধ্যে মিঠা পানির জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে এটি বিশ্বের অন্যতম সেরা উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তিব্বত মালভূমি থেকে শুরু করে সাংহাই পর্যন্ত প্রায় ৪ হাজার মাইল বিস্তৃত এই নদীটি বিশ্বের তৃতীয় দীর্ঘতম। এক সময় দূষণ, বাঁধ নির্মাণ, নৌ-চলাচল এবং ডিনামাইট বা বিদ্যুৎ ব্যবহার করে বেপরোয়া মাছ ধরার কারণে ইয়াংসির বাস্তুতন্ত্র ধ্বংসের মুখে পড়েছিল। এর ফলে কয়েক দশক আগে নদীটি থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায় বিরল প্রজাতির ‘বাইজি’ বা মিঠা পানির ডলফিন। মাছের প্রজনন ক্ষমতাও কমে গিয়েছিল প্রায় ৮৫ শতাংশ।
এই বিপর্যয় ঠেকাতে চীনা বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে ইয়াংসিতে মাছ ধরা বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। এরই প্রেক্ষিতে ২০২১ সাল থেকে নদীটিতে ১০ বছরের জন্য মাছ শিকার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে কেন্দ্রীয় সরকার। তবে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সফল করতে সরকার কেবল আইন করেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং মানবিক দিকটিও গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেছে।
সরকারি তথ্যমতে, ইয়াংসি তীরের প্রায় ২ লাখ জেলের বিকল্প কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে এবং তাদের ক্ষতিপূরণ দিতে প্রায় ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করা হয়েছে। এই বিশাল অংকের বিনিয়োগের ফলে প্রায় এক লাখ জেলে তাদের পেশা পরিবর্তন করে বিকল্প আয়ের পথ বেছে নিয়েছেন।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২১ সালের মধ্যবর্তী সময়ে ইয়াংসি নদীতে জীববৈচিত্র্যের হার বেড়েছে প্রায় ১৩ শতাংশ। ৪শ মিলিয়ন মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সম্পৃক্ত এই বিশাল জলপথের এই পরিবর্তন পরিবেশবিদদের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইয়াংসির এই সফল মডেল বিশ্বের অন্যান্য বিপন্ন নদ-নদী রক্ষায় একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
রিপোর্টারের নাম 























