ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন সংক্রান্ত গণভোট – এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ভোটের দিন ঘনিয়ে আসতেই সাধারণ মানুষের মনে নির্বাচন ও ভোট প্রক্রিয়া নিয়ে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। ভোটকেন্দ্র থেকে শুরু করে ভোটের ফলাফল ঘোষণা পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয়ে অনলাইনে তথ্য খুঁজছেন ভোটাররা। নির্বাচন কমিশন (ইসি) এবারের ভোটকে কেন্দ্র করে কিছু নতুন নিয়ম চালু করায় এই কৌতূহল আরও বেড়েছে।
চাঁদপুরের ভোটার সেলিনা আক্তার যেমন বলছিলেন, ‘‘ভোটকেন্দ্র কোথায় এখনও সেটা জানি না। আগে তো বাসায় স্লিপ দিয়ে যেত। এবার কেউ ভোটার স্লিপ দিয়ে যায়নি। এমনিতে সবসময়ই লেডি দেহলভি স্কুলে ভোট দিয়েছি। হয়তো ওই কেন্দ্রই হবে। সমস্যা নাই, সার্চ করলেই জানা যাবে।’’ তার কথার সূত্র ধরে দেখা যায়, অনেক ভোটারই তাদের কেন্দ্র ও অন্যান্য তথ্য জানতে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সক্রিয়।
অনলাইন সার্চে দেখা গেছে, ‘ইলেকশন ২০২৬’, ‘স্মার্ট ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট বিডি ২০২৬’, ‘ভোটার স্লিপ বিডি’, ‘ভোটার নম্বর চেক অনলাইন’, ‘ভোট সেন্টার চেক’, ‘ভোটার নম্বর বের করার নিয়ম’—এমন অসংখ্য শব্দ ব্যবহার করে মানুষ তথ্য জানতে চাইছেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ইংরেজি শব্দ ব্যবহার হলেও, বাংলাতেও কিছু অনুসন্ধান করা হয়েছে। জনসাধারণের এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও তার উত্তর নিচে তুলে ধরা হলো:
নির্বাচন ২০২৬: এক নজরে
সার্চের একদম শীর্ষে থাকা শব্দগুলোর মধ্যে ‘ইলেকশন ২০২৬’ অন্যতম। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সর্বোচ্চ সংখ্যক ভোটার নিয়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ইসির তথ্য অনুযায়ী, এবার মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার, যার মধ্যে পুরুষ ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার, নারী ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার এবং হিজড়া ভোটার ১ হাজার ১২০ জন।
নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ৫৯টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৫১টি দল এবারের সংসদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। এর মধ্যে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দল রয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ছাত্র-তরুণদের নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টিও এবারই প্রথম শাপলা কলি প্রতীক নিয়ে ভোটে অংশ নিচ্ছে।
ভোট কখন শুরু, কখন শেষ?
পূর্ববর্তী নির্বাচনগুলোতে সাধারণত সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলতো। কিন্তু এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটগ্রহণ শুরুর সময় আধা ঘণ্টা এগিয়ে আনা হয়েছে। ভোটের দিন সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ভোটাররা ভোট দিতে পারবেন।
ভোটকেন্দ্র কোথায়?
সেলিনা আক্তারের মতো অনেক ভোটারই তাদের ভোটকেন্দ্র নিয়ে এখনো সংশয়ে ভুগছেন। অনলাইনে ‘ভোট সেন্টার চেক’, ‘ভোট সেন্টার’—এমন শব্দ দিয়ে তথ্য খুঁজছেন তারা। গত একদিনে সবচেয়ে বেশি সার্চ হওয়া শব্দগুলোর মধ্যে ‘ভোট সেন্টার চেক বিডি’ বা ‘ভোট কেন্দ্র চেক’ অন্যতম।
এমন ভোটারদের সুবিধার্থে নির্বাচন কমিশন অ্যাপ, হটলাইন নম্বর, এসএমএস সেবা চালু করেছে। এছাড়াও ইসির ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে ‘ভোট কেন্দ্র’ অপশনে জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ও জন্ম তারিখ দিয়ে অনুসন্ধান করলে ভোটকেন্দ্রের বিস্তারিত তথ্য, যেমন—ভোটার নম্বর, ক্রমিক নম্বর, লিঙ্গ, ভোটকেন্দ্রের নাম এবং ম্যাপে কেন্দ্রের অবস্থান জানা যাবে।
স্মার্ট ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট বিডি ২০২৬ অ্যাপ
নির্বাচন কমিশনের চালু করা ‘স্মার্ট ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট বিডি’ অ্যাপের মাধ্যমেও ভোটাররা তাদের ভোটকেন্দ্র ও ভোটার নম্বর সম্পর্কে জানতে পারবেন। ১০ বা ১৩ নম্বরের জাতীয় পরিচয়পত্র এবং জন্ম তারিখ দিয়ে সার্চ করলেই এই অ্যাপে সব তথ্য পাওয়া যাবে।
ভোটার নম্বর বের করার নিয়ম
অনেকেই ‘ভোটার সিরিয়াল নম্বর চেক’, ‘ভোটার নম্বর চেক’, ‘ভোটার সিরিয়াল নম্বর বের করার নিয়ম’—এসব লিখে সার্চ করছেন। নির্বাচন কমিশন তাদের ওয়েবসাইট, স্মার্ট ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট বিডি অ্যাপ, এসএমএস এবং হটলাইন নম্বরের মাধ্যমে এসব তথ্য পাওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছে। যেকোনো ভোটার ১০৫ নম্বরে ফোন করে অপারেটরের সাথে কথা বলতে ৯ চাপলে এবং জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ও জন্ম তারিখ জানালে নিজের ভোটকেন্দ্র ও ভোটার নম্বর সম্পর্কে জানতে পারবেন।
ভোটার স্লিপ
গত সাতদিনে ‘ভোটার স্লিপ’, ‘ভোটার স্লিপ চেক’, ‘ভোটার স্লিপ পিডিএফ ডাউনলোড ২০২৬’—এসব শব্দ লিখে অনেকে তথ্য খুঁজেছেন। ভোটার স্লিপ হলো একটি তথ্য সংবলিত কাগজ, যেখানে ভোটারের নাম, ভোটার নম্বর ও ভোটকেন্দ্র লেখা থাকে। সাধারণত স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বা প্রার্থীদের পক্ষ থেকে এসব স্লিপ দেওয়া হলেও, এবার অনেক জায়গায় তা বিতরণ করা হয়নি।
ভোটকেন্দ্রে মোবাইল ও সেলফি
নির্বাচন কমিশন প্রথমে ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজের মধ্যে মোবাইল ফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দিলেও, পরে তীব্র সমালোচনার মুখে তা প্রত্যাহার করে নেয়। বর্তমানে ভোটার, প্রার্থী, এজেন্ট এবং সাংবাদিকরা ভোটকেন্দ্রে মোবাইল ফোন নিয়ে যেতে পারবেন এবং ছবিও তুলতে পারবেন। তবে, গোপন কক্ষের ভেতরে মোবাইল নিয়ে প্রবেশ করা বা ছবি তোলা যাবে না। সাধারণ ভোটারদের জন্য ভোটকেন্দ্রের ভেতরে মোবাইল ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়নি।
মুখের নিকাব খুলতে হবে?
যেসব ভোটার মুখ ঢেকে পর্দা করেন, তাদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, ভোট দিতে গেলে নিকাব খুলতে হবে কিনা। নির্বাচনী আইন অনুযায়ী, প্রথম পোলিং অফিসারের দায়িত্ব হলো ভোটারের চেহারার দিকে তাকিয়ে ভোটার তালিকার ছবির সাথে তার চেহারা মেলানো। যদি পরিচয় গোপন করে বা ছদ্মবেশে জাল ভোট দিতে আসার বিষয়টি প্রমাণিত হয়, তবে ওই কর্মকর্তাকে নির্বাচনী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে সোপর্দ করা হবে, যিনি তাৎক্ষণিক বিচারের মাধ্যমে ৬ মাস পর্যন্ত জেল ও জরিমানার আদেশ দিতে পারেন।
নির্বাচনের দিন যানবাহন চলবে কী?
নির্বাচন ঘিরে যানবাহন চলাচলে কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করেছে নির্বাচন কমিশন। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) রাত ১২টা থেকে ভোটের পরদিন (১৩ ফেব্রুয়ারি) রাত ১২টা পর্যন্ত মোট ৭২ ঘণ্টা মোটরসাইকেল চলাচল বন্ধ রয়েছে। এ কারণে মঙ্গলবার রাত থেকেই রাইড শেয়ারিং অ্যাপের মোটরসাইকেল সার্ভিস বন্ধ। এছাড়াও ১১ ফেব্রুয়ারি (বুধবার) মধ্যরাত থেকে ভোটের দিন (১২ ফেব্রুয়ারি) রাত ১২টা পর্যন্ত পিকআপ, মাইক্রোবাস, ট্রাক, লঞ্চ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকবে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনী, প্রশাসন, অনুমতিপ্রাপ্ত পর্যবেক্ষকদের যানবাহন, জরুরি সেবায় নিয়োজিত যানবাহন, ওষুধ, স্বাস্থ্য-চিকিৎসা ও অনুরূপ কাজে ব্যবহৃত দ্রব্যাদি এবং সংবাদপত্র বহনকারী সকল ধরনের যানবাহন এই আওতামুক্ত থাকবে।
ভোটকেন্দ্রে বাচ্চা নেওয়া যাবে?
সন্তানের বয়স যদি প্রতীক বোঝার মতো না হয়, তাহলে যেকোনো মা ভোটার ভোট দেওয়ার গোপন কক্ষেও ওই সন্তানকে নিয়ে যেতে পারবেন। কিন্তু যদি প্রতীক বোঝার মতো বয়সী কোনো সন্তান হয়, সেক্ষেত্রে ওই সন্তানকে ভোটকেন্দ্রে নিতে পারলেও তাকে বাইরে রেখেই ভোটারকে ভোট কক্ষে ঢুকতে হবে।
গণভোটের ব্যালট ফেলবো কোন বাক্সে?
সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই সাথে অনুষ্ঠিত হওয়ায় দুটি ব্যালটেই একই সাথে ভোট দিতে হবে। সংসদ নির্বাচনের ব্যালট হবে সাদাকালো এবং গণভোটের ব্যালট পেপার হবে গোলাপি রঙের। অনেক ভোটারই সংশয়ে আছেন যে দুটি ব্যালট একই বাক্সে ফেলতে হবে কিনা। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন একটি পরিপত্র জারি করে জানিয়েছে, ‘‘জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য কমিশন কর্তৃক অনুমোদিত, নির্ধারিত এবং সরবরাহকৃত স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সই গণভোটের বাক্স হিসাবে ব্যবহৃত হবে। ভোটারগণ ভোট প্রদান শেষে জাতীয় সংসদের ব্যালট ও গণভোটের ব্যালট একই বাক্সে ফেলবেন।’’ অর্থাৎ, দুটি ব্যালটই একই বাক্সে ফেলতে হবে।
ফলাফল কখন জানা যাবে?
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ভোটগ্রহণ শেষে ফলাফল কখন জানা যাবে, তা নিয়ে কৌতূহল রয়েছে। এবারই প্রথম সংসদ নির্বাচনের সঙ্গেই গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ায় ভোট গণনা ও ফল প্রকাশে কিছুটা বেশি সময় লাগবে বলে ইসি জানিয়েছে।
ইসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভোটের দিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ভোটগ্রহণ শেষে গণনা শুরু হবে। কেন্দ্র থেকে গণনা শেষে ফলাফল উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ে, সেখান থেকে জেলার রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় হয়ে নির্বাচন কমিশনে পৌঁছায়। এরপর সেখান থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়। সাধারণত বেতার ও টেলিভিশনে এসব ফলাফল প্রচার করা হয়।
অতীতের সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে মধ্যরাত নাগাদ কোন আসনে কোন প্রার্থী এগিয়ে, সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়া গেলেও, এবার গণভোট এক সাথে গণনার ফলে সময় কিছুটা বেশি লাগতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে, অনানুষ্ঠানিক পূর্ণাঙ্গ ফলাফল পেতে শুক্রবার দুপুর কিংবা বিকেল হয়ে যেতে পারে। ফলাফল নিয়ে আপত্তি না থাকলে, যাচাই-বাছাই শেষে নির্বাচন কমিশন চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ করবে, যা আসতে শনিবার বা রবিবার পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। আনুষ্ঠানিক গেজেট প্রকাশের পরবর্তী তিনদিনের মধ্যে নির্বাচিত সদস্যের শপথ পড়ানোর বিধান রয়েছে।
নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার শপথ পড়াবেন কে?
গত ৫ ফেব্রুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানিয়েছেন, ভোটগ্রহণের তিন দিন পরই নতুন প্রধানমন্ত্রীর শপথ অনুষ্ঠান হতে পারে। ১৬ ফেব্রুয়ারির মধ্যে নতুন প্রধানমন্ত্রী শপথ গ্রহণ করতে পারেন। তবে প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে, যেহেতু জাতীয় সংসদ কার্যকর নেই, তাহলে নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্য এবং সংসদ সদস্যদের শপথ পাঠ করাবেন কে?
অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ৫ ফেব্রুয়ারি গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর পদত্যাগ ও ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু গ্রেপ্তার হওয়ায় রাষ্ট্রপতি মনোনীত প্রধান বিচারপতি অথবা তিনদিন পর প্রধান নির্বাচন কমিশনার শপথ পড়াতে পারেন। অন্তর্বর্তী সরকার দ্রুত শপথ গ্রহণের ব্যবস্থা চায় উল্লেখ করে তিনি জানান, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর রাষ্ট্রপতি মনোনীত ব্যক্তির মাধ্যমে শপথের সম্ভাবনা বেশি।
রিপোর্টারের নাম 





















